Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

মানুষ সভ্যতা গড়েছে কথা বলার জন্য। আগুনের চারপাশে বসে, গ্রামের বটতলায় জড়ো হয়ে, নগররাষ্ট্রের চত্বরে দাঁড়িয়ে, কিংবা আধুনিক সংসদের সবুজ বেঞ্চে বসে মানুষ শিখেছে মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও একসঙ্গে থাকার শিল্প। রাজনীতি সেই শিল্পেরই অন্য নাম। কিন্তু যখন রাজনীতি সংসদের সুশৃঙ্খল অলিন্দ ছেড়ে উত্তপ্ত রাস্তায় নেমে আসে, তখন তার চরিত্র বদলে যায়। ভাষা, যুক্তি, এমনকি মানুষের স্বপ্ন দেখার ধরনও বদলে যায়।

সংসদ হলো রাষ্ট্রের বিবেকের ঘর, সেখানে মানুষ প্রতিনিধি পাঠায় এই বিশ্বাসে যে, তাদের পক্ষে কেউ কথা বলবে, তর্ক করবে, আপস করবে, সমঝোতা করবে। সংসদে প্রতিপক্ষ শত্রু নয়; তারা ভিন্নমতের প্রতিনিধি। সেখানে কণ্ঠস্বর উঁচু হতে পারে, বাক্য তীক্ষ্ণ হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই একই ছাদের নিচে ফিরে আসে। কারণ সংসদ গণতন্ত্রের সেই ঘর, যেখানে বিরোধকে সংঘর্ষে নয়, আলোচনায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা চলে।

কিন্তু যখন সেই আলোচনা থেমে যায়, যখন সংসদের দরজা মানুষের আস্থার কাছে সংকীর্ণ হয়ে ওঠে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো মনে করতে শুরু করে যে, সংসদে কথা বলে লাভ নেই, তখন রাজনীতি বেরিয়ে আসে রাজপথে। তখন মিছিল হয় সংসদের বিকল্প ভাষা, স্লোগান হয় যুক্তির বিকল্প বাক্য, আর জনসমাবেশ হয়ে ওঠে আইন প্রণয়নের কক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী মঞ্চ।

রাজপথের রাজনীতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসই এর সাক্ষ্য বহন করে। ফরাসি বিপ্লবের দিনগুলোতে প্যারিসের রাস্তাগুলোই হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার প্রকৃত কেন্দ্র। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নয়, বরং কলকাতা, দিল্লি ও লাহোরের রাজপথই ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়েছিল। আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলন, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম, কিংবা লাতিন আমেরিকায় নতজানু শাসনের পতন, সব ক্ষেত্রেই রাজপথ ছিল পরিবর্তনের শক্তিশালী অনুঘটক।

অর্থাৎ রাজপথের রাজনীতি সর্বদা নেতিবাচক নয়। কখনো কখনো রাষ্ট্রের জড়তা ভাঙতে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করতে, কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে এটি অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। তবুও এখানে এক গভীর দ্বন্দ্ব আছে। সংসদ ও রাজপথ উভয়ই জনগণের ভাষা, কিন্তু তাদের ব্যাকরণ ভিন্ন। সংসদ শেখায় ধৈর্য। রাজপথ শেখায় আবেগ। সংসদ চায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা। রাজপথ চায় জনউত্তেজনা। সংসদে মানুষ কথা শোনে। রাজপথে মানুষ কথা শোনানোর চেষ্টা করে। এ পার্থক্য থেকেই শুরু হয় সম্ভাবনা এবং বিপদের গল্প।

রাজনীতি যদি দীর্ঘদিন সংসদ ছেড়ে রাজপথে অবস্থান করে, তবে প্রথম যে পরিবর্তনটি ঘটে, তা হলো ভাষার পরিবর্তন। সংসদের ভাষা যুক্তিনির্ভর। সেখানে একটি প্রস্তাবের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি হাজির করতে হয়। কিন্তু রাজপথে সংক্ষিপ্ত স্লোগানই কার্যকর। স্লোগান মানুষের আবেগকে দ্রুত জাগায়, কিন্তু জটিল বাস্তবতার ব্যাখ্যা দেয় না। ফলে রাজনৈতিক কথোপকথন ধীরে ধীরে সরলীকৃত হয়ে পড়ে। বন্ধু ও শত্রুর বিভাজন স্পষ্ট হয়, অথচ বাস্তবতার বহুস্তরীয় রংগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। একসময় দেখা যায়, মানুষ আর প্রশ্ন করছে না ‘কীভাবে?’ কিংবা ‘কেন?’। তারা শুধু জানতে চাইছে, ‘কার পক্ষে?’ কিংবা ‘কার বিরুদ্ধে?’ এটি গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ থাকে প্রশ্নে, অন্ধ আনুগত্যে নয়।

আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটে প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদায়। সংসদ, আদালত, নির্বাচন কমিশন কিংবা অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি মূলত মানুষের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন রাজনৈতিক সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্র রাজপথ হয়ে ওঠে, তখন এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমতে শুরু করে। মানুষ মনে করতে শেখে সিদ্ধান্ত আইন দ্বারা নয়, বরং জনসমাগমের শক্তি দ্বারা নির্ধারিত হবে। এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্রের জন্য এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কারণ গণতন্ত্রে সবাই যদি নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু রাজপথের শক্তির ওপর নির্ভর করে, তবে সবচেয়ে সংগঠিত, সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ অথবা সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠীই সুবিধা পাবে। নীরব মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষ কিংবা দুর্বল মানুষ তখন পিছিয়ে পড়বে।

প্রকৃতপক্ষে সভ্য রাষ্ট্রের ধারণাটিই জন্ম নিয়েছে এই কারণে যে, মানুষের শক্তিকে নিয়মের ভেতরে আনা যায়। সংসদ সেই নিয়মতান্ত্রিকতার প্রতীক। রাজপথ প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার স্থায়ী কাঠামো হয়ে উঠতে পারে না।

রাজপথনির্ভর রাজনীতির আরেকটি পরিণতি হলো মেরুকরণ। একটি সংসদে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক অনিবার্যভাবে একসঙ্গে বসে। কিন্তু রাজপথে মানুষ সাধারণত নিজের মতের মানুষের মাঝেই অবস্থান করে। ফলে ধীরে ধীরে সমাজ দুই বা ততোধিক পৃথক শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের যুক্তি বোঝার সক্ষমতা কমে যায়। বিরোধী পক্ষ আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না; তারা পরিণত হয় নৈতিক শত্রুতে।

এ শত্রুতার বীজ একদিন পরিবারেও ঢুকে পড়ে। ভাই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে না। বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে বসে চা খায় না। এক পাড়ার মানুষ অন্য পাড়ার মানুষকে সন্দেহ করতে শেখে। রাজনীতি তখন রাষ্ট্রের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক সম্পর্কের ভেতরেও বিভাজনের রেখা টেনে দেয়।

অর্থনীতিও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। যখন রাজনীতি সংসদের বদলে রাস্তায় কেন্দ্রীভূত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে ধর্মঘট, অবরোধ, কর্মসূচি, পালটা কর্মসূচি। ব্যবসায়ী বিনিয়োগের আগে অপেক্ষা করেন। বিদেশি বিনিয়োগকারী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অর্থনীতি মূলত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একজন উদ্যোক্তা আজ বিনিয়োগ করেন এ আশায়, আগামীকাল পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু যদি আগামীকাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না যায়, তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও সংকুচিত হয়। রাস্তার উত্তাপ তাই কখনো কখনো মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। রাজনৈতিক স্লোগানের প্রতিধ্বনি বাজারের সবজির দামে, শ্রমিকের মজুরিতে, কিংবা শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়ও শোনা যেতে থাকে।

তবে ইতিহাসের সত্য আরও জটিল। সব রাজপথই অরাজকতার দিকে নিয়ে যায় না। অনেক সময় রাজপথই গণতন্ত্রকে বাঁচায়। যখন সংসদ নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়, যখন বিরোধী কণ্ঠরোধ করা হয়, যখন নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন মানুষের শেষ আশ্রয় হতে পারে রাজপথ। সেই রাজপথে দাঁড়িয়েই বহু জাতি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে।

কিন্তু এখানেই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি বুঝতে হবে। রাজপথের কাজ হলো সংসদকে সংশোধন করা; সংসদকে প্রতিস্থাপন করা নয়। যে আন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে ফিরে আসে, তারই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর যে আন্দোলন শুধু স্থায়ী সংঘাত সৃষ্টি করে, সে একসময় নিজের শক্তিকেই ক্ষয় করে ফেলে।

প্রকৃত গণতন্ত্র আসলে নদীর মতো। নদীর দুই তীর থাকে। এক তীর হলো প্রতিষ্ঠান, অন্য তীর জনমত। উভয়কে সঙ্গে নিয়েই নদী প্রবাহিত হয়। কোনো তীর ভেঙে গেলে নদীও অস্থির হয়ে ওঠে।

আজকের পৃথিবীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে। আগে রাজপথে নামতে হতো জনমত প্রকাশের জন্য। এখন একটি পোস্ট, একটি ভিডিও, একটি হ্যাশট্যাগও লাখো মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করতে পারে। ফলে সংসদ ও রাজপথের মধ্যকার দূরত্ব আরও কমে গেছে।

এখন অনেক সময় দেখা যায়, সংসদে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই ডিজিটাল রাজপথে রায় ঘোষণা হয়ে যায়। এর ফলে ধৈর্যের জায়গা সংকুচিত হয়। মানুষ তাৎক্ষণিক ফলাফল চায়। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনা কখনোই তাৎক্ষণিকতার শিল্প নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি বিবেচনার বিষয়।

সুতরাং প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, রাজনীতি সংসদ থেকে রাস্তায় গেলে কী হয়। আসল প্রশ্ন হলো, কতদিন থাকে? কী উদ্দেশ্যে যায়? এবং শেষে কোথায় ফিরে আসে? যদি রাজপথ সংসদের ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু যদি রাজপথই স্থায়ী রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্র ক্রমশ সংঘর্ষ, অনিশ্চয়তা ও মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত একটি জাতির পরিণতি নির্ভর করে তার রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। যে জাতি মতভেদকে সহ্য করতে শেখে, বিতর্ককে সম্মান করতে শেখে এবং পরাজয়কেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে মেনে নিতে শেখে, সেই জাতি সংসদ ও রাজপথের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।

সন্ধ্যার শহরে যখন মিছিলের শেষ স্লোগান মিলিয়ে যায়, যখন ব্যস্ত সড়কের ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়া হয়, যখন জনতার ঢেউ ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে যায়, তখন রাষ্ট্রের সামনে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় : এরপর কী? সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো মিছিল একা দিতে পারে না। কোনো সংসদও একা দিতে পারে না। উত্তরটি লুকিয়ে থাকে তাদের মধ্যকার সম্পর্কের ভেতরে।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

সংসদ থেকে রাস্তায় : রাজনীতির অনিশ্চিত যাত্রা

জাতীয় ইতিহাসের বয়ান ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের রাজনীতি

জাতীয় ইতিহাসের বয়ান ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের রাজনীতি

ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

হালফিল বয়ান চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

চীন-পাকিস্তান সামরিক সহযোগিতা ও দক্ষিণ এশিয়া

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম