Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

Advertisement

Icon

ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং একমাত্র দূরশিক্ষণভিত্তিক বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। জনবহুল, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যপূর্ণ ও আর্থ-সামাজিকভাবে অসম বাংলাদেশে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে স্কুল ব্রডকাস্টিং পাইলট প্রকল্প, ১৯৮৩ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি এবং ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডিসট্যান্স এডুকেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দূরশিক্ষার যে ভিত্তি গড়ে ওঠে, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাউবির মূল দর্শন ‘সবার জন্য শিক্ষা’ (Education for All) এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার (Lifelong Learning) সুযোগ নিশ্চিত করা। বয়স, পেশা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কেউ যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য। আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার, নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মমুখী জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বাউবি কাজ করে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠার ৩৪ বছরের পথচলায় বাউবি দেশের শিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্কুল অব এডুকেশনের বিএড প্রোগ্রামের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সাতটি স্কুলের অধীনে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো হলো-স্কুল অব এডুকেশন, স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস, হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ, ওপেন স্কুল, স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, স্কুল অব বিজনেস, স্কুল অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট এবং স্কুল অব ল।

বর্তমানে বাউবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। ৫৫টি একাডেমিক প্রোগ্রামে ওপেন অ্যান্ড ডিসট্যান্স লার্নিং (ওডিএল) ও ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে তিন লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। নিয়মিত শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষকে শিক্ষা ও কর্মজীবনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির সুযোগ করে দেওয়া বাউবির অন্যতম সাফল্য।

শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক

বিকেন্দ্রীকরণেও বাউবি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গাজীপুরে মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সারা দেশে রয়েছে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং প্রায় দেড় হাজার স্টাডি সেন্টার। এ বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। পাঠ্যসামগ্রী প্রণয়ন, অডিও-ভিডিও শিক্ষা উপকরণ তৈরি, টিউটোরিয়াল কার্যক্রম, পরীক্ষা পরিচালনা ও শিক্ষার্থীসেবা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়টির রয়েছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনা। দেশের বাইরেও দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কর্মমুখী ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে বাউবির একাডেমিক কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে ‘নিশ-৩’ প্রোগ্রামের আওতায় এসএসসি ও এইচএসসি কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চাহিদা বিবেচনায় কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়নের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এ কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব হলো গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের অগ্রগতিতে অবদান রাখা। এ লক্ষ্যেও বাউবি কাজ করছে। কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় গবেষণাগারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি

বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রচারের জন্য কেন্দ্রীয় জার্নাল ও সাতটি স্কুলের নিজস্ব জার্নাল প্রকাশের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামীর বাউবির অন্যতম অগ্রাধিকার ডিজিটাল রূপান্তর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। অনলাইন ভর্তি ও নিবন্ধন, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী, পরীক্ষা ও ফলাফল ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক অটোমেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীসেবা আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা সম্ভব। একইসঙ্গে শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন, ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা, ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও মাইক্রোক্রেডেনশিয়াল চালুর মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বাড়াতে হবে।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ডিজিটাল পেডাগজিতে প্রশিক্ষণ, মোবাইল অ্যাপ ও ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করা জরুরি। পাশাপাশি নারী, প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক ও কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের জন্য নমনীয় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ই-নথি ও অটোমেশন ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অতীতের অর্জন মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বাস্তবায়নের নতুন প্রত্যয় গ্রহণের উপলক্ষ্য। প্রতিষ্ঠার মূল দর্শন-সবার জন্য শিক্ষা, সুযোগের সমতা ও জীবনব্যাপী জ্ঞানচর্চাকে ধারণ করে বাউবিকে আরও আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করাই আমাদের লক্ষ্য। গুণগত শিক্ষা, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ, স্বচ্ছ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক সেবার সমন্বয়ে বাউবি জাতীয় উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

সাংবিধানিক রক্ষাকবচ কোথায়

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

আগামীর প্রত্যয়ে বাউবি

শতফুল ফুটতে দাও পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

পরিচ্ছন্ন ঢাকা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম