পরিবার কল্যাণে এবং নারীর ক্ষমতায়নে ফ্যামিলি কার্ড
Advertisement
তাহমিনা আখতার টফি
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমান সরকারের নির্বাচনে ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড; ফারমার্স কার্ড; নারী স্বাস্থ্য; স্কুলের শিশুদের জন্য মিড-ডে-মিল; যুবকের কর্মসংস্থান এবং কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম, নির্বাচিত সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মধ্যে ১৪টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে একযোগে ৪০ হাজার নারীর কাছে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে ইতিহাস গড়লেন। এ ছাড়া সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম, পুরোহিত ও যাজকদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের জন্য প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা সম্মানি ভাতা প্রদান করার সিদ্ধান্ত ২-১ দিনের মধ্যে কার্যকরী হচ্ছে; প্রাথমিকভাবে ৪ হাজার ৮০৯টি মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য মোট ১০ হাজার টাকা এবং মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জার জন্য আট হাজার টাকা করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুর থেকে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো সরকারপ্রধানই নির্বাচনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি এত অল্প সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সমাজ কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করা হবে, এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগণের জন্য সরকারের সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে একটি নিশ্চিত খাদ্য এবং আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রদান করা। ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারকে একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা নীতি ও সেবা প্রদান ব্যবস্থায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন হলো।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো-দেশের দরিদ্র ও অতি দরিদ্র জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। এ কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার প্রতিমাসে নগদ দুই হাজার ৫০০ টাকা পাবে। উল্লেখ্য, গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম থাকা এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এ যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। বিশেষত, এ প্রকল্পটি নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা দিতে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিয়েছে, কারণ এ কার্ডটি শুধু পরিবারের নারীর নামে দেওয়া হবে। এতে পরিবারের গৃহকর্ত্রীরা তাদের আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতে সক্ষম হবেন, যা তাদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করবে। এ কার্ডের প্রধান মিশন হলো-‘একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্বাবলম্বীকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা’ এবং ভিশন হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসাবে রূপান্তর করা। এ কমর্সূচির মূল দর্শন হচ্ছে ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।
ফ্যামিলি কার্ডের ধারণাটি বাংলাদেশে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ; এর আগেও বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রকল্প চালু হয়েছে। ব্রাজিলের Bolsa Família-এর একটি সফল উদাহরণ, যা ২০০৩ সালে শুরু হয়েছিল। ব্রাজিলের এই কর্মসূচি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা প্রদান করে এবং তার ফলস্বরূপ সেখানে দারিদ্র্যের হার ব্যাপকভাবে কমেছে। বাংলাদেশের ফ্যামিলি কার্ডও এ ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অনুসরণ করতে চায়। কানাডার CCB (Canada Child Benefit) কর্মসূচি শিশুদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে এবং এটি শুধু পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে সাহায্যই করে না, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি করে। তবে কানাডায় এ ধরনের কার্যক্রম বাস্তবায়নে ১ বছর বা তারও বেশি সময় লেগেছিল। ভারতের Pradhan Mantri Jan Dhan Yojana কর্মসূচিও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে চালু করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে এবং যে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন সহজ করা হয়েছে। এ ছাড়া তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া এবং ইরানের মতো দেশগুলোর মধ্যেও ফ্যামিলি কার্ড বা এর অনুরূপ ব্যবস্থা বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন ধরনে কার্যকর হয়েছে, যা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়ক হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে, পর্যায়ক্রমে ৫ কোটি নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া এ কর্মসূচি সরকার নারী ও দরিদ্র পরিবার প্রধানের একটি ডেটাবেজ তৈরি করবে, যার মাধ্যমে QR কোড, NFC বা Contactless Chip প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুবিধাভোগী জনগণকে সিলেকশন প্রক্রিয়ায় নেবে, ফলে এখানে রাজনৈতিক কোনো নেতা বা স্থানীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে। এর ফলস্বরূপ, দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং সমৃদ্ধি বাড়বে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে, যেমন দারিদ্র্য হ্রাস, খাদ্য নিরাপত্তা এবং নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা। এটি নারী ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সহজ করা, আয় ও কর্মসংস্থান সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক জনগণের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে বৈষম্য হ্রাস করবে।
ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও করতে হবে, বিশেষত তথ্য সংগ্রহ এবং যাচাইয়ের বিষয়ে। এজন্য নিম্নোল্লিখিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।
প্রথমত, সরকারকে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে সঠিকভাবে সব তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে দরিদ্র, হতদরিদ্র, নারীপ্রধান পরিবার এবং প্রবীণ নারী নেতৃত্বাধীন পরিবারগুলোকে সুবিধাভোগী হিসাবে নির্বাচন করে একটি সঠিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ নারী প্রধান পরিবার বা দরিদ্র পরিবার; বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, রিমোট এলাকা, যেখানে কর্মের অভাব এবং তুলনামূলকভাবে আর্থসামাজিক অবস্থা নিম্নমানের রয়েছে ও নাগরিক সুযোগসুবিধা কম রয়েছে। এ ছাড়া নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী (পাহাড় ও সমতলভূমি) ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনতে হলে ডিজিটালাইজড ব্যাংকিং (নগদ বা বিকাশের) মাধ্যমে প্রদান সম্ভব নয়। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ওইসব পাহাড়ি এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেকের নামের বানানে ত্রুটির কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র করতে পারেনি। এসব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র কাঠামোতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, এ উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে দুর্নীতি কমানো এবং সঠিকভাবে সুবিধাভোগী পরিবারের নির্বাচন করা হবে। এজন্য সরকারের উচিত সামাজিক মিডিয়া এবং অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে তারা সহজে তথ্য জানতে এবং আবেদন করতে পারে। এ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করলে দুর্নীতি কমবে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি, কঠিন মনিটরিং এর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং স্থানীয় ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষভাবে ও সত্যিকার প্রাপ্য পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। গত শাসনামলে বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা দলীয় অনুসারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী নির্বাচনে আর্থিক লেনদেনও হয়েছে। এর ফলে, প্রাপ্ত সুবিধার পরিমাণ প্রান্তিক এলাকায় কম প্রদান করা হয়েছে।
পঞ্চমত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সর্বোপরি দ্রব্যমূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের চরম অব্যবস্থাপনা, বিগত সরকারের আর্থিক দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশকে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় এ বিশাল অর্থের জোগানের ব্যবস্থাপনাও নির্ধারণ করে নিতে হবে, যাতে কর্মসূচি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা থাকে।
পরিশেষে বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক উদ্যোগ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র এবং অসচ্ছল পরিবারগুলোকে উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে, যা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে, জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে সমতা আনবে। এ ছাড়া নারী ক্ষমতায়নে, পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদানে সর্বোপরি নারী জনগোষ্ঠীর মর্যাদা বৃদ্ধি ও বৈষম্য হ্রাস করতে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।
অধ্যাপক তাহমিনা আখতার টফি : গবেষক ও লেখক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
