ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই
Advertisement
ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বহুল প্রত্যাশিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের গেজেট প্রকাশেও বিলম্ব ছিল না। সোশ্যাল মিডিয়া আর মূলধারার মিডিয়ায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিরামহীন যুদ্ধ অব্যাহত থাকলেও নির্বাচনের মাঠে সহিংসতা, তার বিপরীতে ছিল নিতান্তই অনুল্লেখ্য। এমনকি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব হলেও ফলাফল নিয়ে জনগণ, মিডিয়া এমনকি অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মাঝেও ভ্রুকুঞ্চন তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। এক কথায়, এএমএম নাসিরউদ্দিন নির্বাচন কমিশন কর্মদক্ষতায় কতটা উৎকর্ষ দেখিয়েছেন, সেই আলোচনা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল, যখন স্বতঃস্ফূর্ত জনঅংশগ্রহণে সাধারণ ভোটাররা নিজেরাই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়ে ফেলেছিল।
জনতা নিজেরাই অতন্দ্র প্রহরীর মতো ভোটকেন্দ্র শুধু নজরদারিতেই রাখেননি, বরং যে কোনো অনিয়ম প্রতিহত করেছেন, আর সে প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সংযুক্ত করেছেন। ফলে নির্বাচন নিয়ে সহিংসতা, বিঘ্ন সৃষ্টি করা, হওয়া না হওয়া নিয়ে শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তার মেঘও কেটে গেছে সবার অজান্তেই। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অভিযোগ একদম ছিল না, সেটা হয়তো ঠিক নয়; কিন্তু প্রার্থীর সেই ক্ষীণ কণ্ঠ জনগণ দূরে থাক, মিডিয়ার সহানুভূতি আকর্ষণ সৃষ্টির জন্যও পর্যাপ্ত ছিল না।
নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির অন্দরমহল নিশ্চিত থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়ার তাণ্ডব, তথাকথিত প্রাক-নির্বাচনি জরিপ আর টকশোতে কিছু উচ্চকণ্ঠী বিজ্ঞজনরা আর সাগর ওপারের থিংক ট্যাংকরা ফলাফলের যে ভবিষ্যৎ রচনা করেছিলেন, তাতে জামায়াত-এনসিপি জোট ফলাফল ঘোষিত হওয়ার আগে পর্যন্ত একরকম বিজয়ীর আনন্দেই ছিলেন, এমনকি মধ্যপন্থি বিশ্লেষকরা ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে দোদুল্যমানতা, আর অতি সতর্কতায় তথাকথিত নিরপেক্ষতায় ‘হাড্ডাহাড্ডি’ শব্দটা এত বেশি ব্যবহার করেছেন, ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে শব্দটি তার গুরুত্ব হারিয়ে পানসে হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
এবারের নির্বাচনে সবকিছু ছাপিয়ে অনন্য হয়ে উঠেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বলতে গেলে ২৫ ডিসেম্বরে তার আগমন, আর ৩০০ ফুটের জনসমাবেশের জনসমুদ্র তাকে নির্বাচনি প্রচারের পথচলায় কয়েকগুণ এগিয়ে দিয়েছে, এরপর বেগম জিয়ার মৃত্যু আর তার জানাজায় তারেক রহমানের পরিমিত বক্তব্য জনসমর্থনের বাকি অংশের বেশির ভাগ পুষিয়ে দিয়েছে।
এরপর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারে তার আইকনিক লাল-সবুজ বাস, ‘সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান’, যার সঙ্গে তিনি প্রায় দু’বছর আগে থেকেই দেশবাসীকে পরিচিত করে ফেলেছিলেন-এসব কিছু তার নির্বাচনি প্রচারকে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব নতুনত্ব।
