Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

চব্বিশোত্তর বাংলাদেশ বিনির্মাণ : তারুণ্যের ভাবনা ও বিএনপি

Advertisement

Icon

ড. এ কে এম মতিনুর রহমান

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চব্বিশোত্তর বাংলাদেশ বিনির্মাণ : তারুণ্যের ভাবনা ও বিএনপি

Advertisement

বাংলাদেশের প্রতিটি যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা থেকে সাম্প্রতিক সামাজিক আন্দোলন-সবখানেই তরুণরা ছিলেন নেতৃত্বের প্রাথমিক শক্তি। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন সেই ঐতিহ্যের আধুনিক পুনরাবৃত্তি। এটি কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের তরুণ চেতনার জাগরণ, যেখানে ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ এবং সুশাসনের দাবিই নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এ আন্দোলন প্রমাণ করেছে, তরুণরা কেবল প্রতিবাদী নয়; তারা দেশের গঠনমূলক পরিবর্তনের স্থপতি। তারা জানে, একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের সংমিশ্রণ। বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তারা নিজস্ব উদ্যোগে দেশের অগ্রগতির নতুন মানচিত্র তৈরি করছে।

জুলাই আন্দোলন ২০২৪ : তরুণদের চেতনার পুনর্জন্ম

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা যখন শিক্ষা, চাকরি, সামাজিক ও প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে, তখন তারা কেবল প্রতিবাদ নয়, বরং নতুন রাষ্ট্র কাঠামো ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বান জানান।

তাদের স্লোগান ছিল স্পষ্ট আমরা চাই ন্যায়, আমরা চাই সুযোগ, আমরা চাই পরিবর্তন।

গবেষণা দেখা যায় (BBS, 2023) বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ তরুণ-যারা ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। প্রায় ৫ কোটিরও বেশি তরুণ আজ দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। তবে বাস্তব চিত্র হলো, এ বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অসুবিধা এখনো অতিকায় চ্যালেঞ্জ। ILO (2023) রিপোর্ট অনুসারে, উচ্চশিক্ষিত যুবকের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ১২ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। এ প্রেক্ষাপটে জুলাই আন্দোলন এক ধরনের সামাজিক ও নৈতিক জাগরণের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও তরুণদের প্রত্যাশা

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের মূল ভিত্তি হলেও এর কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা তরুণদের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বিকশিত হতে বাধাগ্রস্ত করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বাস করে-উন্নয়ন কেবল তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষা হবে দক্ষতা, নৈতিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থাকলেও ব্যবহারিক দক্ষতার অভাব তাদের কর্মসংস্থানে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো মূলত ডিগ্রিকেন্দ্রিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ, যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষার জন্য পড়ছে, জীবনের জন্য নয়।

তরুণরা চায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষা হবে উদ্ভাবনের কেন্দ্র, উদ্যোক্তা তৈরির প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগানোর মাধ্যম। তারা চায় শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি Artificial Intelligence (Al), Robotics, Data Science, Renewable Energy & Entrepreneurship-এর মতো আধুনিক বিষয়ভিত্তিক ল্যাব ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে, তবে তরুণরা বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।

এতে তারা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরিদাতা, উদ্ভাবক ও সামাজিক পরিবর্তনের অংশীদার হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে শিক্ষার সঙ্গে শিল্প, গবেষণা ও প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা যুক্ত করতে হবে, যাতে তাত্ত্বিক জ্ঞান বাস্তব প্রয়োগে পরিণত হয়। তরুণরা এমন এক শিক্ষা কাঠামো কামনা করে, যেখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে শুধু সনদ নয়, বরং দক্ষ নাগরিক ও নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা।

রাষ্ট্রদর্শন ও তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি : জিয়াউর রহমানের স্বনির্ভরতা ও উৎপাদনমুখী বাংলাদেশ

চব্বিশোত্তর বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে। তিনি এমন এক রাষ্ট্রনায়ক, যিনি স্বাধীনতার পর ভগ্ন অর্থনীতি, হতাশ জাতি ও সীমিত সম্পদ নিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। তার মূল বিশ্বাস ছিল ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মানুষের মেধা, শ্রম ও স্বনির্ভরতার মধ্যে।’

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো স্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ অর্থনীতি। তার যুগান্তকারী উদ্যোগ যেমন-‘খাল খনন’, গ্রামীণ কৃষি পুনর্জাগরণ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠন আন্দোলন-এসব ছিল জনগণের অংশগ্রহণনির্ভর উন্নয়নের মডেল। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত উন্নয়নের সুষম প্রবাহ থাকবে। ‘খাদ্যে স্বনির্ভরতা’ তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল, যা পরবর্তীতে দেশের কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটায়।

