বিশেষ শ্রেণির স্বার্থে ড্যাপ সংশোধনের অভিযোগ বিআইপির
পরিকল্পনা লঙ্ঘন করে ঢাকাকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে
পূর্বাচল-ঝিলমিলে অতিরিক্ত ভবন নির্মাণের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ * ‘পেশাজীবীহীন’ কারিগরি কমিটি বাতিলসহ সাত দফা দাবি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশেষ শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, জনস্বার্থ, পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনার মৌলিক নীতি উপেক্ষা করে ড্যাপে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানে ভারী শিল্প স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বাচল ও ঝিলমিলে অতিরিক্ত ভবন নির্মাণের সুযোগ এবং জলাধার সংরক্ষণের বিধান দুর্বল করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত ঢাকার বাসযোগ্যতাকে আরও বিপর্যস্ত করবে। অবিলম্বে বিতর্কিত সংশোধনী পুনর্বিবেচনা এবং স্বাধীন পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ববিহীন কারিগরি কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন সংগঠনটির নেতারা। ‘পরিকল্পনা না মানলে বাসযোগ্য ঢাকা নয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ১৪ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে ড্যাপ ২০২২-২০৩৫-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে শ্যামপুর-কদমতলীতে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী তিনটি প্লটের ভূমি ব্যবহার ‘উন্মুক্ত স্থান’ থেকে ‘ভারী শিল্প এলাকা’ করা হয়েছে। পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পে শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানিপ্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণের বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব সংশোধনীতে নগরের উন্মুক্ত স্থান, জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষণ হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে খতিয়ানে ভূমির শ্রেণির উল্লেখ থাকার শর্ত যুক্ত করায় বাস্তবে পানি ধারণকারী অনেক জমি সুরক্ষার বাইরে চলে যেতে পারে। এতে জলাবদ্ধতা, পরিবেশদূষণ ও নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনিতেই ঢাকা বায়ুদূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতা, উন্মুক্ত স্থানের সংকট এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় পরিকল্পনার মূল কাঠামো দুর্বল করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মু. মুসলেহ উদ্দিন হাসান বলেন, ২০২৩ সালে ড্যাপের গেজেট প্রকাশের পর একাধিক পর্যালোচনা ও সংশোধনের মাধ্যমে এটি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অথচ ১৪ অক্টোবরের গেজেটে হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকার পরিবর্তন বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে করা হয়েছে বলে বিআইপি মনে করে।
বিআইপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বর্তমানে ‘পরিকল্পনার ফ্যাসিবাদ’ চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে পরিকল্পনা ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে এসব কর্মকাণ্ড সরকারি সমর্থন ও বৈধতাও পেয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তনের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে পরিকল্পনা লঙ্ঘনের প্রবণতা আরও বেড়েছে।
অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ড্যাপ সংশোধনের ৯ সদস্যের কারিগরি কমিটিতে কোনো স্বাধীন পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ কিংবা নাগরিক প্রতিনিধি নেই। এমন কমিটি কর্তৃপক্ষের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করছে। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পর ড্যাপ পর্যালোচনার বিধান রয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনে সংশোধন করা গেলেও তা বিচ্ছিন্নভাবে করা উচিত নয়। তিনি পূর্বাচলে প্রকৃত আবাসনপ্রত্যাশীদের অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দপ্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং পরিকল্পিত আবাসন উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দেন।
সাত দফা দাবি : সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির পক্ষ থেকে সাত দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-ড্যাপের বিতর্কিত সংশোধনী স্বাধীন পর্যালোচনা ছাড়া কার্যকর না করা এবং জনস্বার্থবিরোধী প্রমাণিত হলে বাতিল; বর্তমান কারিগরি কমিটি বাতিল করে স্বাধীন পেশাজীবীদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন; সংশোধনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা; ভারী শিল্প স্থাপনের পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যের প্রভাব মূল্যায়ন; ড্যাপ সংশোধনে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত; সংশোধনীর যৌক্তিকতা সম্পর্কে রাজউকের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং দেশের সব নগর ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন (এসইএ) বাধ্যতামূলক করা।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সাবেক ও বর্তমান নেতাসহ বিভিন্ন পেশাজীবী উপস্থিত ছিলেন।
