জেনে নিন
মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচার মন্ত্র
Advertisement
আমানুর রহমান
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আধুনিক নাগরিক জীবনে প্লাস্টিক যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তবে এর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়, যার নাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর এ কণা শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও স্নায়বিক সমস্যা থেকে শুরু করে ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচরণে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।
প্লাস্টিকের বোতল ও পাত্র বর্জন
প্লাস্টিকের বোতলে পানি পান করা কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার সংরক্ষণ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। গবেষণায় দেখা গেছে, এক লিটার বোতলজাত পানিতে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ন্যানোপ্লাস্টিক কণা থাকতে পারে। বিশেষ করে এসব পাত্র যখন সূর্যালোক বা তাপের সংস্পর্শে আসে, তখন এর রাসায়নিক গঠন ভেঙে গিয়ে বিসফেনল-এ এবং থ্যালেটসের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান পানি ও খাবারে মিশে যায়। তাই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসাবে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহারের নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
সিন্থেটিক পোশাক এড়িয়ে চলা
ফ্যাশন-সচেতন আধুনিক সমাজে পলিয়েস্টার, নাইলন বা অ্যাক্রিলিকের মতো কৃত্রিম সুতার পোশাকের কদর অনেক বেশি। কিন্তু আকর্ষণীয় এসব পোশাকই আমাদের অজান্তে পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়ানোর অন্যতম বড় কারিগর। ওয়াশিং মেশিনে একবার সিন্থেটিক কাপড় ধুলে প্রায় ৭ লাখ মাইক্রোফাইবার বা ক্ষুদ্র তন্তু নির্গত হতে পারে, যা নর্দমার পানির মাধ্যমে সরাসরি খাল-বিল ও মহাসাগরে গিয়ে মেশে। ক্ষুদ্র এসব ফাইবার বাতাসেও ভাসতে পারে, যা আমরা প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করছি। এর প্রতিকারে আমাদের সুতি, লিনেন, সিল্ক বা উলের মতো প্রাকৃতিক তন্তুর তৈরি পোশাক নির্বাচনে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
টি-ব্যাগ ব্যবহারে সতর্কতা
আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কাগজের মতো দেখতে টি-ব্যাগগুলো আসলে পলিপ্রোপাইলিন নামক এক ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে সিল করা থাকে, যা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। একটি প্লাস্টিকমিশ্রিত টি-ব্যাগ ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম পানিতে ভিজালে তা থেকে প্রায় ১১.৬ বিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ৩.১ বিলিয়ন ন্যানোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হতে পারে। ফুটন্ত পানির তীব্র তাপে প্লাস্টিকের পলিমার বন্ধন খুব দ্রুত ভেঙে যায় এবং চায়ের সঙ্গে মিশে সরাসরি আমাদের পাকস্থলীতে প্রবেশ করে। এ ভয়াবহতা এড়াতে প্লাস্টিকযুক্ত টি-ব্যাগের বদলে ঐতিহ্যবাহী খোলা চা-পাতা বা সম্পূর্ণ সুতির কাপড়ের তৈরি টি-ব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস আবার ফিরিয়ে আনা একান্ত প্রয়োজন।
মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের পাত্র পরিহার
মাইক্রোওয়েভ ওভেনে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করলে প্রতি বর্গসেন্টিমিটার প্লাস্টিক থেকে প্রায় ৪২ লাখ মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ২১০ কোটি ন্যানোপ্লাস্টিক কণা খাবারে মিশে যেতে পারে। প্লাস্টিকের গায়ে ‘মাইক্রোওয়েভ সেফ’ লেখা থাকলেও মূলত এটি তাপে গলে যায় না বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়; এর অর্থ এই নয় যে, এটি স্বাস্থ্যকর বা রাসায়নিক নিঃসরণ থেকে মুক্ত। তাপ ও মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের যৌথ প্রভাবে প্লাস্টিক অতিদ্রুত তার স্থায়িত্ব হারায় এবং ক্ষতিকর পলিমারগুলো খাদ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই খাবার গরম করার ক্ষেত্রে সর্বদা কাচ বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করা উচিত, যা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ামুক্ত।
প্রসাধনসামগ্রী ও স্ক্রাব নির্বাচনে সজাগ দৃষ্টি
দৈনন্দিন রূপচর্চা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা যেসব ফেসওয়াশ, স্ক্রাব বা টুথপেস্ট ব্যবহার করি, তার অনেকই ‘মাইক্রোবিডস’ বা অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মেশানো থাকে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, একটি সাধারণ ফেসওয়াশের টিউবে ৩ লাখেরও বেশি মাইক্রোবিডস থাকতে পারে, যা আমাদের বেসিনের ড্রেন দিয়ে সরাসরি জলাশয়ে গিয়ে পড়ে এবং জলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে। এ ক্ষতিকর চক্র ভাঙতে কেনার আগে প্রসাধনসামগ্রীর লেবেল পড়ে দেখা উচিত এবং পলিইথাইলিন বা পলিপ্রোপাইলিনযুক্ত পণ্য সম্পূর্ণ বর্জন করা উচিত। এর পরিবর্তে চিনি, কফি, ওটমিল বা লবণের মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি স্ক্রাব ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ।
পানি শোধনে সঠিক ফিল্টার ব্যবহার
জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য পানি আজ মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অন্যতম বড় শিকারে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে সরবরাহকৃত ট্যাপের পানির প্রায় ৮৩ শতাংশ নমুনায় প্লাস্টিকের দূষণ পাওয়া গেছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের আকার এতই ক্ষুদ্র যে সাধারণ ছাঁকনি বা পানি ফোটানোর মাধ্যমে এগুলো দূর করা প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি অথবা উন্নত ‘কার্বন ব্লক ফিল্টার’ ব্যবহার করা অত্যন্ত কার্যকরী, যা পানি থেকে ১ মাইক্রন পর্যন্ত ক্ষুদ্র কণাও ছেঁকে ফেলতে সক্ষম। সঠিক মানের ফিল্টার ব্যবহার করলে পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
