যেসব কারণে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে সরকার
পাচার ঠেকাতে ও ভর্তুকির চাপ কমাতে সমন্বয় করা হয়েছে তেলের দাম * শুধু ডিজেলে ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতো-জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অমিত
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েই চলেছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসানের চাপও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তার মতে, দেশে তুলনামূলক কম দামে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখলে একদিকে বিপিসির লোকসান আরও বাড়ত, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশে তেল পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হতো। একই সঙ্গে বিপুল ভর্তুকির কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
সোমবার সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসিকে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে। বিশ্ব বাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় না করায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে ডিজেল প্রায় ৪৫ লাখ টন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের গড় দাম প্রায় ২০৫ টাকা। এতদিন দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকায়। নতুন করে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হলেও প্রতি লিটারে সরকারের প্রায় ৭০ টাকা লোকসান থাকবে। দাম সমন্বয় না করলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সব ধরনের জ্বালানি তেলে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতো।
এদিকে, সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোয় নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছিল। দৈনিক লোকসান ছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এ হারে এক বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা ছিল। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলামও জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। ফলে বিপিসিকে প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে।
দাম বাড়িয়েও থাকছে বড় ভর্তুকি : দাম সমন্বয়ের পরও সরকার পুরো আন্তর্জাতিক মূল্য ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেয়নি। প্রতিমন্ত্রী অমিতের দেওয়া হিসাবে, স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারদর পুরোপুরি কার্যকর করলে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ২০৫ টাকা হতো। কিন্তু সাধারণ মানুষ, গণপরিবহণ ও কৃষকের কথা বিবেচনা করে সরকার এর চেয়ে অনেক কম দামে ডিজেল বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে।
এখানেই নতুন মূল্য সমন্বয়ের আরেকটি দিক সামনে এসেছে। জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে অসচ্ছল পরিবারকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিতে গিয়ে সামাজিক সুরক্ষার অর্থ সংকুচিত করার চেয়ে উভয় খাতের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন সরকারের লক্ষ্য।
কম দামের সুযোগে পাচারের ঝুঁকি : দাম সমন্বয়ের পেছনে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের ব্যবধানও বড় কারণ বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যে, কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলংকায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা। ফলে বাংলাদেশে অনেক কম দামে তেল বিক্রি হলে সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। সরকারের যুক্তি, বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আমদানি করা জ্বালানি দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেলে তা অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা-দুই দিকেই ক্ষতি তৈরি করবে। মূল্য ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে পাচারের সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি বিপিসির আর্থিক চাপও কমানো যাবে। এছাড়া বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিবহণ ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এ অবস্থায় দাম একেবারে অপরিবর্তিত রাখলে বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আরও বলেন, সামনে কোনো বিকল্প না থাকায় এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে দাম বাড়ানোর অভিঘাত যাতে পরিবহণ ভাড়া বা পণ্যের বাজারে অযৌক্তিকভাবে না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার নজরদারি জোরদার করেছে বলেও জানান তিনি। সরকারের এই মূল্য সমন্বয়ের মূল লক্ষ্য তাই শুধু তেলের দাম বাড়ানো নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য, বিপিসির লোকসান নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, পাচারের ঝুঁকি কমানো এবং একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান ধরে রাখা। তবে এর সুফল পেতে হলে বাজারে অতিরিক্ত ভাড়া বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে নজরদারি কার্যকর রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে সাময়িক সময়ের জন্য তেলের দাম বাড়িয়েছে। এটা ঠিকই আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার সাশ্রয়, বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তাদের। তাদের তেলের চাহিদার ২০ শতাংশ কমিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও সাশ্রয়ী হতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা এই মুহূর্তে বাড়ানো জনগণ ভালোভাবে মেনে নেবে না।
এ বিষয়ে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ যুগান্তরকে বলেছেন, তেলের দাম বাড়ানোর বিকল্প কিছু ছিল বলে মনে হয় না। তবে এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
