ভ্রমণ
আড়িয়াল বিলের অপরূপ সৌন্দর্য
Advertisement
লেখা ও ছবি : রাজীব পাল রনী
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চলছে হেমন্তকাল। যান্ত্রিক ব্যস্ততা থেকে ক্লান্তি দূর করতে, মনকে স্নিগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দিতে ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। শুক্রবার ভ্রমণে যাওয়ার দিন ঠিক হলো। সকালের নরম আলোয় মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে ঢাকা থেকে রওয়ানা হলাম। এবার ভ্রমণসঙ্গী আমরা পাঁচজন। হৃদয়, পূর্ণিমা, রুদ্রদীপ, রূপন আর আমি। আমাদের প্রথম গন্তব্য অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা আড়িয়াল বিল। বিলের প্রকৃতির রূপ দেখার জন্য আমাদের এ সফর। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেস হাইওয়ে পেরিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শ্রীনগর হয়ে শ্যামসিদ্ধি গ্রামের আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে গাদিঘাট বাজারে গিয়ে পৌঁছালাম সকাল ৮টায়। হেঁটে চলে এলাম দেশের মধ্যঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন আড়িয়াল বিলের এক প্রান্তে।
বিলের চারপাশ ঘুরে বেড়ানোর জন্য ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করা হলো। আমরা সবাই নৌকায় গিয়ে বসলাম। কিছুটা চলার পর নৌকা থামিয়ে সঙ্গে আনা কেক, পাউরুটি দিয়ে সকালের নাশতা সারলাম। নাশতাপর্ব শেষ করেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা আবার চলতে শুরু করল। কিছুদূর নৌকা এগিয়ে যেতেই দেখি, নীল টলমলে ঢেউহীন স্বচ্ছ এক জলের রাজ্য। তা দেখে থইথই জলের ওপর ভাসতে ইচ্ছা করে। নীল জল দেখে আমরা সবাই উচ্ছ্বসিত। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ বিলে কোমর সমান জলে নিম্নজিত থাকে বড় বড় গাছগুলো। নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না বিলের সৌন্দর্য। বিলজুড়ে ভেসে ওঠা সাদা শাপলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। এ মৌসুমে কৃষক ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত আড়িয়াল বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে। তারপর শাপলা ট্রাকে ভরে রাজধানীসহ বড় বড় আড়তে বিক্রি করা হয়। নৌকা যতই এগিয়ে যাচ্ছে, রোদ আর মেঘের আলোছায়া চোখে পড়ে। আবার কখনো কখনো নির্মল আকাশে সাদা মেঘ জমে রোদ আর বৃষ্টি ঝরছে একসঙ্গেই। প্রকৃতির এ অদ্ভুত খেলা এ বিলে এসে দেখতে পেলাম। প্রকৃতির এ অপার রূপ এত কাছ থেকে দেখেনি ছোট্ট রুদ্রদীপ। তাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় রুদ্র। আবার হিমেল বাতাসের পরশ ছুঁয়ে যায় আমাদের সবার মন-প্রাণ। ছোট ছোট নৌকায় জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্যও দেখতে পেলাম। বড় কই মাছের জন্য ঐতিহ্যবাহী বিলের রয়েছে সুখ্যাতি। তারপর যেতে যেতে একঝাঁক পাখি ডানা মেলে ভেসে থাকতে দেখা গেল। বিলজুড়ে পাখির কলকাকলিতে সরগরম থাকে। দিগন্ত বিস্তৃত বিলে ছোট বক, শঙ্খচিল, মাছরাঙা, ডাহুক, পাতিহাঁস, শামুক, কচুরিপানা ও নাম না জানা অতিথি পাখির দেখা মিলল। এক কথায়-চারদিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য অথই জল আর সবুজের সমারহে পরিপূর্ণ বৈচিত্র্যের লীলানিকেতন আড়িয়াল বিল। সবই যেন ছবির মতো। ঢাকার দোহার, নবাবগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার প্রায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটা জায়গাজুড়ে আড়িয়াল বিল। এ বিলের অধিকাংশ অংশ মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। ধীরে ধীরে সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। আড়িয়ল বিল ভ্রমণ শেষ করে নৌকা থেকে নেমে মাইক্রোবাস আবার চলা শুরু করল। দ্বিতীয় গন্তব্য পদ্মা নদী ও সেতুর আশপাশ ঘুরে দেখার। গাদিঘাট থেকে মাওয়া যেতে যেতে পথে মাইক্রোবাসের জানালা দিয়ে হঠাৎ দূরে শুভ্র কাশবন চোখে পড়ে হৃদয়ের। গাড়ি থামিয়ে আমরা সবাই ফুল ফোটা কাশবনে চলে যাই। চারদিক কচি ঘাসের সবুজের সমারোহ। কাশফুলের সঙ্গে মেঘের মিতালি দেখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল দীর্ঘসময় পূর্ণিমা আর রুদ্রদীপ। কাশফুলগুলো প্রকৃতির নয়নাভিরাম রূপের পসরা দেখে চলে এলাম মাওয়া গোল চত্বরে। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে তখন দুপুর ২টা। কিছুটা পথ এগিয়ে হক কিচেন অ্যান্ড রেসিডেন্সির সামনে মাইক্রোবাস থামল। এখানে ছয়তলার ছাদে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বিশাল এক ‘ইলিশ ভাস্কর্য’। ইলিশ ভাস্কর্যের এক পাশ থেকে পদ্মা সেতু ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা পদ্মা নদীর আশপাশের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সেইসঙ্গে দেখা মেলে পদ্মা সেতুতে গাড়ি চলাচলের দৃশ্যও। গরম ভাতের সঙ্গে পদ্মার রুপালি ইলিশ আর বেগুন ভাজা দিয়ে এখানেই দুপুরের খাবার শেষ করলাম। এরপর বিশ্রাম নিয়ে চলে এলাম মাওয়া প্রান্তে সেতু ও নদীর পাড়ে। হেমন্তের বিকালে ট্রলার ভাড়া করে সেতুর নিচ দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি শেষে বিশাল নদীর মহোনীয় রূপ আর ঢেউ উপভোগ করতে করতে পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে। ফেরার পথেই সন্ধ্যা হলো। হেমন্তের ভ্রমণের সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে আজীবন আমাদের মাঝে।
