কোয়ার্টারের মাঠও অনিরাপদ
সরকারি গাড়ির চাকায় পিষ্ট শিশু জায়েদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তিন বছরের শিশু আব্দুল্লাহ আল জায়েদ। মিরপুর-১ নম্বর পাইকপাড়া নিউ সি-টাইপ সরকারি কোয়ার্টারে থাকে তার পরিবার। অন্য ৮-১০টি শিশুর মতোই বেড়ে উঠছিল। প্রতিদিনের মতো আপন মনে খেলা করছিল বাসার সামনের মাঠে। এ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি পাজেরো (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-৬০৪৮) চাপা দেয় শিশুটিকে। গাড়ির চাকা উঠে যায় শিশুটির মাথার ওপর। বিষয়টি দেখতে পেয়ে দ্রুতই তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় নিউরোসাইন্স হাসপাতালে। তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শুক্রবার সকালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে শিশুটি। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে। এরপর গাড়িচালক মন্টু খানকে গ্রেপ্তার করেছে দারুস সালাম থানা পুলিশ।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, জায়েদকে চাপা দেওয়া গাড়িটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। গাড়ির চালক মন্টু খান ওই কোয়ার্টারের ১৩৬ নম্বর ভবনের তিন তলায় থাকেন। একই ভবনের নিচতলায় পরিবার নিয়ে থাকেন নিহত শিশুটির বাবা শাহিন হোসেন। তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর হিসাবে চাকরি করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নিচতলায় তাদের বাসা হওয়ায় জায়েদ ভবনের সামনের ছোট্ট জায়গাটুকুতে খেলত। কখনো বালু নিয়ে খেলত, কখনো ছোট্ট বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়াত। বাবা অফিসে থাকলে মা তাকে সঙ্গ দিত। আবার বাবা ফিরে এলে দুজনে তার সঙ্গে খেলতেন। যে শিশুর মুখে হাসি দেখতে প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন বাবা-মা, চোখের সামনে সেই সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় তারা।
শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, কোয়ার্টারের যে আঙিনা একসময় শিশুদের খেলাধুলা আর হাসিতে মুখর থাকত, সেখানে এখন শোকের মাতম। জায়েদের খেলার সঙ্গীরা থাকলেও শুধু সে নেই। দুর্ঘটনার পর থেকে ভবনটির পরিবেশ নীরব। নিচতলার দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশের দুটি ফ্ল্যাট তালাবদ্ধ দেখা যায়। তৃতীয় তলায় মন্টুর পরিবারের ফ্ল্যাটের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি থাকলেও কেউ দরজা খোলেননি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাওয়া শেষে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় শিশুটিকে চাপা দেন চালক। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, গাড়ি ঘোরানোর সময় চালক মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন।
কোয়ার্টারের এক বাসিন্দা বলেন, শিশুটি অনেক ছোট হওয়ায় তার পক্ষে ভালো-মন্দ বিচার করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু যিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তার তো বোঝা উচিত ছিল সেটি আবাসিক এলাকা। এখানে শিশুরা খেলবে, গাড়ির পেছনেও শিশু থাকতে পারে। তার মতে, কোয়ার্টারের ভেতরে যেখানে গাড়ি ঢোকাই নিষিদ্ধ, সেখানে কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই গাড়ি চালিয়ে একটি শিশুকে চাপা দেওয়া কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আবাসিক এলাকার ভেতরে শিশুদের চলাচল ও খেলাধুলার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। অথচ সেই নিরাপত্তার জায়গাতেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মামলার এজহারে শিশুটির বাবা অভিযোগ করেছেন, চালক গাড়ি দিয়ে শিশুটিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে শরীরের ওপর চালিয়ে যায় এবং মাথা চাকার নিচে চাপা দেয়। এতে মাথায় গুরুত্বর আঘাত পেয়ে নাক, কান ও মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। চালকের বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি চালানোর কারণে তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
এ বিষয়ে দারুস সালাম থানার এসআই আনোয়ার হোসেন বলেন, গাড়িটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কার জন্য বরাদ্দ, কে ব্যবহার করছেন সেটি তদন্ত চলছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মন্টু শেখ ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন। অসাবধানতাবশত দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
