দিল্লির বিক্ষোভে দমন-পীড়ন নিয়ে সাধারণ ভারতীয়দের ভাবনা
নাগরিকের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে
দ্য স্ক্রলের প্রতিবেদন
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দিল্লির পুলিশ যন্তর মন্তর ময়দানের দিকে অগ্রসরমান হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে শনিবার যখন আটক করছিল, তখন মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে বসে সামাজিকমাধ্যমে সেই খবরের ওপর গভীর নজর রাখছিলেন কীর্তি লাল। তিনি ভিডিওতে দেখেছেন-কীভাবে ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে ভারতের রাজধানী শহরে পৌঁছা বিমানের ভেতর থেকেই দিল্লি পুলিশ আটক করে। দেখেছেন কীভাবে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই তাদের জোর করে বাসে তোলা হয়; সাংবাদিকদের হেফাজতে নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের জমায়েত ঠেকাতে কীভাবে দিল্লিকে কার্যত ‘লকডাউন’ বা অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছিল। ৬৯ বছর বয়সি লাল বলেন, ‘নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।’
রোববার দ্য স্ক্রলের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনি তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার তরুণদের ওপর দিল্লির পুলিশের দমন-পীড়নের কঠোর সমালোচনা করেন লাল। এ প্রক্রিয়ার ফলে খসড়া তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। কীর্তি লাল বলেন, পুলিশের এ পদক্ষেপ ভারতীয় তরুণদের বিক্ষোভ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ভীতিকেই প্রতিফলিত করে। তিনি বলেন, ‘এ সরকার এমন সব কাজ করছে যার জন্য তারা অতীতে অন্য সরকারগুলোর সমালোচনা করত। বস্তুত, তারা এখন আরও খারাপ কাজ করছে।’
এসআইআর প্রক্রিয়ায় নিজের অভিজ্ঞতা নির্বিঘ্ন হলেও ভোটারদের নাম ব্যাপকভাবে বাদ দেওয়ার বিষয়টির বিরোধিতা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন লাল। তিনি বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে বিষয়গুলো কারচুপি বা প্রভাবিত করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ থাকার কথা, কিন্তু মনে হচ্ছে তাদের ঝোঁক একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদ-বিক্ষোভ জরুরি। যারা রাস্তায় নেমেছেন, তারা সঠিক কাজই করছেন। তারা জবাব চাইছেন।’
‘গভীর উদ্বেগের বিষয়’ : দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমনে যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে দ্য স্ক্রল আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে। মধ্য দিল্লি জুড়ে ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং ৪৫টি স্টেশনে মেট্রো চলাচল স্থগিত করা হয়। কলকাতার লিঙ্গ-অধিকার কর্মী প্রিয়দর্শিনী চিত্রাঙ্গদা পুলিশের এই পদক্ষেপকে ভিন্নমত দমনের ক্ষেত্রে ‘পুলিশি তৎপরতার এক অত্যন্ত গুরুতর পদক্ষেপ’ হিসাবে অভিহিত করেন, যা ‘গণতন্ত্রের জন্য গভীর উদ্বেগের’। তিনি বলেন, ‘যন্তর মন্তর ঠিক এ কারণেই রয়েছে। কারণ, গণতন্ত্রে এমন পরিসরের প্রয়োজন যেখানে নাগরিকরা সমবেত হতে পারেন এবং ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন। যথার্থ নিরাপত্তার কারণে রাষ্ট্র কোনো বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতেই পারে। কিন্তু সমাবেশ করাকেই কার্যত অসম্ভব করে তোলার বিষয়টি সঠিক নয়।’ যারা এ বিক্ষোভের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের ভোটাধিকার টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ৩৪ বছর বয়সি শিবানি ত্রিপাঠী দেখেন যে, মধ্যপ্রদেশের জবলপুর শহরে ভোটার তালিকা থেকে তার এবং তার বাবা-মায়ের নাম বাদ পড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-মা কয়েক দশক ধরে ভোট দিয়ে আসছেন। অথচ হঠাৎ করেই তাদের নাম তালিকা থেকে গায়েব হয়ে গেল।’ মুম্বাই-ভিত্তিক পরামর্শক শিবানির পক্ষে সেই নামগুলো পুনরায় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাতে দেড় মাস সময় লেগেছিল। শিবানি জানান, তিনি এমন অনেক প্রকৃত ভোটারের কথা জানেন, যারা তালিকায় নিজেদের নাম ফিরিয়ে আনার জন্য এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ভারতজুড়ে চলমান বিক্ষোভ এবং ভোটারদের এ ক্ষোভ ও জোরালো অবস্থান যৌক্তিক। শিবানির ভাষায়, ‘সরকার কেবল জনমত বা বয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। এটি একনায়কতন্ত্র।’ শিবানি ত্রিপাঠীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন পুনের বাসিন্দা তরুণী সায়ালিও। সায়ালি তার শহরে আয়োজিত এক বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে দেখেন, পুলিশ সদস্যের সংখ্যাই বেশি।
