বিরোধীদের ঠেকাতে ছক শুভেন্দুর
পশ্চিমবঙ্গে বদলাচ্ছে রাজনীতির সমীকরণ
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রতীক শুধু নির্বাচনি পরিচয় নয়, একটি দলের ইতিহাস, সাংগঠনিক শক্তি, কর্মীদের আবেগ এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রতীক। সে কারণে মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল প্রতীককে ঘিরে চলমান টানাপোড়েনকে অনেকেই একটি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসাবে দেখছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি দিল্লির বঙ্গভবনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদব এবং এনসিপিআই-এর কয়েকজন সংসদ-সদস্যের বৈঠক নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে। বৈঠক নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো না হলেও রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, সেখানে তাৎক্ষণিক দলবদলের চেয়ে ভবিষ্যতের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত সংসদ-সদস্যদের আশ্বস্ত করেন-বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে শুধু আজকের বাস্তবতায় বিচার করলে ভুল হবে। সামনে লোকসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। তার মতে, ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা আসনের সংখ্যা বাড়লে নতুন রাজনৈতিক সুযোগও তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমান সংসদ-সদস্যদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
থাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার নিশ্চয়তা বা রাজনৈতিক ভূমিকার স্পষ্টতা না থাকলে অভিজ্ঞ নেতা বা সংসদ-সদস্যরা
সহজে নতুন সিদ্ধান্ত নেন না। সেই দিক থেকে শুভেন্দুর এ বার্তা সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনর্গঠনের একটি অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক বছরে শুভেন্দু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসাবে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। জেলা থেকে দিল্লি পর্যন্ত দলীয় যোগাযোগ বাড়ানো, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং সাংগঠনিক বিস্তারে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন বলে দলীয় নেতাদের দাবি। বিজেপির একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতা অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় ভিন্ন। এখানে শুধু দলবদল করলেই রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না। জনসমর্থন, সাংগঠনিক ভিত্তি এবং মানুষের গ্রহণযোগ্যতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই দলটি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে এগোতে চাইছে। তবে পুরো সমীকরণ এখনো জটিল। এনসিপিআই-এর কয়েকজন সংসদ-সদস্যের অবস্থান, দলত্যাগবিরোধী আইনের বিধান এবং নির্বাচন কমিশনের সামনে থাকা প্রতীকসংক্রান্ত বিষয় পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীকের স্বীকৃতি কোন পক্ষ পাবে, সেটিই আগামী রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, যদি বিদ্রোহী শিবির প্রতীকের স্বীকৃতি পায়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। আবার প্রতীক না পেলেও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না। কারণ, দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক প্রস্তুতির ওপরই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক পটভূমি থেকে আসা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের আগামী নির্বাচনের আগে প্রতীক, নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক শক্তিকে ঘিরে যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব শুধু একটি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
