বন্ধুত্বের অনলাইন অফলাইন
Advertisement
হাবীবাহ্ নাসরীন
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বন্ধুত্বের রূপ সব সময়ই সুন্দর। এটি যে খুব ঘটা করে শুরু হয়, এমনও নয়। বন্ধুত্ব তৈরি হয় নীরবে। পরস্পরকে বুঝতে পারা, একে অন্যের দুঃখ আর সুখগুলো ভাগ করে নেওয়া, এভাবেই হাসি আর কান্না, আনন্দ আর অভিমান মিলেমিশে কখন যে একজন আরেকজনের বন্ধু হয়ে যায়, কখন যে ‘আপনি’ কিংবা ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ হয়ে যায়, তা সেই মানুষ দুটি নিজেরাও বুঝে উঠতে পারে না। আচ্ছা, বন্ধু কি শুধু একই ক্লাসে পড়তে গিয়ে হয়? একদমই না। সহপাঠী থেকে বন্ধু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কারণ, অনেক বছর তারা একসঙ্গে পাশাপাশি থাকার সুযোগ পায়। কিন্তু আপনি কি কখনো খেয়াল করে দেখেছেন, একটি ক্লাসের সব সহপাঠীর মধ্যে কখনো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে না। তাদেরও ছোট ছোট ভাগ থাকে। এর কারণ আসলে মনের সঙ্গে মনের মিল। মানুষ বন্ধু হিসাবে সেই মানুষটিকেই বেছে নেয়, যে কিনা মনের দিক থেকে অনেকটা তারই মতো।
আগে বন্ধু খুঁজে নেওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল, এখন সেই সুযোগ অজস্র। হাত বাড়ালেই বন্ধু পাওয়া যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে বন্ধুত্ব তৈরি হওয়া এখন কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু বাস্তবতা কি সে কথাই বলে? বন্ধুত্ব কি আসলেই এত সহজে তৈরি হওয়ার জিনিস? এ কথা সত্যি যে, বন্ধুত্ব ঘটা করে শুরু হয় না, কিন্তু যে বন্ধন তৈরি হতে মাত্র একটা ক্লিকই যথেষ্ট, তা কি আসলেই মজবুত? ইলেকট্রনিক নানা ডিভাইস বিশেষ করে স্মার্টফোন সহজলভ্য হওয়ায় এখন বেশ অল্প বয়সেই মানুষ ডিজিটাল দুনিয়ার সংস্পর্শে আসছে। শৈশব শেষ হতে না হতেই একটি ফোনের মালিক হয়ে যাচ্ছে অনেকেই। মা-বাবা কিংবা অভিভাবকের অনেকে এটিকে ‘প্রাইভেসি’ হিসাবে দেখছেন। কিন্তু একজন শিশু, যার বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা খুবই কম, তার হাতে একটি কল্পনার রঙিন পৃথিবী তুলে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত?
অনলাইনে বন্ধুত্ব তৈরির হাজারটা সুযোগ, হাজারটা প্রলোভন, হাজারটা ফাঁদ। ফাঁদ বলছি এ কারণে, অনলাইনে বন্ধুত্ব করে সর্বস্ব খুইয়ে আসার এবং কখনো কখনো নিজের প্রাণটাও খোয়ানো মানুষের অভাব নেই। প্রতিদিন পত্রিকা কিংবা টেলিভিশন খুললেই এমন কোনো না কোনো ঘটনা আপনার চোখে পড়বেই। সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড কিংবা তাজমিন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল এই ‘বন্ধুত্ব’। বন্ধু সবসময় আসলে বন্ধু না-ও হতে পারে। সে হয়তো ঘাতক হয়ে আপনার আশপাশেই ঘুরছে একটি সুযোগের অপেক্ষায়। তাই যাকে-তাকে বন্ধু হিসাবে জীবনে স্থান দেওয়া যাবে না। শিশু কিংবা কিশোরদের নিজের ভালো-মন্দ বোঝার মতো জ্ঞান কম থাকে, আবার নিষিদ্ধের প্রতি থাকে অগাধ আকর্ষণ। যে কারণে তারা অনেক সময় বন্ধু নামের ঘাতকের হাতে ঘায়েল হয়ে যায়। কেউ নেশা কিংবা অন্যান্য খারাপ কাজে জড়িয়ে যায়।
এর অর্থ কি অনলাইনে বন্ধু তৈরি হওয়াই খারাপ কিছু? একদমই না। এখানে ভালোর সংখ্যাও কম নয়। তবে সুযোগসন্ধানী আর মিথ্যাবাদী মানুষের সংখ্যা এখানে এত বেশি যে, সেখান থেকে একজন সত্যিকারের ভালো বন্ধু খুঁজে নিতে রীতিমতো গবেষক না হয়ে উপায় নেই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকেই হিমশিম খেতে হয় সত্যিটা বুঝতে, সেখানে শিশু কিংবা কিশোররা কতটা নিরাপদ তা তো সহজেই অনুমেয়। বন্ধুত্ব খারাপ কিছু নয় অবশ্যই। মানুষ সামাজিক প্রাণী। বন্ধু, ভালোবাসা, বন্ধন ছাড়া বেঁচে থাকাটা তার জন্য অর্থহীন হয়ে যায়। তাই তো মানুষ বন্ধু খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু এমন কাউকে জীবনে নিয়ে আসার প্রয়োজন কতটুকু, যাকে কিনা কখনো চোখের সামনেও দেখা হয়নি!
যখন বোঝার মতো বুদ্ধি ও বয়স হবে তখন আপনি এমনিতেই জেনে যাবেন, জীবনে অযথা এতজনকে জড়ানোর কোনো মানে নেই। এত বেশি বন্ধুত্ব অনেক সময় অহেতুক জটিলতা তৈরি করে। তাই বলে কি বন্ধুত্ব গড়বেন না? নিশ্চয়ই গড়বেন। কিন্তু তারও আগে জীবন গড়া জরুরি। এখন মুশকিল হলো, জীবন গড়তে হলেও বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে। মানুষ নিজের গল্প অপরকে নিশ্চিন্তে বলতে চায়। তাই সেই মানুষটিকে সে খুঁজে বেড়ায় অজান্তেই। বন্ধু আপনি খুঁজে নিতেই পারেন। শুধু মনে রাখবেন, একটি ভুল বন্ধুত্ব নষ্ট করে দিতে পারে অনেক জীবন, এমনকি অনেক পরিবারকেও!
