বিদ্যুৎ ইউনিট ৬৫ টাকা স্থানীয়দের ক্ষোভ
সেন্টমার্টিনে সরবরাহ দুই-তিন ঘণ্টা
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে দিনে বিদ্যুৎ মেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। কখনো তাও জোটে না। অথচ সেই বিদ্যুতের জন্যই এবার ইউনিটপ্রতি ৬৫ টাকা গুনতে হবে। আর বাণিজ্যিকে ৭৬ টাকা। আজ থেকে দ্বীপটিতে বিদ্যুতের নতুন এই মূল্যহার কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। এতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের প্রশ্ন-বিদ্যুৎ না পেয়েও কেন গুনতে হবে বাড়তি টাকা?
জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের বাইরে থাকা দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক ইউনিট ৬৬ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্যই ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে। ফলে আবাসিকে দাম দাঁড়াবে ৬৫ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ৭৬ টাকা।
অথচ সারা দেশে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা। সে হিসাবে সেন্টমার্টিনে নতুন বাণিজ্যিক মূল্যহার জাতীয় গ্রিডের তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ। সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও ব্যবধান কয়েকগুণ। এর প্রতিবাদে ২১ অক্টোবর দ্বীপের বাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন স্থানীয়রা। পরে ‘বিদ্যুৎ আন্দোলন সেন্টমার্টিন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন তারা। তাদের দাবি, দ্বীপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে।
সংগঠনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব দেলোয়ার হোসেন বলেন, সারা দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। অথচ মাস শেষে কয়েক হাজার টাকা বিল দিতে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর পর প্রথম দিকে তুলনামূলক ভালো সেবা পাওয়া গেলেও কয়েক বছর ধরে সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এবার আবারও দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিনে ব্লু মেরিন এনার্জির সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়। দ্বীপবাসী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দিনের পাশাপাশি রাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে ৯২৫টি সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি ৪৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থায়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।
প্রকল্প চালুর সময় আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৪২ টাকা। ২০২২ সালের জুনে উভয় শ্রেণিতে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর ২০২৩ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে আরও ১০ টাকা বাড়ানো হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, দাম বাড়লেও সরবরাহের মান বাড়েনি। দ্বীপের বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা কেটে রাখা হয়। কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানানো হয় না। প্রতিবার রিচার্জের সময়ই এমন ঘটনা ঘটছে। বিদ্যুতের প্রকৃত মূল্য কত, সেটিও গ্রাহকদের কাছে পরিষ্কার নয়।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না দিয়েই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এটি অন্যায়। বিষয়টি নিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে। সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তিনি বলেন, সূর্য ওঠার পর কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। রাতে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। অথচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিজেলের দাম বাড়ার যুক্তি দেখিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। তাহলে সূর্যের দামও কি বেড়েছে? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিন এসে স্থানীয়দের কথা শুনেছেন। কয়েক দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সেন্টমার্টিন কার্যালয়ের সুপারভাইজার আলী হায়দার কোনো
মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রকল্পের ব্যাটারি বিকল হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের সুনির্দিষ্ট মূল্য কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।
এদিকে আজ থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপ উন্মুক্ত হচ্ছে। পর্যটন মৌসুম শুরুর দিন থেকেই নতুন বিদ্যুৎ মূল্যহার কার্যকর হওয়ার কথা। এতে দ্বীপের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই চাপ পর্যটকদের ওপরও পড়তে পারে।
