Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কী ঘটতে যাচ্ছে ইরানে

Advertisement

Icon

আসিফ রশীদ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কী ঘটতে যাচ্ছে ইরানে

Advertisement

ইরানে গণবিক্ষোভের পরিণতি কী হতে যাচ্ছে? সরকার কি পারবে পরিস্থিতি সামাল দিতে? নাকি ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশটিতে যে শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল, তার অবসান ঘটতে যাচ্ছে? যদি বর্তমান সরকার বা ‘বেলায়েত-ই-ফকিহ’ ব্যবস্থার পতন ঘটে, তাহলে শাসনক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণ করবে কারা? এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে এখন।

ইরানের শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে এখন এক ত্রিভুজ সংকটের মুখোমুখি : চরম মুদ্রাস্ফীতি, তরুণ প্রজন্মের সাংস্কৃতিক বিমুখতা এবং উত্তরসূরি নির্বাচনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সাধারণ ইরানিরা আজ আর কেবল সংস্কার চায় না, তারা চায় আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নিচ্ছে আগামীর নেতৃত্বের প্রশ্ন।

একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি, অন্যদিকে তেহরানের ‘পাসদারান’ বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) কঠোর হুঁশিয়ারি। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রশ্নটি আর ‘কী হতে পারে’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রশ্নটি এখন ‘কখন শুরু হবে?’ আমেরিকার হস্তক্ষেপের আশঙ্কা আর রেভল্যুশনারি গার্ডের মরণকামড় দেওয়ার ক্ষমতা-এ দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ কাঁপছে পারস্য উপসাগর।

আমেরিকার হস্তক্ষেপ : বাগাড়ম্বর নাকি আসন্ন বাস্তবতা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ইরানের বিক্ষোভকারীদের ‘সহায়তা’ করার জন্য কার্যত ‘লক্ড অ্যান্ড লোডেড’ অবস্থায় আছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারির এই উত্তপ্ত আবহে ওয়াশিংটন আর কেবল অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৫ সালের জুনে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যে ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী যুদ্ধ হয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরাইলের হয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ফলে সরাসরি হস্তক্ষেপের একটি উদাহরণ ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে আছে।

ট্রাম্পের কৌশল : ট্রাম্প চাচ্ছেন ইরানের ভেতরে অস্থিরতা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই বাইরে থেকে এমন একটি ধাক্কা দিতে, যাতে পুরো শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ফোনালাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেহরানের আকাশ যে কোনো মুহূর্তে মার্কিন বি-২১ রেইডার বা ড্রোনের দখলে চলে যেতে পারে। তবে পূর্ণমাত্রার স্থলযুদ্ধ বা ‘বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড’ হওয়ার আশঙ্কা কম; বরং আকাশপথে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালিয়ে আইআরজিসির কোমর ভেঙে দেওয়াই হতে পারে আমেরিকার মূল লক্ষ্য।

ইরানে ক্ষমতার পরিবর্তন কি খুব সহজ হবে

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কেবল একটি সামরিক শক্তি নয়, ইরানের অর্থনীতিও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে তারা। আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির কাছে দায়বদ্ধ। নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্টেশ) যেখানে সীমান্ত রক্ষা করে, সেখানে আইআরজিসির কাজ হলো ‘বিপ্লব রক্ষা’ করা। অর্থাৎ, দেশের ভেতরে কোনো বিদ্রোহ হলে তা দমন করাই তাদের প্রধান কাজ। গত শনিবার তারা নিরাপত্তাকে ‘রেড লাইন’ বা লাল রেখা হিসাবে ঘোষণা করেছে, যার অর্থ বিক্ষোভ দমনে তারা এখন থেকে মরণপণ যুদ্ধের পথ বেছে নেবে।

ইরানের জিডিপির ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এই গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তেলক্ষেত্র থেকে শুরু করে আবাসন শিল্প-সবই তাদের কব্জায়। তাই সরকারের পতন মানে আইআরজিসির বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যের পতন। এই টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা চূড়ান্ত শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা করবে না। আইআরজিসির সক্ষমতা তিনটি স্তরে বিভক্ত :

ক. ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি : আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী ব্যালিস্টিক মিসাইল ভান্ডারের মালিক। তাদের ‘শাহিদ’ সিরিজের ড্রোনগুলো ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। আমেরিকা বা ইসরাইলে বড় ধরনের পালটা আঘাত হানার সক্ষমতা তাদের আছে।

খ. কুদস ফোর্স ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক : লেবাননের হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে ইয়েমেনের হুথি-পুরো অঞ্চলে আইআরজিসির একটি বিশাল ছায়া সেনাবাহিনী রয়েছে। ইরানে হামলা হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলার ক্ষমতা তাদের নখদর্পণে।

গ. বাসিজ মিলিশিয়া : এটি আইআরজিসির সেই শাখা, যারা পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ পোশাকে ঘুরে বেড়ায়। এই আধাসামরিক বাহিনীটি বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি দমনপীড়ন চালায়। এদের সংখ্যা কয়েক লাখ, যারা আদর্শিকভাবে কট্টর এবং যে কোনো মূল্যে শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

খামেনি জানেন, আইআরজিসি ছাড়া তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার আইআরজিসি জানে, খামেনির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তারা ‘সন্ত্রাসী’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আমেরিকা যদি হস্তক্ষেপ করে, তবে তা হবে আগ্নেয়গিরিতে ঘি ঢালার মতো। আইআরজিসি হয়তো শুরুতে বড় ধাক্কা খাবে, কিন্তু তারা ইরানকে একটি ‘পোড়ামাটি’ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে চাইবে। একদিকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া আইআরজিসি, অন্যদিকে ভূরাজনীতির দাবার ঘুঁটি চালতে থাকা আমেরিকা। এই লড়াইয়ের শেষ রক্তবিন্দুটি হয়তো ঝরবে তেহরানের সেই তরুণদেরই, যারা কেবল একটু স্বাধীনতার আশায় রাজপথে নেমেছে।

কী হবে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা

ইরানের ভাগ্য কি কেবল তেহরানের রাজপথে বা ওয়াশিংটনের ওভাল অফিসে নির্ধারিত হচ্ছে? দৃশ্যত তা মনে হলেও পর্দার আড়ালে দাবার চাল দিচ্ছে আরও দুটি পরাশক্তি-রাশিয়া ও চীন। ইরানের সঙ্গে তাদের মিত্রতা কোনো রোমান্টিক বন্ধুত্ব নয়, বরং নিরেট ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

পুতিনের রাশিয়ার কাছে ইরান এখন এক অপরিহার্য কিন্তু ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের ‘শাহিদ’ ড্রোনের অবদান রাশিয়া ভোলেনি। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এসে আমরা দেখছি, মস্কো ও তেহরান ২০ বছরের এক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তিতে সই করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমেরিকা যদি হামলা চালায়, পুতিন কি ইরানের হয়ে যুদ্ধ করবেন? মস্কোর এখন প্রধান মনোযোগ ইউক্রেনে। তারা ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা সুখোই-৩৫ যুদ্ধবিমান দিয়ে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে নামার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। গত বছরের জুনে যখন ইসরাইল ও আমেরিকা ইরানের ওপর সীমিত হামলা চালিয়েছিল, তখন রাশিয়া কেবল ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয়েছিল। বস্তুত রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে একটি ‘বাফার জোন’ হিসাবে ব্যবহার করা, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে থাকে। বর্তমান বিক্ষোভ দমনে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য এবং সাইবার প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে, কিন্তু ইরান সরকারের পতন শুরু হলে রাশিয়া হয়তো কেবল তার নিজের সামরিক ঘাঁটি এবং স্বার্থটুকু রক্ষা করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে।

চীনের কাছেও ইরান কোনো আদর্শিক বন্ধু নয়, বরং এটি তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ নোড এবং সস্তা তেলের উৎস। ইরান বর্তমানে যে তেল রপ্তানি করে, তার সিংহভাগই যায় চীনে। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও চীন এই তেল কেনা বন্ধ করেনি। চীনের ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তিটি ইরানের অর্থনীতির জন্য শেষ ভরসা। যদি ইরান সরকারের পতন ঘটে, তবে চীনের এই বিশাল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

জাতিসংঘে চীনের ভেটো ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ঢাল। বেইজিং বারবার বলছে, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। এর মাধ্যমে তারা মূলত বর্তমান সরকারকে পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে। তবে চীন খুব বাস্তববাদী। যদি তারা দেখে, তেহরানের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো আর টিকবে না, তখন তারা হয়তো অতি দ্রুত বিকল্প শক্তির (যেমন রাজতন্ত্রপন্থি বা কোনো মধ্যপন্থি গোষ্ঠী) সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করবে, যাতে তাদের তেলের সরবরাহ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত থাকে।

সাম্প্রতিক নৌ-মহড়া : একটি প্রতীকী বার্তা

গত ১১ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে চীন, রাশিয়া ও ইরান একটি যৌথ নৌ-মহড়া শুরু করেছে, যা বিশ্বকে একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে। এই ত্রয়ীর জোট দেখাতে চাচ্ছে, ওয়াশিংটন চাইলেই একতরফাভাবে ইরানের ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এই মহড়াগুলো যতটা না যুদ্ধের প্রস্তুতি, তার চেয়ে অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল।

কারা আসতে পারে ইরানের ক্ষমতায়

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটলে ক্ষমতার লড়াইয়ে মূলত তিনটি প্রধান ধারা সামনে আসতে পারে-

