কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি
বেসরকারিতে নিম্নগতি সরকারিতে ঊর্ধ্বগতি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঋণের প্রবৃদ্ধি বেসরকারি খাতে একেবারে নিম্নগতি এবং সরকারি খাতে ঊর্ধ্বগতি-এই দুটি বিষয় দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর-তিন মাসে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ৫ শতাংশের বেশি। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল প্রায় ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়েনি। বরং ঋণাত্মক ছিল ২ শতাংশ। সরকারের রাজস্ব আয় কম হওয়ায় চলতি ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এছাড়া নভেম্বর থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন ভাতা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে বাড়তি ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। যে কারণে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে দেশে ও বৈশ্বিক বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণের কাজে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। যে কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। ফলে এ খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি একেবারেই নিম্নে। চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে এ খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ১ শতাংশেরও কম।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ছাপানো টাকায় নতুন ঋণ নেয়নি সরকার। বরং আগের নেওয়া ঋণের মধ্যে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করেছে। এছাড়া সরকারের নেওয়া বিভিন্ন ঋণের মেয়াদ পূর্তি হওয়ায় সেগুলোও পরিশোধ করা হচ্ছে। যে কারণে সরকারের নিট হিসাবে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম। তবে গ্রস ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি। তবে এক বছরের হিসাবে অর্থাৎ গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং বেসরকারিতে বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ।
একদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, অন্যদিকে ব্যয়বৃদ্ধি সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়িয়েছে। সরকার ঋণ নিয়ে আগের ঋণ পরিশোধ করছে। এ প্রক্রিয়ায় মঙ্গলবার সরকার ব্যাংক খাত থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিল পুনরায় ইস্যুর মাধ্যমে আড়াই হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণ নিয়েছে। এর বিপরীতে সুদের হার গড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ। একই সময়ে সমপরিমাণ ঋণ পরিশোধ করেছে। এছাড়া একই দিনে ইসলামী বন্ড ইস্যু করে প্রায় ৬৫৭ কোটি টাকা নতুন ঋণ নিয়েছে। সোমবার ট্রেজারি বিল ইস্যুর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে ৯ হাজার ৬১৩ কোটি টাকার নতুন ঋণ নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির হারে ঝুঁকি থাকলেও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। এর ওপর চাপ আরও কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিচ্ছে কম। বরং আগের ঋণও পরিশোধ করছে। এতে বাজারে ছাপানো টাকার প্রবাহ কমে আসবে। ফলে মূল্যস্ফীতিতেও চাপ কিছুটা কমবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। ফলে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি কিছুটা কমেছে। এসব মিলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে মিশ্র প্রবণতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণের যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, এটি কেবলই সরকারি খাতের ঋণের ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে অভ্যন্তরীণ ঋণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেড় শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ঋণাত্মক দশমিক ৪৭ শতাংশ। তবে এক বছরের হিসাবে অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ। এর বড় অংশই নিয়েছে সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি হচ্ছে। তবে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশ আদায় হয়েছে। বাকি ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল ঘাটতি। সরকারের একদিকে ব্যয় বাড়ার কারণে অর্থায়ন বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হচ্ছে। এ দুইয়ের সমন্বয়ে সরকারের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে।
