Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাস্তবতার আলোকেই নির্বাচন হওয়া উচিত

Advertisement

Icon

কর্নেল মো. ইলিয়াস হোসেন (অব.)

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাস্তবতার আলোকেই নির্বাচন হওয়া উচিত

Advertisement

পতিত শেখ হাসিনা সরকারের সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার হাবিবুল আউয়াল ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তার পদত্যাগের আগে দেওয়া বক্তব্যে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সমরূপতার (হোমজিনিটি) পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তাবনা রেখে যান, যা নিয়ে গত এক বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল এবং সুশীল সমাজে বেশ আলোচনা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ‘পিআর’ পদ্ধতিতে নির্বাচনে ব্যাপক আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে আগামীর নির্বাচন আয়োজন কিছুটা অনিশ্চয়তায় পড়বে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে এ পদ্ধতি আমাদের দেশের আম-জনতার কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য সেটাই সর্বাগ্রে বিবেচ্য।

বিশ্বে বেশ কয়েকটি প্রচলিত নির্বাচনব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে দেশগুলো তাদের জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচন করে। এখানে প্রধান নির্বাচন পদ্ধতিগুলো তুলে ধরা হলো-১. প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট, ২. আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর পদ্ধতি), ৩. রানঅফ নির্বাচন, ৪. র‌্যাংকড চয়েস ভোটিং, ৫. মিশ্র নির্বাচন ব্যবস্থা। প্রতিটি পদ্ধতির নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে, যা সেই দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। তবে আমি প্রথম দুটি পদ্ধতি নিয়েই আলাপ করতে চাই। কারণ, প্রথমটি বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত আছে, আর দ্বিতীয়টি আগামী নির্বাচনের অনুসরণের জন্য বিশেষ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রচারণা চলছে।

প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট (ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট) : এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে কাজ করা একটি পদ্ধতি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট আসনে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনি নির্বাচিত হন। ব্রিটেন, ভারত, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেও ওয়েস্ট মিনস্টার পদ্ধতিতে এ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন হয়ে আসছে। সুবিধা : এ পদ্ধতিতে ভোট গণনা এবং বিজয়ী নির্ধারণ সহজ ও সরল। এ ধরনের নির্বাচনে সাধারণত বৃহৎ দলগুলো জয়ী হয়, ফলে একক দল ক্ষমতায় আসে এবং স্থিতিশীল সরকার গঠিত হয়। এ ছাড়াও নির্বাচিত প্রার্থীর সঙ্গে তার নির্বাচনি এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। এতে ভোটের টার্ন-আউট ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। অসুবিধা : ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাধারণত এ পদ্ধতিতে সাফল্য অর্জন করতে পারে না। কোনো প্রার্থী নির্বাচনে হারলে তার পক্ষে দেওয়া ভোটগুলো কার্যত বিফলে যায়। ফলে এতে অসম প্রতিনিধিত্ব অর্থাৎ ভোটের সংখ্যা এবং আসনের অনুপাতের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (প্রপরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) : এ পদ্ধতিতে দলগুলো প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পায়। মূলত দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রতীকের ওপর ভোটিং হয় এবং দলগুলো তাদের প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে সংসদ-সদস্য মনোনীত করে। জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইসরাইলসহ বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। সুবিধা : এ পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোটের মূল্য থাকে এবং আসন বণ্টনে সঠিক প্রতিনিধিত্বের নিশ্চয়তা থাকে। ছোট দলগুলো সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায় এবং নানা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব সংসদে থাকে, যা নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য আনে। অসুবিধা : এ পদ্ধতির নির্বাচনে প্রায়ই কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, ফলে জোট সরকার গঠন করতে হয়, যা স্থিতিশীলতার অভাব তৈরি করতে পারে। এতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে, কারণ বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন হয়। তাছাড়া এলাকাভিত্তিক কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী না থাকা এবং দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় সংসদ-সদস্যরা সরাসরি এলাকাবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে কম বাধ্য থাকেন।

প্রতিটি নির্বাচন পদ্ধতির নিজস্ব সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট পদ্ধতিটি সহজ হলেও গণভোটের অপচয় ঘটায়। আনুপাতিক পদ্ধতি ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, তবে জোট সরকারের ঝুঁকি বাড়ায়। কোনো পদ্ধতিই এককভাবে নিখুঁত নয়, তবে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সঠিক নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রিটিশ আমল থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ওয়েস্ট মিনস্টার পদ্ধতিতেই সব জাতীয় নির্বাচন হয়ে আসছে। ব্রিটিশদের পর পাকিস্তান এবং ’৭১-এর পর স্বাধীন বাংলাদেশেও একই পদ্ধতিতে সব জাতীয় নির্বাচন ‘প্রথম পাস্ট দ্য পোস্ট’ পরিচালিত হয়ে আসছে, যা আমাদের আম-জনতার মজ্জাগত। এই পদ্ধতিতে প্রান্তিক ভোটারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের সুযোগ থাকে, ফলে ভোটারের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীও ব্যাপক জনসংযোগ করে নিজের বিজয় নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হয়। ফলে নির্বাচিত হওয়ার পরেও এলাকার প্রতি তার দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা তৈরি হয়।

আমাদের দেশের জন্য প্রচলিত পদ্ধতিই যথাযথ বলে মনে করি। এর পক্ষে যুক্তিগুলো হলো-১. পদ্ধতিটি আমাদের প্রান্তিক/তৃণমূল পর্যায়ের ভোটার থেকে শুরু করে শহরের সবারই জানা এবং ভোট গণনাও সহজ ও সরল। ২. এ পদ্ধতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী/নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে তৃণমূল ভোটারদের সরাসরি সংযুক্তি ঘটে যা এলাকার প্রতি জবাবদিহিতা এবং দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করে। ৩. এ পদ্ধতিতে ভোট কাস্টিং অনেক বেশি হয়, কারণ এতে উভয়পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে। ৪. নির্বাচিত প্রতিনিধি এলাকার সব ধরনের সমস্যার বিষয়ে অবগত থাকায় তার সমাধান এবং এলাকার উন্নয়নের জন্য জাতীয় সংসদে কথা বলার সুযোগ পেতে পারেন। একইভাবে তৃণমূল পর্যায়ের লোকজনও সরাসরি তাদের নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সমস্যার বিষয়ে অবগত করতে পারে। এতে সামাজিক বন্ধন অটুট থাকে।

অপরদিকে, আনুপাতিক সংখ্যার ভিত্তিতে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হলে, তাদের সঙ্গে তৃণমূল জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে, কারণ যিনি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হবেন, তিনি যে এলাকায় নির্বাচনের প্রচারণা করেছেন, সেই এলাকার প্রতিনিধি নাও হতে পারেন, এমনকি যিনি নির্বাচনে প্রচারণা করবেন, তিনি সদস্যপদ নাও পেতে পারেন। এ পদ্ধতিতে যে সমস্যা সবচেয়ে বড় আকারে দেখা দেবে তা হলো-

ক. কাস্টিং ভোটের সংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল কীভাবে তাদের অনুকূলে প্রাপ্ত সদস্যদের নির্বাচন করবেন, তা নির্ভর করছে দলের নীতিনির্ধারকদের ওপরে, যেখানে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এছাড়াও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু রাজনৈতিক দলের মধ্যেই যেখানে গণতন্ত্রের অভাব রয়েছে।

খ. দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দলের প্রচারণায় নিয়োজিত ব্যক্তির জনসংযোগ স্থাপনে আগ্রহের ঘাটতি পরিলক্ষিত হতে পারে, এতে সামগ্রিকভাবে ভোটের টার্ন-আউট ব্যাপক হারে কমে যেতে পারে। কেননা যিনি প্রচারণা করছেন, তিনি নিজেই জানেন না তিনি আসলেই সদস্যপদ পাবেন কিনা। ফলে স্থানীয় তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতার জনবিচ্ছিন্নতা ঘটতে পারে। এটা সার্বিকভাবে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল।

গ. অনেকের ধারণা, এ পদ্ধতি অনুসরণের ফলে নির্বাচিত সরকারের স্বৈরাচারী হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে, আমি তা মনে করি না। কারণ কোনো বড় দল যদি দ্বিতীয়/তৃতীয় সারির কোনো দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করে, তাতে প্রতিবারেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পাবে, চারিত্রিকভাবে তারাও যদি চায়, স্বৈরাচারী হওয়া থেকে তাদেরকে কি বিরত রাখা যাবে?

তাই নির্বাচন পদ্ধতির দিকে নজর না দিয়ে আমাদের উচিত চিন্তাভাবনায় সততা, নিষ্ঠা, ন্যায্যতা ও সমতার ভিত মজবুত করা। পদ্ধতি যেটাই হোক, আমরা নিজেরা নৈতিকভাবে যতদিন না সৎ, নিষ্ঠাবান ও মানবিক হতে পারব, ততদিন আমাদের সমাজ থেকে এ জঞ্জাল দূর হবে না। তাছাড়া নেতা নির্বাচনেও আমাদের প্রচলিত পদ্ধতি ও ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। রাজনীতির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে নেতা সময়ের দাবি বুঝতে পারেন, তিনিই স্থায়ীভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। তাই এ সময়ে শুধু প্রতিশ্রুতিতে নয়, বরং সৎ, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিসচেতন, মানবিক, উদ্ভাবনসম্পন্ন, জবাবদিহিমূলক ও দূরদর্শীসম্পন্ন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

কর্নেল মো. ইলিয়াস হোসেন, পিএসসি, পিইঞ্জ (অব.) : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, কলামিস্ট

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম