কোন পথে ফিলিস্তিন
Advertisement
খালিদ বিন আনিস
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলি বর্বরতায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার প্রেক্ষাপটে গাজায় শাস্তি প্রতিষ্ঠায় ২০ দফা পরিকল্পনা সোমবার প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউজ। জানা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে এ পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের গাজায় থাকা কিংবা উপত্যকায় ফেরার ‘অনুমোদনের’ কথাও বলা হয়েছে। যদিও এ পরিকল্পনা হামাস প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে পশ্চিমা গণমাধ্যম বলছে, এরপরও এটির আংশিক বাস্তবায়ন করা হবে। তবে তা কীভাবে, বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। এদিকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ব্যাপারে যখন পশ্চিমের দেশগুলো একে একে সমর্থন জানাচ্ছে, ততদিনে ভূখণ্ডটি পরিণত হয়েছে জীবন্ত গোরস্তানে। সম্প্রতি যুগান্তরে প্রকাশিত এএফপির একটি ছবি যেন সে কথাই বলছে। ছবিতে দেখা যায়, গাজার দক্ষিণের শহর খান ইউনিসের কবরস্থানের মধ্যে তৈরি করা অস্থায়ী ক্যাম্পে রুটি তেরি করছেন ফিলিস্তিনি এক নারী, পাশে খাবারের অপেক্ষায় তিন শিশু। ছবিটি দেখলে যে কেউ বলবেন, এ যেন মৃতদের সঙ্গে বসবাস। ‘এ যেন’-এর মতো ‘উপমা’র ব্যবহার কখনো কখনো শুনতে মধুর শোনালেও এ অর্থে যে তা নয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উপমার অবান্তর ব্যবহারে সাহিত্যের কী ক্ষতি হয়, বা কী রূপে উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, সে আলোচনা বাদ দিয়ে বরং মৃতদের সঙ্গে বসবাসের যে উপমা ছবিটির ক্যাপশনে ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানকার ভয়াবহ বাস্তবতা উপমাকে ছাড়িয়ে কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে, সে আলোচনাই বরং করা যাক।
গেল দুবছরে মার্কিন মদদে ইসরাইল যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তাতে পশ্চিমা গণমাধ্যমের মতে, শুধু গাজাতেই এ পর্যন্ত নারী ও শিশু মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ষাট হাজার ছাড়িয়েছে। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পক্ষের দাবি এ সংখ্যা লক্ষাধিক। নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত ইসরাইলের হামলার লক্ষ্য থেকে বাদ যায়নি, চিকিৎসক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীরাও বা বলা যেতে পারে, ভূখণ্ডটিতে দাঁড়িয়ে যে-ই, ইহুদি অপরাধের সত্য তুলে ধরতে চেয়েছেন, জানিয়েছেন প্রতিবাদ, তাদের সবারই মুখ বন্ধে ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়েছে নেতানিয়াহু বাহিনী। এজন্য মানবাধিকার কিংবা আন্তর্জাতিক আইন, কিছুরই তোয়াক্কা তারা করেনি। করবেই বা কেন! স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে নির্মূলের নামে দুনিয়ার চোখের সামনে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশুদের হত্যা করে গেলেও ন্যাটো কিংবা আরব লীগের মতো সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ এখনো সেই টেবিলটকেই সীমাবদ্ধ।
হালে অবশ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। পশ্চিমা দেশগুলো, যারা ইহুদিবাদীদের অন্যতম বড়শক্তি, তারা এখন প্রকাশ্যেই এ হত্যাযজ্ঞের সমালোচনা করছে। সম্প্রতি জাতিসংঘেও ইউরোপের দেশগুলোর নেতারা তাদের ভাষণে এ গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। প্রকাশ্যে নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি। এমনকি ট্রাম্পের হুমকির পরও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র-যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া একযোগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন মিত্রদের এ জোরালো পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরাইল নীতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অন্য অর্থও খুঁজতে হবে। গোরস্তানে পরিণত করার পর দীর্ঘদিনের আলোচনার বস্তু দ্বিরাষ্ট্রের এ উদ্যোগ আসলে কি ট্রাম্প রিভিয়েরা বাস্তবায়নের ভিন্ন পথ?
একটু পেছনে যাওয়া যাক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতা নেওয়ার শুরু দিকে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দ্রুত ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ তিনি থামাবেন। কিন্তু দেখা গেল, তার রয়েছে আরও ভয়াবহ পরিকল্পনা। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, গাজাকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘রিভিয়েরা’ হিসাবে পুনর্গঠনের ভাবনা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। জানান, এ উপত্যকাকে নিজেদের অধীনে আনার কথা। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনির বলপ্রয়োগে স্থানান্তর ঘটানো হবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। এছাড়াও পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫ কোটিরও বেশি টন ধ্বংসাবশেষ এবং অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ অপসারণ করতে হবে। তখন প্রশ্ন ওঠে, এ অঞ্চল কীভাবে অধিগ্রহণ করা হবে। জবাবে ট্রাম্প সরাসরিই জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘এটি নিয়ে নেবে’। ট্রাম্পের এমন প্রস্তাবে বিশ্বের বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালেও ইসরাইল কিন্তু আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া দেখায়। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এ প্রস্তাবকে ‘বিপ্লবী ও সৃজনশীল’ হিসাবে প্রশংসা করেন। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে গুরুত্বপূর্ণ এ ভূখণ্ড চলে গেলেও ইসরাইলের কোনো আপত্তি নেই। তবে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি; তেমনই একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর জোরপূর্বক স্থানান্তর আন্তর্জাতিকভাবেও নিষিদ্ধ। ফলে বিষয়টি নিয়ে পানি ঘোলা হচ্ছে দেখে ট্রাম্প নেন কৌশলী পন্থা। প্রথমে তিনি এ পরিকল্পনা থেকে আংশিক সরে আসার কথা জানালেও পরে আবারও সেই অবস্থানেই দৃঢ় থাকার কথা জানান।
ট্রাম্প রিভিয়েরার মাধ্যমে মূলত এ মার্কিন ধনকুবের গাজার সম্পদ ও ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে বিলাসবহুল ইউটোপিয়া তৈরির স্বপ্ন দেখছেন। বিশ্ববাসীর তীব্র নিন্দার মধ্যেও যেভাবে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলিরা বর্বরতার পরিচয় দিচ্ছে, তাতে বোঝা কঠিন নয় যে, এর পেছনে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি বড় ধরনের পরিকল্পনা কাজ করছে। কাজেই যুদ্ধ বিরতিতে ট্রাম্প, ইসরাইলকে রাজি করালেও এখানেই যে নাটকের যবনিকাপাত হচ্ছে, তেমনটি মনে করার কারণ নেই। যেহেতু ট্রাম্প রিভিয়েরা বাস্তবায়ন করতে হলে এ ভূখণ্ডের ধ্বংসস্তূপ আগে পরিষ্কার করতে হবে, যা খুব ব্যয়বহুল, সেহেতু পরিস্থিতি শান্ত করার আড়ালে তিনি আদতে গোরস্তানের লাশ দিয়েই তা পরিষ্কার করতে চাইবেন। ট্রাম্প যে পথে হাঁটতে চাইছেন, তাতে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে বিচ্ছিন্ন করে মার্কিন সাম্রাজ্য বিস্তার করা হলেও পুঁজিবাদের নীতিতে অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে না। কারণ, পুঁজিবাদের চূড়ান্তরূপে অর্থনীতি, মানবতা ও আইন প্রতিবন্ধক নয়।
অবাক হওয়ার কিছু নেই, যদি নিজভূম থেকে উচ্ছেদ করা রেড ইন্ডিয়ানদের মতো গাজাবাসীকেও একসময় ফিলিস্তিনের আদিবাসী হিসাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত হতে হয়। এ কথা বলা এ কারণে যে, অতীতে নেটিভ আমেরিকানদের উচ্ছেদে যেসব অপকর্ম হয়েছে, তেমনটা যদি ফিলিস্তিনিদের ওপরও ট্রাম্প প্রয়োগ করতে চান, যেমন-‘উন্ডেড নি ম্যাসাকারে’র মতো চলমান (আরও ভয়াবহ) ফিলিস্তিন নিধনযজ্ঞের পর ১৮৩০ সালের ‘ইন্ডিয়ান রিমুভাল অ্যাক্ট’এর মতো কোনো আইন যদি সেখানে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপ করা হয়, অবাক হবেন না। এদিকে খাল কেটে কুমির আনছেন জেনেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এ নীতিকে সমর্থনই করছেন। তাতে যদি তলানিতে থাকা নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কিছুটা হলেও রক্ষা পায়। তবে ক্ষুদ্র হলেও এতে একটি শঙ্কা রয়েছে। অতীতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসা সাম্রাজ্য এবং রাজনৈতিক স্লোগান বা নীতির মধ্যে মালিকানা ও এক্সক্লুসিভিটি বা বিশেষ অধিকারের ওপর জোর দিতে দেখা গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই ট্রাম্প নিজেকে এবং তার সমর্থিত গোষ্ঠীকে (ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ধনীরা, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রকৃত আমেরিকান) কেন্দ্রে রেখেছেন, যেখানে তার দৃষ্টিতে অন্যরা ‘বহিরাগত’ বা ‘দখলদার’ হিসাবেই পরিলক্ষিত হয়েছে। অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত লাভের উদ্দেশে ট্রাম্প গাজা ভূখণ্ডকে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রে যদি পরিণত করেই ফেলেন, আর কোনো কারণে স্বার্থের আঘাতে নেতানিয়াহু যদি তার প্রতিবাদ করতে চান, তবে ট্রাম্পের পুঁজিবাদের চক্রে পড়ে ইসরাইলকেও ভুগতে হতে পারে।
খালিদ বিন আনিস : সাংবাদিক
