ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদে ট্রাম্পের নজর
মুস্তাফা আর্সলান
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একুশ শতকে লাতিন আমেরিকা এমন একটি অঞ্চল হয়ে উঠেছে, যেখানে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এর জ্বালানিসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে। এ সমীকরণের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েছে ভেনিজুয়েলা, যে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলভান্ডারের অধিকারী এবং সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরীক্ষা চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনের চাপ শুধু লাতিন আমেরিকাকে নয়, বরং সরাসরি বিশ্বের শক্তি ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মকাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনিজুয়েলার সম্পর্ক দ্রুত কঠির হয়ে উঠছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে চাপ বাড়ায়। কারাকাস সরকার এ পদক্ষেপকে ‘প্রচারণা’ বলে আখ্যায়িত করে নিজেদের নৌবাহিনী ও ড্রোন দিয়ে জবাব দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিআইএকে ভেনিজুয়েলায় গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন এমন অভিযোগও শোনা যায়, যে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ওয়াশিংটন ঘোষণা করে, তারা মাদুরোর সঙ্গে দেখা করতে পারে। এতে বোঝা যায়, সংকটের কূটনৈতিক মাত্রা সামরিক হুমকির সঙ্গে জড়িত ছিল। মাদুরো এ প্রক্রিয়াকে ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ হিসাবে বর্ণনা করেন এবং তার সেনাবাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটনের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ দখল করা।
মাদক নিয়ন্ত্রণের অজুহাত
গত ২৫ বছর ধরে ওয়াশিংটনের ভেনিজুয়েলা নীতি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং সামরিক হুমকি দ্বারা আকার নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্য এবং বাস্তবতার মধ্যে একটা বড় পার্থক্য আছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক লক্ষ্য শুধু মাদুরো সরকারকে উৎখাত করা নয়, বরং লাতিন আমেরিকায় তার আধিপত্য দৃঢ় করা এবং তার বিশ্বব্যাপী কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব শক্তিশালী করা। এ কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলসম্পদের অধিকারী ভেনিজুয়েলা। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি যৌক্তিক করতে ভেনিজুয়েলাকে কথিত মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। তবে Drug Enforcement Administration (DEA) এবং United Nations Office on Drugs and Crime (UNODC)-এর তথ্য অনুযায়ী, কলোম্বিয়া এবং মধ্য আমেরিকা রয়েছে কোকেন প্রবাহের কেন্দ্রে, যখন ভেনিজুয়েলা একটি গৌণ ট্রানজিট দেশ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি যুক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে এর চাপের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য হিসাবে তুলে ধরে।
ক্যারিবিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মোতায়েন করা বিমানবাহী জাহাজ এবং মিলিটারি ইউনিটগুলো ওয়াশিংটনের চাপ কৌশলের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অফিশিয়াল বিবৃতিগুলো ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’কে গুরুত্ব দিলেও ভেনিজুয়েলা সরকার এ পদক্ষেপগুলোকে সরাসরি সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা হিসাবে ব্যাখ্যা করে। যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী কথিত মাদক চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলোতে অভিযান চালিয়ে ডজন ডজন লোককে হত্যা করেছে। তবে তারা সরাসরি ভেনিজুয়েলার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ করেনি। মিলিটারি কৌশল অনুসারে স্থল আক্রমণের সম্ভাবনা নেই, কারণ বর্তমানে আমেরিকার মোতায়েন করা যে জাহাজ ও সামরিক ইউনিট, তা এ ধরনের অপারেশনের জন্য অপর্যাপ্ত। সারা দেশে মোতায়েন ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী এ আক্রমণগুলো প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি বিল্ডআপের উদ্দেশ্য মূলত রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। ট্রাম্প প্রশাসন প্রায়ই হুমকি ও আল্টিমেটাম দিয়ে তার প্রতিপক্ষদের কোণঠাসা করে।
উদ্দেশ্য হলো, এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনে ভেনিজুয়েলায় সরকারে পরিবর্তন আনা, যারা মাদুরোর পুনর্নির্বাচনকে অস্বীকার করে। তার প্রথম মেয়াদকালে ট্রাম্প জুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং বড় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন, যাতে ভেনিজুয়েলার অর্থনীতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। আজ ক্যারিবিয়ান সাগরে এ শক্তি প্রদর্শনকে ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের’ কৌশলের একটি নতুন পর্যায় হিসাবে দেখা হচ্ছে।
ইউরোপের অবস্থান
ভেনিজুয়েলা সংকটের ব্যাপারে ইউরোপীয় অবস্থান আমেরিকার কঠোর এবং জোরপূর্বক নীতির তুলনায় আরও সতর্ক ও কূটনৈতিক। ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক হুমকি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ইউরোপ সংকটটিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করে। এটি ইউরোপের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও প্রকাশ করে। যেখানে কিছু রাষ্ট্র আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, অন্যরা ‘সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের’ সমালোচনা করে। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। প্যারিস খোলাখুলি ঘোষণা করেছে, আমেরিকার সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। তবে ভেনিজুয়েলায় ফরাসি জ্বালানি কোম্পানিগুলোর স্বার্থ এবং ফ্রান্সের বিদেশি অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা এমন নীতির মূল কারণ। সুতরাং, ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি এবং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বললেও এটি পর্দার আড়ালে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করতে চায়।
জার্মানি আরও জটিল একটি ভারসাম্য বজায় রাখে। দেশটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ভেনিজুয়েলার ওপর দোষারোপ করে এবং বিরোধী দলকে আংশিক সমর্থন দেয়, অথচ সরকারের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেয়। এ দ্বৈত পদ্ধতি দেখায় জার্মানি ভেনিজুয়েলা বিষয়ে মার্কিন নীতিকে আংশিকভাবে সমর্থন করে; কিন্তু দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এড়িয়ে চলে। জার্মান রাজনীতিকরা নিজেরাই বিভক্ত : কেউ কেউ যুক্তি দেন, মাদুরো তার বৈধতা হারিয়েছেন এবং গুয়াইদোকে সমর্থন করা উচিত, অন্যরা বিরোধী পক্ষের বিভাজন দেখিয়ে একটি বৃহত্তর জোট গঠনের আহ্বান জানান। ব্রিটেন একটি সীমিত ভূমিকা নিয়েছে।
দেশটি ক্যারিবিয়ান সাগরে মার্কিন অভিযান সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করেছে আক্রমণগুলোকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে। এটি দেখায় যে, ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা আংশিকভাবে সীমিত করেছে এবং আইনি ভিত্তিকে গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, স্পেন Community of Latin American and Caribbean States (CELAC)-EU summit-এ আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে, যাকে মার্কিন হস্তক্ষেপের পরোক্ষ সমালোচনা হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিশ্ব ভারসাম্য
ভেনিজুয়েলার সংকট এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাদুরোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর চাপ বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে; যা সংকটকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রতিফলনে পরিণত করেছে। ওয়াশিংটন যখন ভেনিজুয়েলার কৌশলগত অবস্থান এবং তেলভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে সরকার পরিবর্তন চায়, তখন চীন খোলাখুলিভাবে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে ভেনিজুয়েলাকে সমর্থন করে এবং রাশিয়া সামরিক সহযোগিতা এবং অস্ত্র বিক্রয়ের মাধ্যমে মাদুরোর ক্ষমতা শক্তিশালী করে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নীতির সমালোচনা করে এবং ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে সমর্থন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ-ক্ষমতা সীমিত করে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করে।
ভেনিজুয়েলার বিষয়টি একটি বহুস্তরীয় সংকটে পরিণত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ইইউর কূটনৈতিক মতপার্থক্য, লাতিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং চীন-রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব দ্বারা আকার নিয়েছে। এ চিত্রটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার লড়াইয়ের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে দাঁড়িয়েছে, যা ভেনিজুয়েলাকে বিশ্ব প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে একটি কৌশলগত পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
তুরস্কের ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তরিত
মুস্তাফা আর্সলান : আংকারা মেডিপোল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক
