স্মৃতিচারণ
‘আবাহনীর চলার পথ যেন মসৃণ থেকে মসৃণতর হয়’
Advertisement
আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, সাবেক তারকা ফুটবলার
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শুধু বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের নিয়ে শুরু হয় ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ। বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শহীদ শেখ কামাল ভাই ধানমণ্ডি এলাকার কয়েকজন তরুণকে নিয়ে আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামে নতুন একটি দল করেন। সেই দলটি ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগে অংশ নেয় ১৯৭২ সাল থেকে। শেখ কামাল ছাড়াও ওই দল গঠনে ভূমিকা ছিল হারুন ভাই, ওমর ভাই, বাদল ভাই, বরকত ভাই, কাদের ভাই, শেখ জামাল ভাই, সাহীন ভাই, তারেক ভাই, বুলু ভাইসহ আরও অনেকের। প্রথম থেকেই একটি ভালো দল গড়ার জন্য বিভিন্ন দল থেকে ভালো মানের খেলোয়াড়দের দলে ভিড়িয়ে ছিলেন তারা। অনিবার্য কারণ বশত ৭২ সালের লিগ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৩ সালে আবাহনী ভালো ফলাফল না করতে পারলেও ৭৪ সালে প্রথমবারের মতো লিগ শিরোপা ঘরে তোলে। আর এটি সম্ভব হয়েছিল শেখ কামাল ভাইয়ের সাংগঠনিক দক্ষতায়। শুধু ভালো দল গড়েই বসে থাকেননি, সুদূর ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে এসেছিলেন উইলিয়াম বিল হার্ট নামের বড় মাপের একজন কোচ। যিনি এক বছরেই পাল্টে দেন খেলার ধরন। ছোট ছোট পাস, দ্রুতগতি, ক্ষীপ্রতা- সব মিলিয়ে আধুনিক ফুটবলের তকমা লেপ্টে যায় আবাহনীর গায়ে।
মনে পড়ে ১৯৭৫ সালের কথা; শেখ কামাল ভাইয়ের আমন্ত্রণে যোগ দিই আবাহনীতে। মৌসুমের প্রথম টুর্নামেন্ট স্বাধীনতা কাপে নকআউট পদ্ধতিতে ১-০ গোলে পুলিশ ক্লাবের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়। প্রত্যাশা মতো ভালো খেলতে না পারায়
কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়। যেহেতু শেখ কামাল ভাই আমাকে পছন্দ করে দলে নিয়ে আসেন, তাই উনাকেও বন্ধুরা কথা শোনাতে ছাড়েনি উনার বন্ধুরা। তাদের কথার জবাবে কামাল ভাই বলেছিলেন, প্রথম ম্যাচ ভালো খেলতে পারেনি, তাই বলে ভবিষ্যতে ভালো খেলবে না; তা এই মুহূর্তে বলা ঠিক হবে না। তবে তোমাদেরও বলে রাখি, জহুরি জহর চেনে এ কথাটি মনে রেখ। আমার এই ছেলেটি আবাহনীকে অনেক অনেক সার্ভিস দেবে। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ের পর আবার নতুন করে লিগের জন্য প্রস্তুতিতে সবাই মনোযোগ দিলাম।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলতে গেলাম কুয়েতে। সেখানে বসেই শুনতে পেলাম দ্বিতীয় বিভাগ থেকে উঠে আসা ব্রাদার্স ইউনিয়ন ১-০ গোলে হারিয়ে দিয়েছে আবাহনীকে। কথাটা শুনে মনে হল আকাশ থেকে পড়লাম। টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়, লিগের প্রথম ম্যাচে হার; যেন নতুন এক চ্যালেঞ্জে পড়ে গেলাম। কুয়েত থেকে ফিরে এসে লিগে নিয়মিত একাদশে নিজেকে ভালোভাবে মেলে ধরলাম। ভিক্টোরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকও করলাম। প্রথম লিগের শেষ খেলায় চির প্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডানের কাছে ৪-০ গোলে হেরে কী যে লজ্জায় পড়েছিলাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সেই থেকে প্রায় তিন যুগ ধরে আবাহনী ও মোহামেডানের মর্যাদার লড়াইটি চলছিল হাড্ডাহাড্ডিভাবে। সে লড়াইগুলো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে দেখতে এসে কত মানুষ যে আহত হয়েছেন, তা আমার জানা নেই। বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছিল। আবাহনী ও মোহামেডানের খেলা হলে উভয় দলের লাখও সমর্থক স্টেডিয়ামের ভেতরে এবং বাইরে জড়ো হতেন। কেউবা মাঠে ঢুকে পড়তেন, কেউবা টিকিট না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে হতাশ বদনে বাসায় ফিরে যেতেন। সেসময় টেলিভিশন বলতে ছিল বিটিভি; তারা লিগের খেলা দেখাত না। সারা দেশের মানুষ রেডিও নিয়ে বসে থাকতেন ধারাভাষ্য শোনার জন্য।
শাহজাহান ভাই, হামিদ ভাই, মুসা ভাই, মন্জুর হাসান মিন্টু ভাইদের সুমধুর মিষ্টি কণ্ঠস্বর ক্রীড়ামোদিদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। পরবর্তীতে খোদা বক্স মৃধা, আলফাজ ভাই, চৌধুরী জাফর উলাহ সরাফত তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ক্লাব, কর্মকর্তা, খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বাংলাদেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তার পেছনে ধারাভাষ্যকারদের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়।
প্রথম লিগে ভালো খেলার সুবাদে মালয়েশিয়ায় মারদেকা কাপে খেলতে যাই। ২৮ জুলাই গিয়েছিলাম মালয়েশিয়ায়। ১৫ আগস্ট শেষ খেলা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে। সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই খবর পাই দেশে ক্যু হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। জাতীয় দলে সাতজন আবাহনীর খেলোয়াড় ছিলাম আমরা। সাতজনই মাইক্রোবাসে চড়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের অফিসে যাই খবরটির সত্যতার জন্য। সেখানে গিয়ে নিশ্চিত হই ঘটনাটি সত্যি। ভীষণ মন খারাপ করে ভিলেজে চলে আসি। আসার সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে আজকের ম্যাচে আমরা খেলব না। যেহেতু খেলাটি আন্তর্জাতিক তাই ইচ্ছে করলেই না খেলার সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। অবশেষে আমরা শর্ত দিলাম যে, আমাদের প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলা হয়েছে, তাই খেলার সময় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছিল।
১৬ আগস্ট ১৯৭৫ আমাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট বন্ধ থাকায় আসতে হয়েছিল ২৮ আগস্ট ১৯৭৫। ঢাকায় এসে সবাই যার যার বাসায় চলে যাই। কয়েক দিন পর ক্লাব থেকে খবর পাই খেলা আবার শুরু হবে, তাই প্র্যাকটিসে ডাকা হয়। আমরা বাসা থেকে সরাসরি আবাহনী মাঠে প্র্যাকটিসে আসতাম। আর যেসব খেলোয়াড় বাইরের জেলা থেকে দলে ছিল তারা হোটেল থেকেই প্র্যাকটিসে আসত। কেননা ১৫ আগস্টে আমাদের ক্লাব টেন্টটি লুট এবং বেদখল হয়ে যায়। প্র্যাকটিস শেষে গাছের নিচে বসেই নাস্তা সেরে নিতাম।
পট পরিবর্তনের পর প্রথম খেলার দিনটির কথা আজীবন মনে থাকবে। ইস্ট এন্ড ক্লাবের সঙ্গে খেলা, একে একে সবাই আমরা একত্রিত হই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের বাফুফের অফিসে, সেখানে সবাই ড্রেস পড়ে মাঠে নামি। ৪-৫ হাজার দর্শক ছিল।
সবাই আমাদের হাততালি দিয়ে বরণ করে নিল। খেলায় ৪-১ গোলে জয় পেয়েছিলাম। খেলা শেষে দর্শকদের ভালোবাসা আর শুনতে পাই ‘ওরা আজ এতিম, ওদের পাশে আল্লাহ আছে, আমরাও আছি’। সেই দিন থেকে যেন আবাহনীর সৃষ্টিশীল ফুটবলের স্বীকৃতি পাই এবং চলার পথ যেন মসৃণ থেকে মসৃণতর হয়।