এরপর সিরিজ জনসভায় অতি সাধারণ বেশভূষায় তার উপস্থিতি, সাধারণের সঙ্গে মিশে গিয়ে হাত মেলানো, কুশল জিজ্ঞাসা, মঞ্চের পাশে জুলাই শহীদ পরিবার, আহত জুলাই যোদ্ধাদের মর্যাদার সঙ্গে সম্মানিত করা, প্রচলিত বক্তৃতা-ভঙ্গির বাইরে গিয়ে মাইক্রো ফোন হাতে পুরো মঞ্চের সামনের অংশ ব্যবহার করে স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, দলের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে, তার সেই বিখ্যাত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এর ভিত্তিতে আটটি স্তম্ভের দেশ গড়ার পরিকল্পনা, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ নিয়ে তার প্রতিশ্রুতি, প্রায় প্রতিটি সভায় বারবার উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তার বক্তব্য কর্ণকুহর দিয়ে মনোজগৎ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন সার্থকভাবে। আর দীর্ঘ ১৭ বছর পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তার বিচরণ, নেতাকর্মীদের আস্থা আর এর মাঝে নির্বাচনি জনসভায় স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের নীরব, অথচ সচকিত উপস্থিতি, মেডিকেল ক্যাম্পে সেবা প্রদান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের তারুণ্য সমাবেশে প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ নারীসমাজ ও তারুণ্যের সঙ্গে বিএনপির যোগসূত্রের ঘাটতি পূরণে অসামান্য অবদান রেখেছেন।
তাকে দেখতে লাখো মানুষের উপস্থিতি, আর তার দক্ষ মিডিয়া টিম, এ সবকিছু এত দক্ষতায় সোশ্যাল মিডিয়াসহ মূল ধারার মিডিয়ায় উপস্থাপন করেছে, নির্বাচন-পূর্ববর্তী দুই সপ্তাহ মিডিয়া বিএনপির প্রচারের বাইরে যেতেই পারেনি। বলতে গেলে এ সময় জামায়াতের সোশ্যাল মিডিয়াসাম্রাজ্য মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারেনি। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের তথ্যগুলোকে জনগণ আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি; যার ফলাফল প্রতিফলিত হয়েছে ব্যালট পেপারে।
নির্বাচনের পরপরই তারেক রহমানের ক্যারিশমাটিক ম্যাজিক শুধু অব্যাহতই থাকেনি, বরং সেটা নতুন মাত্রায় উদ্ভাসিত হয়েছে। দলকে নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দিয়ে তিনি তার অন্য সব যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্নকে অর্থহীন করে দিয়েছেন; নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের তির্যক প্রশ্ন সামলেছেন তাৎক্ষণিক দক্ষতায়, উপস্থিত বুদ্ধির চমৎকারিত্বে।
ফলে খালেদ মহিউদ্দিনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অনাবশ্যক প্রশ্নের উত্তরে মঞ্চে সবাই হায় হায় করে উঠলেও তারেক রহমান নিরুত্তাপ কণ্ঠে উত্তর দিয়েছেন, ‘জনগণকে কনভিন্স করার ইঞ্জিনিয়ারিংই হচ্ছে আমাদের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং।’ ভারতীয় সাংবাদিকদের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে উৎকণ্ঠিত প্রশ্নের ছোট উত্তরে দিয়েছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। পাকিস্তানি সাংবাদিকের শেখ হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘আইন নির্ধারণ করবে পরবর্তী করণীয়’।
গত দেড় যুগের প্রথাসিদ্ধ স্তাবকতার সংবাদ সম্মেলনের বিপরীতে সাংবাদিকসহ দেশবাসী জবাবদিহিতার শুভ সূচনার সুঘ্রাণ পেয়েছে; সবার প্রত্যাশা, এটা যেন একটা প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নেওয়ার সকালে আবারও সেই নিরাভরণ সাদামাটা উপস্থিতি, বিকালে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও বেশভূষায় অনাড়ম্বরে, কিন্তু মাঝারি উচ্চতার শরীরকে ঋজু মেরুদণ্ডে যেভাবে প্রত্যয়ী দেখিয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই, ১৮ বছর আগে মেরুদণ্ডে বর্বরোচিত আঘাতকেও দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে অবজ্ঞায় ম্লান করে দেওয়া যে অসম্ভব নয়, সেটা তিনি প্রমাণ করেছেন সার্থকভাবে।
আবার পরদিনই সেই পরিচিত সাদামাটা সাদা হাফ-শার্ট আর বাদামি ট্রাউজারে সমান দৃঢ়তায় সচিবালয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রথম ঘণ্টা থেকেই কাজ, শুধু কথা নয়। নেই অর্থহীন ফুলেল অভিনন্দন বা শুভেচ্ছা, বরং আছে শনিবারেও অফিস করার দৃঢ় ঘোষণা। তবে চ্যালেঞ্জ একটাই, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাল মেলানোর কতটা সক্ষমতা তার মন্ত্রিসভা দেখাতে পারবে।
আল-জাজিরায় জামায়াতে আমিরের সাক্ষাৎকার : এমনিতেই এর আগে নারীদের কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়ে তিনি কর্মজীবী নারী সমাজকে শঙ্কিত করে তুলেছিলেন, এর সঙ্গে যুক্ত হলো এ সাক্ষাৎকারে নারীদের মনোনয়ন না দেওয়া নিয়ে তার দুর্বল যুক্তি, আর নারীদের পক্ষে ‘তাদের দলের শীর্ষ পদ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই’ বলার মধ্য দিয়ে নারীদের বিষয়ে দলের সংকীর্ণতাকে প্রকাশ্যে এনে ফেললেন। সুযোগ বুঝে তারেক রহমান নারীদের প্রতি বিএনপির ঐতিহ্যগত সম্মান ও মূল্যায়ন এবং নারী স্বার্থের পক্ষে বিএনপির দৃঢ় অবস্থান বারবার ব্যক্ত করতে শুরু করলেন। আমির সাহেবের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে নারীদের সম্পর্কে চরম অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করে তিনি তাদের ক্ষুব্ধ করলেন, পোস্ট সরিয়ে বা হ্যাকিংয়ের নাটক সাজানোর মাধ্যমে সেটার মেরামত যে তেমন একটা হয়নি, সেটা বলাই বাহুল্য।
শেষ অস্ত্র হিসাবে জামায়াত আমির আর শীর্ষনেতৃত্ব যখন ‘অমুক কে দেখেছেন, তমুককে দেখেছেন, এবার আমাদের সুযোগ দেন’ বলে আর্তি প্রকাশ করলেন, তাতে করুণার ভিক্ষা এতটা প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে, এটাতে সরকার পরিচালনার দৃঢ়তার প্রতিশ্রুতি ছিল একেবারে অনুপস্থিত। তারা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন, গণতান্ত্রিক বিশ্বে একটা দল বারবার ফিরে ফিরে দেশ পরিচালনায় আসে এবং সেটা যোগ্যতার ভিত্তিতেই, করুণায় নয়। বিপরীতে তারেক রহমান সরকার পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতার কথা যেমন বলেছেন, নির্বাচনের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে বেতার ও টিভি ভাষণে অতীতের ভুলভ্রান্তির জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনাও করেছেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে।
আর সোশ্যাল মিডিয়ায় জামায়াতের অতিরিক্ত ‘বট’ নির্ভরতার বিপরীতে বিএনপির মিডিয়া প্রচারণা ছিল পরিকল্পিত ও তুলনামূলকভাবে কম ভুলে আক্রান্ত; ফলে নির্বাচনের আগে আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বটআশ্রিত অতিরিক্ত জামায়াত প্রচারণা-গুজবের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, বিপরীতে মূল ধারার মিডিয়ায় বিএনপি গঠনমূলকভাবে এগিয়ে যায় সংগতভাবে; যার প্রভাবে নিশ্চিতভাবে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের বিএনপির পক্ষে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করে দেয়।
তারপরও জামায়াতের এ আসনপ্রাপ্তি এবং বিএনপির কিছু আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কারণ ছিল বিএনপির তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী, যারা ভোটের সমীকরণে বিরাট ভূমিকা রাখে; এদের ব্যাপারে বিএনপির অনমনীয় কঠোর পদক্ষেপ হয়তো জামায়াতের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে তাদের আসন সংখ্যা কমিয়েছে সত্যি; কিন্তু এটা ভবিষ্যৎ দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার রাজনীতিতে তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হিসাবেই নন্দিত হবে, সন্দেহ নেই।
শুরুতে দু-এক মন্ত্রী সামান্য বিচ্যুতি দেখালেও আমরা সেগুলো বিচ্ছিন্ন বলেই দেখতে চাই, তবে এ বদভ্যাস যেন মাননীয় মন্ত্রীরা অভ্যাসে পরিণত না করে ফেলেন। তারেক রহমান নতুন আঙ্গিকে তার প্রধানমন্ত্রিত্বের যাত্রা শুরু করেছেন-আর প্রত্যাশা এই যে, তার দেওয়া লম্বা প্রতিশ্রুতির চ্যালেঞ্জকে তিনি মানিয়ে নেবেন। শহীদ জিয়া আর বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার নিয়ে যে প্রত্যাশার জন্ম তিনি দিয়েছেন, সেখান থেকে ব্যর্থ হওয়ার বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ তার নেই।
অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল : আহ্বায়ক, বিএনপি মিডিয়া সেল