ক. রাজতন্ত্রপন্থি (রেজা পাহলভি ও তার অনুসারী) : নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভি বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে বেশ সক্রিয়। ইরানের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে যারা ১৯৭৯-পূর্ববর্তী ইরানের আধুনিকায়ন ও স্থিতিশীলতা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন, তারা রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা অথবা রেজা পাহলভির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেখতে চান। তবে তার সম্পর্কে অভিযোগ হলো, তিনি কেবল একটি ‘প্রতীকী’ ফিগার এবং তার পেছনে সুসংগঠিত কোনো তৃণমূল শক্তি নেই।

খ. মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে) : এটি ইরানের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ শক্তিশালী বিরোধী গোষ্ঠী। একসময় ইসলামি এবং মার্কসবাদী আদর্শের মিশেলে তৈরি এ সংগঠনটি এখন চরমভাবে পশ্চিমা ঘেঁষা। তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রবল এবং বিদেশের মাটিতে তারা বিশাল লবিং গ্রুপ পরিচালনা করে। তবে ইরানের ভেতরে তাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন আছে, বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন করায় সাধারণ ইরানিদের বড় একটা অংশ তাদের সন্দেহের চোখে দেখে।

গ. সিভিল সোসাইটি ও সংস্কারবাদী জোট : ইরানের ভেতরে থাকা বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং নারী অধিকার কর্মীরা একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখছেন। এদের নির্দিষ্ট কোনো একক নেতা নেই, কিন্তু ‘নারী-জীবন-স্বাধীনতা’ আন্দোলনের মাধ্যমে তারা এক বিশাল জনসমর্থন তৈরি করেছেন।

ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে ইসলামি শাসনতন্ত্রের বাইরে কোনো দলের কার্যক্রম আইনত বৈধ নয়। তবে ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের মনে বেশ কিছু অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী শক্তি টিকে আছে-

ক. ন্যাশনাল ফ্রন্ট : ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক প্রতিষ্ঠিত এ দলটি ইরানের জাতীয়তাবাদের প্রতীক। তারা একটি সংসদীয় গণতন্ত্র চায়, যেখানে ধর্ম রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। বর্তমানে তারা মূলত প্রবাসী ইরানিদের মাধ্যমে সক্রিয়।

খ. প্যান-ইরানিস্ট পার্টি : এটি একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, যারা ইরানের হারানো গৌরব ও অখণ্ডতায় বিশ্বাসী। এদের প্রভাব সীমিত হলেও শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশের মধ্যে তাদের আবেদন রয়েছে।

গ. বামপন্থি তুদেহ পার্টি : ইরানের বামপন্থি রাজনীতির কথা বলতে গেলে ‘তুদেহ’ পার্টির নাম অবধারিতভাবে চলে আসে। এককালে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী এই কমিউনিস্ট দলটি এখন নিছকই এক ছায়া সংগঠন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে তুদেহ পার্টি আয়াতুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল, যা ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল। বিপ্লবের পর যখন ইসলামি শক্তি ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন তারা তুদেহ পার্টির ওপর নির্মম দমনপীড়ন চালায়। ১৯৮৩ সালের দিকে দলটির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে টিভিতে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয় এবং হাজার হাজার কর্মীকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়।

বর্তমানে দলটি সম্পূর্ণ নির্বাসিত। তাদের সদর দপ্তর বর্তমানে জার্মানির বার্লিনে। ইরানের ভেতরে তাদের কোনো প্রকাশ্য সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। তবে শ্রমিক অসন্তোষ এবং ইউনিয়নগুলোর ধর্মঘটের পেছনে বামপন্থি আদর্শের প্রভাব এখনো লক্ষণীয়। তারা এখন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ এবং ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ অবস্থানের ওপর। তবে নতুন প্রজন্মের ইরানিদের কাছে তুদেহ পার্টির পুরোনো ভুলগুলো এখনো বড় বাধা হয়ে আছে।

ইরান একটি অগ্নিগর্ভ চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় একনায়কতন্ত্র, অন্যদিকে পশ্চিমা মদদপুষ্ট নির্বাসিত নেতৃত্ব। এর মাঝে তৃতীয় শক্তি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ। তুদেহ পার্টির মতো বামপন্থি দলগুলো যদি নিজেদের ভুল শুধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে না পারে, তাহলে ইরানের ভবিষ্যৎ হয়তো আরও একবার কোনো একনায়কতন্ত্রের অধীনে বন্দি হবে।

কিন্তু তেহরানের রাজপথে যে দেওয়ালচিত্রগুলো আঁকা হচ্ছে, তা বলছে ভিন্ন কথা। ইরান আর পেছনে ফিরবে না। একদলীয় শাসনের অবসান ঘটলে সেখানে একটি বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল, যদিও সেই পথটি হবে রক্তঝরা ও বন্ধুর। ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো, কোনো একদলীয় ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়। তাছাড়া ইরানের তরুণ সমাজ আজ ডিজিটাল বিপ্লবের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আসিফ রশীদ : ডেপুটি এডিটর, যুগান্তর

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম