ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
Advertisement
হাসান ইলিয়াছ তানিম
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিচারে ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী দেশ। শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রশাসন, পারমাণবিক শক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং বিশ্বমানের বিমান নির্মাণশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণেও ফ্রান্সের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি প্রভাবশালী দেশের প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ এবং নাগরিক সমাজের কাছে বাংলাদেশের নাগরিকদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা থাকা আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব না থাকলেও বাংলাদেশি কমিউনিটির অনানুষ্ঠানিক ধারণা অনুযায়ী, দেশটিতে এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, অপরাধের দায় পুরোপুরি তার নিজের। কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্য তার দেশ, ধর্ম কিংবা পুরো কমিউনিটিকে দায়ী করা যায় না। বাংলাদেশি কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রাস্তার মোড়ে অনুমতি ছাড়া পণ্য বিক্রি, অবৈধ ব্যবসা, জাল কাগজপত্র ব্যবহার কিংবা বসবাসের নিয়ম লঙ্ঘন, যে ধরনের অনিয়মই হোক না কেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। বিদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।
তবে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা দিয়ে ফ্রান্সের পুরো বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীকে বিচার করা ঠিক হবে না। বহু বাংলাদেশি নিয়মিত কাজ করছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন, কর দিচ্ছেন এবং ফরাসি অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। তাদের পাঠানো বৈধ রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে। ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মও বেড়ে উঠছে। তারা এখানকার বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং বিভিন্ন পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। এ প্রজন্মের সাফল্য বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
কিন্তু যেখানে ফরাসি সমাজ ও প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশিদের সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে, সেখানে নিজ দেশের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা না পাওয়া অনেক প্রবাসীর জন্য হতাশার কারণ। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান বিবেচনায় তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। অথচ প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের নাগরিক সেবা এবং পাসপোর্টসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে প্রবাসীদের একাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষের কথা শোনা যায়।
এর পাশাপাশি প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক দূরদর্শিতার গুরুত্ব অনেক। সম্প্রতি এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা ও বক্তব্য বিনিময় হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বাংলাদেশ সফরের সময় এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি এ৩৫০ উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহকে যৌথ বিবৃতিতে স্বাগত জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বোয়িংয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা এগিয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজের চূড়ান্ত ক্রয়াদেশে স্বাক্ষর করে। এর মধ্যে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ রয়েছে। ফলে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি এখন আর শুধু আগ্রহ বা আলোচনার পর্যায়ে নেই। বাংলাদেশের জন্য একাধিক নির্মাতার কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাভাবিক বাণিজ্যিক বিষয়। তবে এ ধরনের বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগে পেশাদারত্ব ও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা দরকার। ফরাসি কূটনীতিতে আনুষ্ঠানিকতা, যুক্তিনির্ভর আলোচনা, পারস্পরিক সম্মান এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই কূটনৈতিক রীতি। তাই ব্যক্তিগত ধারণা বা সাংস্কৃতিক অনুমানের ভিত্তিতে ফরাসিদের মনোভাব ব্যাখ্যা না করে তাদের সরকারি বক্তব্য, কূটনৈতিক অবস্থান এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা উচিত।
কোনো রাষ্ট্রের কূটনীতি যদি শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সাময়িক সরকারের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। একজন বিচক্ষণ কূটনীতিকের দায়িত্ব হলো ক্ষমতাসীন সরকারের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা। বিশেষ করে ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে অভিবাসন, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্ব পেতে পারে। মেরিন ল্য পেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাবেশ দল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বিদেশি অপরাধীদের বহিষ্কারের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে ল্য পেন তার নির্বাচনি প্রচারও শুরু করেছেন। তবে তার প্রার্থিতা ও নির্বাচনি যোগ্যতার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তাকে নিশ্চিত বিজয়ী বা একমাত্র সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। ফ্রান্সের সংবিধান, আদালত, ইউরোপীয় আইন এবং মানবাধিকারবিষয়ক অঙ্গীকারও অভিবাসননীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা তৈরি করে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত ফ্রান্সের সব রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। শুধু ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলে চলবে না। বিরোধী দল এবং ভবিষ্যতে সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে এমন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। এ যোগাযোগের উদ্দেশ্য কোনো দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা নয়; বরং বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি প্রবাসীদের স্বার্থ, অবদান এবং বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা। আইন মেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা ফরাসি সমাজ ও অর্থনীতিতে কীভাবে অবদান রাখছেন, তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তুলে ধরা দরকার।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা গেলে সরকার পরিবর্তনের পরও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সহজ হবে। এতে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, আইনি অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে আলোচনার সুযোগ বাড়বে। ফ্রান্সের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সুনাম ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র, দূতাবাস এবং কমিউনিটিকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
হাসান ইলিয়াছ তানিম : সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী; সদস্য, গ্লোবাল কমিউনিটি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফ্রান্স।
