সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে পর্যালোচনা
পুলিশের ৮০ শতাংশ গাড়িই চলাচলের অযোগ্য
বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ * পল্লবী-রূপনগর ও মুন্সীগঞ্জের সংঘাতপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি
Advertisement
শেখ মামুনুর রশীদ ও নেসারুল হক খোকন
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যানবাহন ও জ্বালানি সংকটে ভুগছে পুলিশ বাহিনী। এজন্য মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিয়মিত টহল এবং অপরাধ দমনে বাহিনীকে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের বহরে থাকা যানবাহনের বড় অংশই বহু বছর ধরে অকেজো। এর মধ্যে গত আট বছরে যত সংখ্যক গাড়ি অকেজো হয়েছে, বিপরীতে নতুন গাড়ি কেনা হয়েছে অর্ধেকেরও কম। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রমে গতি আনতে এবং অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রতিবছর শুধু যানবাহন কেনায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে তারা।
জাতীয় সংসদ ভবনে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় কমিটির সদস্যরা মাঠপর্যায়ের নানা সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে কমিটির সদস্য মীর শাহ আলম ও মিয়া নূরুদ্দিন আহমেদ অপু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের অধিকাংশ জায়গায় গাড়ি ও জ্বালানি তেলের তীব্র ঘাটতি থাকায় পুলিশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। বিশেষ করে গ্রামীণ ও থানা পর্যায়ে যানবাহন এবং জনবলের অভাবে পুলিশের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন থানা, পুলিশের ভৌত অবকাঠামো ও যানবাহন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ বাজেটে তা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে বৈঠকে জানানো হয়।
জবাবে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কমিটিকে জানান, পুলিশের বহরে মোট যানবাহনের সংখ্যা ১৬ হাজার ২০০টি (যার মধ্যে ৯ হাজার ৮৭৮টি মোটরসাইকেল)। কিন্তু বর্তমান বহরের ৬ হাজার ২৫৫টি গাড়ির বয়স ৮ বছরের বেশি এবং ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৬৮২টি যান অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন কেনা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৪৯টি যানবাহন। তিনি জানান, প্রতিটি থানায় দুটি করে ডাবল কেবিন পিকআপ ও একটি করে সিঙ্গেল কেবিন পিকআপের প্রয়োজন। এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করার কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়ে বিতর্ক : বৈঠকে দেশজুড়ে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং এটি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। কমিটির সদস্য মো. নূরুল ইসলাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষ্য, শুধু মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে মাদক সেবনের অনুমোদন ও লাইসেন্সও দিয়ে থাকে সংস্থাটি। তাই এর নাম পরিবর্তন করে ‘মাদকদ্রব্য বিষয়ক অধিদপ্তর’ করার প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়া মাদক মামলায় নানা অসঙ্গতি ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা খুব সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে বলে কমিটির সদস্যরা বৈঠকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কমিটির সভাপতি মাদক মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের চরম সতর্কতা ও সুনির্দিষ্ট বিধান অনুসরণের বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আইনের ফাঁক দিয়ে অপরাধীরা যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে।
গণ-অভ্যুত্থানে বিতর্কিতদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন : জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বড় ধরনের মানসিক ট্রমা বা মোরাল ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। মাঠপর্যায়ে পুলিশের মুভমেন্ট ও চলাচলে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেওয়ায় তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনতে এবং মানসিক ক্ষতি পূরণে বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়াও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে যারা বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন কিংবা ইতোমধ্যে শাস্তি পেয়েছেন, তারা কীভাবে নরসিংদী বা ঢাকার আশপাশের থানায় ফের পদায়ন পাচ্ছেন-তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা। অবিলম্বে বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় বৈঠকে।
অপরাধ ঠেকাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ : বৈঠকে জানানো হয়, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাদকের আধিপত্যের কারণে প্রতিনিয়ত খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। গজারিয়া ও মুন্সীগঞ্জ থানার জন্য অতিরিক্ত গাড়ি বরাদ্দসহ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়া ঢাকার পল্লবী ও রূপনগর এলাকায় নিয়মিত খুন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় অপরাধের বিরুদ্ধে বিশেষ সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এছাড়া সীমান্ত নজরদারি ও সাইবার অপরাধ দমনে বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের জন্য ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়।
পুলিশে ১৪ হাজার পদ সৃষ্টির উদ্যোগ : বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনবল সংকট নিরসনে পুলিশের জন্য ১০ হাজার কনস্টেবল ও চার হাজার এসআই পদ সৃষ্টির প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া সার্জেন্টের ৪০০টি এবং এএসপির ৪৫০টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের জন্য আরও পদ সৃষ্টির প্রস্তাবও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রক্রিয়াধীন।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে এবং মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল রয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় রাখতে আইনশৃঙ্খল বাহিনী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের অত্যন্ত পেশাদারত্ব ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশের ১৪৭ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে : জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) এবং এর উপরের পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে ৩১ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় মামলা চলছে বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে।
কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে এএসপি ও এর উপরের পদমর্যাদার ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় মামলায় তাদের ২৮ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
