সুদানে নৃশংসতা : আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের গোপন আঁতাত
Advertisement
অস্কার রিকেট
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম সরাসরি বলেননি। সম্প্রতি নায়েগ্রা জলপ্রপাতের কাছে অনুষ্ঠিত জি৭ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেছিলেন যে, তার সরকার জানে সুদানে [নৃশংসতা পরিচালনাকারী] র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে কারা অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং এ সমর্থন অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।
সুদানের এল-ফাশেরে এ নৃশংসতার মধ্যে রয়েছে ব্যাপক ধর্ষণ এবং হত্যা। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, নিহতদের রক্ত রাস্তায় জমাট বেঁধে আছে। বেসামরিক নাগরিকদের লুট করা হয়েছে এবং মুক্তিপণ হিসাবে ধরে রাখা হয়েছে। নারীদের অপহরণ করা হয়েছে।
এল-ফাশেরের গণহত্যার ভয়াবহতা বিশ্বজুড়ে সরকার এবং জনগণের মনোযোগ সুদান যুদ্ধে ইউএই-এর ভূমিকার দিকে নতুন করে আকর্ষণ করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে সমর্থন করার বিষয়টি ক্রমাগত অস্বীকার করছে। কিন্তু স্যাটেলাইট চিত্র, অস্ত্রের সিরিয়াল নম্বর, ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা এবং সুদান ও বাইরের কয়েক ডজন সূত্র এর বিপরীত প্রমাণ সরবরাহ করছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুদানে ইউএইকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও তারা আরএসএফকে রসদ সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমিরাতের ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে তাদের সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে।
সোমালিয়ার আধা-স্বায়ত্তশাসিত পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের বোসাসো একটি প্রাণবন্ত বন্দর শহর। এটি এডেন উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলে সুয়েজ খাল, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশকারী গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে অবস্থিত।
এ অভিযান সম্পর্কে অবগত মার্কিন সূত্র এবং পুন্টল্যান্ড প্রশাসনের কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন যে, ইউএই সুদান আরএসএফকে সরবরাহের জন্য বোসাসোকে একটি মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করলেও যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সোমালিয়ার অভ্যন্তরে অভিযান পরিচালনার জন্য একটি লঞ্চপ্যাড হিসাবে ব্যবহার করছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ করা ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা বোসাসো এবং এ অঞ্চলে অবস্থিত সরকারি মার্কিন ঘাঁটিগুলোর মধ্যে একটি সংযোগও প্রকাশ করেছে।
ইরান, হুথি এবং ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়দার মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর আকারে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউএই-এর সাধারণ আঞ্চলিক শত্রু রয়েছে। ইউএই প্রথম উপসাগরীয় রাষ্ট্র যারা ইসরাইলের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহু যৌথ সামরিক ও গোয়েন্দা প্রকল্পে জড়িত।
হাডসন প্রশ্ন করেন, “যখন প্রাণঘাতী সরঞ্জামের গুদাম থাকে, তখন কেউ কীভাবে আলাদা করবে যে কোনটি আরএসএফের কাছে যাচ্ছে আর কোনটি সন্ত্রাসবিরোধী লক্ষ্যবস্তুর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে? এটা ইউএই-এর এক ধরনের বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। কারণ এটি ‘সাদা অভিযান’কে ‘কালো অভিযান’-এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার নিখুঁত কৌশল। এতে সবকিছু ‘ধূসর অভিযান’-এ পরিণত হয় এবং তা চলতেই থাকে।”
বোসাসো এবং সোমালিয়ার আরেকটি আমিরাতি ঘাঁটি বেরবেরা একা নয়। ইউএই লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের চারপাশে নিয়ন্ত্রণের একটি বলয় তৈরি করেছে, যা গত কয়েক বছরে তার মিত্র এবং ক্লায়েন্টদের দখলে থাকা অঞ্চলে ঘাঁটি তৈরি বা উন্নত করেছে।
সুদানের জননীতি সংস্থা ‘ফিকরা’-এর পরিচালক আমগাদ ফারিদ এলতায়েব মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘ইউএই এডেন উপসাগর এবং লোহিত সাগরের চারপাশে সমুদ্র পথ নিয়ন্ত্রণ করতে অত্যন্ত আগ্রহী। ইউএই ১৯ শতকের ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যিক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পটি মূলত অস্থিরতা তৈরি করা এবং তারপর সমুদ্র বন্দরগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ওপর নির্ভর করে, যেমনটি ইউএই ইয়েমেনে আদেন বন্দরের ক্ষেত্রে করেছে।’
লোহিত সাগর ছাড়াও সুদান প্রচুর কৃষিজমি এবং প্রচুর খনিজসম্পদ সরবরাহ করে। ২০২৪ সালে সুদানের অফিশিয়াল স্বর্ণ রপ্তানির ৯০ শতাংশ ইউএইতে গিয়েছিল, যা ৫৩.৪ বিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ রপ্তানি রাজস্বের খবর দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য বোসাসো ব্যবহার করছে, তখন মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ করা ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটা থেকে জানা যাচ্ছে, মার্চ ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৫-এর মধ্যে ৭৭টি ফ্লাইট পুন্টল্যান্ড বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছে। এটি প্রমাণ করে বোসাসো সুদানের দিকে ইউএই-এর ‘এয়ার ব্রিজ’-এর একটি স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে।
গত মাসে বোসাসো বন্দরের একজন সিনিয়র ম্যানেজার মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছিলেন, গত দুবছর ধরে ইউএই বোসাসোর মাধ্যমে বিপজ্জনক হিসাবে চিহ্নিত ৫ লাখেরও বেশি কন্টেইনার পাঠিয়েছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে যুদ্ধরত সুদানের অভ্যন্তরেও ইউএই-এর দুটি ঘাঁটি রয়েছে : দক্ষিণ দারফুরের ন্যালা এবং উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল-মালহা।
এখন ট্রাম্পের ঘোষণার পর যে তিনি সুদানের দিকে মনোযোগ দেবেন, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ইতোমধ্যেই চলমান ক্ষমতার লড়াই আরও তীব্র হওয়ার মঞ্চ তৈরি হয়েছে।
উত্তর আফ্রিকা এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক জালাল হারচাউই মিডল ইস্ট আইকে বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প সব সময়ই সৌদি আরবের প্রতি বেশি মুগ্ধ এবং সহানুভূতিশীল ছিলেন। এর বিপরীতে, মার্কিন-সৌদি ঘনিষ্ঠতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের বিপরীতে ইউএই-এর প্রতি ওয়াশিংটনের সন্তুষ্টি সাম্প্রতিক এবং কৃত্রিম মনে হয়। ইউএইকে প্রায়ই একটি স্বেচ্ছাচারী ‘নেশন-স্টার্টআপ’ হিসাবে দেখা হয় এবং এখন এটিকে ইসরাইলের অভিন্ন যমজ হিসাবে মনে করা হয়।”
আপাতত, মনে হচ্ছে সুদান মার্কিন প্রেসিডেন্টের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘সুদানে ভয়াবহ নৃশংসতা চলছে।’
ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি মহান সভ্যতা এবং সংস্কৃতি হিসাবে বিবেচিত হতো, দুর্ভাগ্যবশত যা এখন খারাপের দিকে গেছে। আমরা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর এবং অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারের সঙ্গে কাজ করব, যাতে এ নৃশংসতা বন্ধ হয় এবং একইসঙ্গে সুদানে স্থিতিশীলতা আসে।’
যখন ট্রাম্প পোস্ট করছিলেন, তখন বোসাসোর দিগন্তে আরেকটি আইএল-৭৬ দৃশ্যমান হলো, রানওয়ের কাছে এসে অবতরণ করল। এর ইঞ্জিনের শব্দ শহরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তরিত
অস্কার রিকেট : সাংবাদিক। তিনি মিডল ইস্ট আই, ভাইস, গার্ডিয়ান, ওপেনডেমোক্র্যাসি, বিবিসি, চ্যানেল ৪, আফ্রিকা কনফিডেনশিয়ালসহ বিভিন্ন মিডিয়ার হয়ে কাজ করেছেন।
