Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

Advertisement

Icon

আবু হেনা রাজ্জাকী

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি। এসব প্রতিষ্ঠান কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; বরং রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কয়েকজন সদস্যের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকর সুরক্ষা সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির চা পানের আমন্ত্রণের পরপরই কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। ঘটনাটি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোনো অপ্রকাশিত চাপ কাজ করেছে, তা নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী যদি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির চায়ের আমন্ত্রণের পরদিনই পদত্যাগ করেন, তাহলে তার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়? রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তাই বা কতটুকু? যারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তারা কি এতটাই সরল, শুধু চা পান করেই স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে দেন? নাকি এ আপাতনিরীহ সৌজন্যমূলক আমন্ত্রণের আড়ালে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যা প্রকাশ্যে আসেনি? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দায়ী করাও সমীচীন নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৭ থেকে ১৪১ অনুচ্ছেদে সরকারি কর্ম কমিশনের গঠন, নিয়োগ, কার্যকাল ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিধান রয়েছে। বিশেষত ১৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্ধারিত কার্যকাল রয়েছে এবং সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পদ্ধতি ও কারণ ছাড়া তাদের অপসারণ করা যায় না। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে লিখিতভাবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগও রয়েছে। এ সাংবিধানিক বিধানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো, কমিশনের সদস্যরা যেন কোনো মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তার অসন্তুষ্টির আশঙ্কা ছাড়াই স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু যাকে অপসারণ করতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তাকে যদি অনানুষ্ঠানিক চাপের মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই সুরক্ষার বাস্তব কার্যকারিতা কোথায় থাকে?

স্বেচ্ছায় পদত্যাগ এবং চাপের মুখে পদত্যাগ কখনো এক বিষয় হতে পারে না। পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ থাকলেই যে সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে গৃহীত হয়েছে, তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয় না। আবার চায়ের আমন্ত্রণের পর পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে বলেই চাপ প্রয়োগের অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিতে চায়ের আমন্ত্রণ সৌজন্য ও আন্তরিকতার প্রতীক। কিন্তু সেই আমন্ত্রণের অব্যবহিত পরে একাধিক সাংবিধানিক পদাধিকারীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটলে আমন্ত্রণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা জনমনের সন্দেহ দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। কানাডার পাবলিক সার্ভিস কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দেশটির পাবলিক সার্ভিস অ্যামপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী কমিশনারদের সাত বছরের মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের অপসারণের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যের সিভিল সার্ভিস কমিশন একটি স্বাধীন আইনগত প্রতিষ্ঠান, যেখানে সরকারি নিয়োগে মেধা, ন্যায্যতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিট সিস্টেমস প্রটেকশন বোর্ড সরকারি কর্মচারীদের নির্দিষ্ট ধরনের অন্যায্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো বাংলাদেশের পিএসসির সঙ্গে অভিন্ন নয়, তবু রাজনৈতিক প্রভাব থেকে প্রশাসনিক ন্যায্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক।

এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একটি মৌলিক শিক্ষা পাওয়া যায়-প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা শুধু সংবিধান বা আইনে ঘোষণা করলেই নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন কার্যকর সুরক্ষা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক সংযম এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারের এ সংযমই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার অন্যতম পরিচায়ক।

আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনের একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা হলো, সরকার পরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে পরিবর্তন আনার প্রবণতা। কখনো সংস্কারের নামে, কখনো প্রশাসনিক প্রয়োজনের যুক্তিতে, আবার কখনো রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশ্যই কোনো পদাধিকারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অযোগ্যতা কিংবা অসদাচরণের অভিযোগ থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়াই কাউকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার যুক্তিসংগত কারণ হতে পারে না। আজকের সরকার যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, ভবিষ্যতের সরকারও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। এভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিবর্তনশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ নাগরিকদের। বিশেষত সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ যে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভরশীল, সেই প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পিএসসির সদস্যদের নিয়োগ, পদত্যাগ কিংবা অপসারণ যদি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে, তাহলে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল, মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন এবং চূড়ান্ত সুপারিশের নিরপেক্ষতা নিয়েও সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। বাস্তবে কোনো অনিয়ম না ঘটলেও এমন সন্দেহ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।

এখানে সাংবিধানিক পদাধিকারীদের নিজেদের নৈতিক দায়িত্বের বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া শুধু সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা ভোগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাহস, সততা এবং সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতা। কোনো পদাধিকারী অনৈতিক চাপের মুখে পড়লে তার উচিত আইনসম্মতভাবে প্রতিবাদ করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা। তবে প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনে কোনো পদত্যাগকারীকে দুর্বল বা আপসকামী আখ্যা দেওয়াও অনুচিত। একইসঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সাংবিধানিক পদাধিকারীকে শুধু ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করতে হবে না; কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাই তাকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা দেবে।

সাম্প্রতিক পদত্যাগগুলোর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সাংবিধানিক পদাধিকারীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ যাচাই এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকার, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজ-সবার উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সুবিধার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অপরিহার্য শর্ত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এগুলো রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিষ্ঠান। সরকার আসবে, সরকার যাবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকতে হবে। সংবিধান যাকে অপসারণের বিরুদ্ধে বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে, তাকে যদি চায়ের টেবিলে বসিয়ে পদত্যাগ করানো সম্ভব হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই-সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কি বাস্তব নিরাপত্তা, নাকি শুধু কাগজে লেখা কিছু প্রতিশ্রুতি?

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা তার সংবিধানে কত সুন্দর বিধান রয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং ক্ষমতাবানদের প্রভাবের মুখেও সেই বিধান কতটা কার্যকর থাকে, তা দিয়েই বিচার করতে হবে।

আবু হেনা রাজ্জাকী : অ্যাডভোকেট ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম