বিআইবিএমে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ
লুটপাট ঠেকানো না হলে অর্থনীতি নদীতে পড়বে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। সেই লুটপাটের কারণে অর্থনীতি লাইনচ্যুত হয়েছে। লুটপাটকারীদের এখনই ঠেকানো উচিত। তা না হলে ভভিষ্যতে অর্থনীতি শুধু লাইনচ্যুত হবে না। হয়তো নদীতে গিয়ে পড়বে। তাই অলিগার্ক বা লুটপাটকারীদের বিষয়ে এখনই সতর্ক হতে হবে। দেশের অর্থনীতি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ব্যাংকিং সম্মেলনের শেষ দিনে বৃহস্পতিবার তিনি এসব কথা বলেন। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন বুধবার শুরু হয়েছে। শেষদিনেও একাধিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত, সার্বিক অর্থনীতি, মুদ্রানীতি, খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংক খাতের সুশাসন নিয়ে অধিবেশন হয়েছে।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল ও ভঙ্গুর। এটি প্রায় বিলুপ্তির পথে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ও দেশের অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। অধিকাংশ ব্যাংক আজ ধ্বংসের ধারপ্রান্তে। বাজারের নিয়ম মেনে চললে এত দিনে এসব ব্যাংকের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু এই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নানা উপায়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব চেষ্টা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্রাহকদের আস্থার সংকট। ব্যাংক খাতে এত বেশি অনিয়ম হয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষই এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এই সংকটের মধ্যেও কিছু ব্যাংক ভালো করছে এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এটি আশার কথা। হয়তো এই ৪-৫টি ব্যাংক থেকে ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ব্যাংক খাত এখন পুরোপুরি সরকারমুখী হয়ে পড়েছে। সরকারি খাতে তারা বিনিয়োগ করে, তারল্য সংকট হলে সরকার থেকেই ধার নেয়। বেসরকারি খাতের দিকে তাদের কোনো নজর নেই। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, এ কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা দেশের শাসকরা এই রাষ্ট্রকে জনগণের রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচনা করেননি। তারা রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও সাম্রাজ্য মনে করেছেন। যেখান থেকে তারা নিজেদের লোকদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা বিলিয়ে দিয়েছেন। এটাই হচ্ছে দেশের মূল সমস্যা। যতক্ষণ এই সমস্যার সমাধান করা না হবে, ততক্ষণ দেশের কোনো উন্নতি হবে না।
এই অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত এ খোদা। স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব।
মূল প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত এ খোদা বলেন, ব্যাংকিং খাতে বিপরীতমুখী চাপ বিরাজ করছে। একদিকে কিছু ব্যাংক তারল্য সংকটে ভুগছে। অন্যদিকে কিছু ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য উপচে পড়ছে। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য ৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে তিন কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। রাজনৈতিক প্রভাবে দুর্বল শাসন, নমনীয় নীতিমালায় বারবার খেলাপি ঋণ নবায়নের সুযোগ দেওয়া ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি। ব্যাংক খাত থেকে কমপক্ষে ৫ লাখ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। আড়াই থেকে তিন লাখ কোটি টাকা রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বিদেশে পাচার করেছে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান ও প্রশাসন মিলে এসব টাকা পাচার করেছে।
অন্যান্য অধিবেশনে বক্তারা বলেন, ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে হলে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। নীতিসহায়তা দিয়ে ব্যাংক টিকিয়ে রাখার নীতি পরিহার করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকার নীতি গ্রহণ করা জরুরি। ব্যাংক দুর্বল হলে বা লুটপাট হলে এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সম্মেলনে ব্যাংক খাত সংস্কারের বেশকিছু পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল করা, ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংক খাতের সম্পদের সঠিক তথ্য বের করার কাজ হচ্ছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে ব্যাংক খাত অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী।