তারেক রহমান : প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবনী ও নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক

তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক নেতার প্রতিচ্ছবি, যিনি অতীতের আদর্শকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করেন। তার নেতৃত্বের দর্শন কেবল রাজনীতির সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং এটি এক আধুনিক, নৈতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রগঠনের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার কেন্দ্রে থাকতে হবে তরুণদের-তবে সেই তরুণ হতে হবে শিক্ষিত, নৈতিক, প্রযুক্তিদক্ষ ও দেশপ্রেমিক।

তরুণদের বর্তমান ভাবনা ও চব্বিশোত্তর বাংলাদেশ

জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এক নতুন চেতনায় জেগে উঠেছে। তারা এখন আর কেবল প্রতিবাদের প্রতীক নয়; বরং গঠনমূলক পরিবর্তনের স্থপতি। এ প্রজন্ম বুঝতে পেরেছে-একটি রাষ্ট্রকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে শুধু আন্দোলন নয়, প্রয়োজন মূল্যবোধ, উদ্ভাবন এবং নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়। তাদের ভাবনায় চব্বিশোত্তর বাংলাদেশ হবে এমন এক দেশ, যেখানে গণতন্ত্রের প্রাণ থাকবে জনগণের হাতে, আর উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকবে তরুণদের সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ।

তরুণদের চাওয়া বাংলাদেশে শিক্ষাই হবে উন্নয়নের ভিত্তি। তারা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চায়, যেখানে মানবিকতা ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটবে। শিক্ষা হবে কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য-যেখানে একজন শিক্ষার্থী শিখবে কীভাবে মানুষ হতে হয়, কীভাবে সমাজে পরিবর্তন আনতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণে তারা গড়তে চায় দক্ষ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক সমাজ।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তরুণদের স্বপ্ন স্পষ্ট। তারা চায় এমন এক অর্থনীতি, যেখানে উদ্ভাবন হবে অগ্রগতির চালিকাশক্তি এবং প্রত্যেকে অংশ নিতে পারবে উন্নয়নের সুফলে। তারা বিশ্বাস করে, অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধি ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তারা স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করছে। তাদের দৃষ্টিতে কর্মসংস্থান মানে শুধু চাকরি নয়; বরং নতুন কিছু সৃষ্টি করা, অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরি করা।

প্রশাসনে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করাও তরুণদের অন্যতম অঙ্গীকার। তারা চায় একটি সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং জনসেবা হবে মূলনীতি। তরুণরা মনে করে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি কমবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং নাগরিকের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।

নারী-পুরুষ সমঅধিকারও তাদের ভাবনায় একটি মৌলিক স্তম্ভ। তরুণরা বিশ্বাস করে, উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন নারী ও পুরুষ সমানভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বে অংশ নেবে। তারা এমন বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে প্রতিটি নারী নিজের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার মাধ্যমে।

উপসংহার

চব্বিশোত্তর বাংলাদেশ হবে সেই দেশ-যেখানে তরুণরা শুধু স্বপ্ন দেখবে না, তারা সেই স্বপ্নের স্থপতি, নির্মাতা ও রক্ষক হবে। জিয়াউর রহমানের স্বনির্ভরতা, বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক মানবিকতা এবং তারেক রহমানের উদ্ভাবনী নেতৃত্ব-এ তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে তরুণরা গড়ে তুলবে একটি আধুনিক, ন্যায়নিষ্ঠ, প্রযুক্তিনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ। এদেশে শিক্ষা হবে দক্ষতা ও মূল্যবোধনির্ভর, কর্মসংস্থান উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তানির্ভর, প্রশাসন হবে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের প্রতীক। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সবুজ প্রযুক্তি তরুণদের হাতে হবে জাতীয় অগ্রযাত্রার শক্তি। তরুণরা বিশ্বাস করে-ন্যায়বিচার, সুযোগ ও মর্যাদা সব নাগরিকের অধিকার, আর তারা নিজেই হবে সেই আলোকিত ভবিষ্যতের নেতৃত্বের মশালবাহক।

ড. এ কে এম মতিনুর রহমান : প্রফেসর, লোক প্রশাসন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

জাতীয় ইতিহাসের বয়ান ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের রাজনীতি

জাতীয় ইতিহাসের বয়ান ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের রাজনীতি

ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

হালফিল বয়ান চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম