Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সুশাসন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এজেন্টিক এআই

Advertisement

Icon

ড. শাহ জে মিয়া

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুশাসন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এজেন্টিক এআই

Advertisement

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিবর্তনীয় ধারায় জেনারেটিভ এআই থেকে এজেন্টিক এআইতে উত্তরণ কেবল একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; বরং এটি সুশাসন ও জনপ্রশাসনিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের একটি প্রধান অনুঘটক। প্রথাগত জেনারেটিভ এআই মূলত নির্দেশ বা প্রম্পটনির্ভর একটি ব্যবস্থা, যা নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কনটেন্ট বা সমস্যার সমাধান তৈরি করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার মতো জটিল ক্ষেত্রে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইনি বাধ্যবাধকতা এবং নাগরিক অধিকার জড়িত, সেখানে কেবল তথ্য সৃজন যথেষ্ট নয়। এখানে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে; বিভিন্ন ডিজিটাল টুলের সমন্বয় ঘটাতে পারে এবং প্রতিকূল পরিবেশে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। এজেন্টিক এআই এই শূন্যস্থান পূরণ করে সুশাসনকে একটি নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া থেকে সক্রিয় ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে পারে।

সুশাসনে এজেন্টিক এআই-এর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে এর সঙ্গে জেনারেটিভ এআই-এর মৌলিক পার্থক্যগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি। জেনারেটিভ এআই (যেমন : ChatGPT) মূলত ‘রিঅ্যাক্টিভ’ বা প্রতিক্রিয়ামূলক; এটি ব্যবহারকারীর প্রম্পটের জন্য অপেক্ষা করে এবং কাজ শেষে পরবর্তী নির্দেশের জন্য থেমে থাকে। অন্যদিকে এজেন্টিক এআই হলো, ‘প্রোঅ্যাক্টিভ’ বা স্বতঃপ্রণোদিত। এটিকে একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রদান করা হলে এটি নিজেই সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ধাপগুলো নির্ধারণ করে এবং স্বাধীনভাবে কাজ সম্পন্ন করে ফলাফল বের করে আনে। প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে যদি একজন কর্মকর্তাকে কোনো আবেদন যাচাই করতে হয়, জেনারেটিভ এআই হয়তো সেই আবেদনের একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু এজেন্টিক এআই সেই আবেদনটি গ্রহণ করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেটাবেজ থেকে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের তথ্য যাচাই করবে, কোনো ঘাটতি থাকলে সরাসরি নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে কর্মকর্তার টেবিলে উপস্থাপন করবে। এ ক্ষমতাটি মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) সঙ্গে ‘রিজনিং’ বা যৌক্তিক বিচার ক্ষমতা এবং ‘টুল ইন্টিগ্রেশনের’ সমন্বয়ে অর্জিত হয়ে থাকে।

বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের জনসেবা ব্যবস্থায় এজেন্টিক এআই-এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণগুলো সুশাসনের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা প্রমাণ করে। এস্তোনিয়া তার ‘বুরোক্র্যাট’ সিস্টেমের মাধ্যমে একটি আন্তঃসংস্থা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এখানে একজন নাগরিক কেবল একটি এআই এজেন্টের কাছে পাসপোর্ট নবায়নের অনুরোধ করলেই সেই এজেন্ট পর্দার আড়ালে পুলিশ, বর্ডার কন্ট্রোল এবং নাগরিক তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজটি সম্পন্ন করে দেয়। সিঙ্গাপুরের ‘লাইফএসজি’ বা ‘আস্ক জেমি’ নাগরিকদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা ১৫ মিলিয়নেরও বেশি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর চাপ প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। যুক্তরাজ্যের পুলিশবাহিনীতে ‘ববি’ নামক একটি এজেন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা নাগরিক অভিযোগ গ্রহণ ও সাধারণ জিজ্ঞাসার ৮২ শতাংশ সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্য তাদের ‘মাইআলাস্কা’ পোর্টালে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জটিল কর নির্ধারণ ও পারমিট নবায়নের কাজগুলো নাগরিকদের জন্য সহজতর করছে। নিউইয়র্ক সিটির মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি রেললাইন পরিদর্শনে এজেন্টিক এআই ব্যবহার করে যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও মেরামতের ব্যবস্থা করছে, যা শহরের অবকাঠামো রক্ষায় নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। সিঙ্গাপুর ‘Ask Jamie/LifeSG' সিস্টেমের মাধ্যমে প্রোঅ্যাক্টিভ নাগরিক সেবা দিচ্ছে, যা কল সেন্টারের কাজের চাপ ৫০ শতাংশ হ্রাস করেছে। যুক্তরাজ্য তাদের পুলিশি সেবা ও অভিযোগ গ্রহণের জন্য ‘Bobbi’ নামের সিস্টেম ব্যবহার করছে, যার সাহায্যে ৮২ শতাংশ জিজ্ঞাসার সফল স্বয়ংক্রিয় সমাধান হচ্ছে। পর্তুগাল ‘Gov.pt Assistant’ সিস্টেমের মাধ্যমে ২,৩০০ সেবার বহুভাষিক গাইড প্রদান করে সেবার প্রবেশযোগ্যতা বৃদ্ধি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘MTA Rail Inspector’ সিস্টেম দিয়ে রেল অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করছে, যা ত্রুটি শনাক্তকরণের গতি বাড়িয়েছে। এ বৈশ্বিক প্রবণতা নির্দেশ করে, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ শহর তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে এআই এজেন্ট যুক্ত করবে। এটি কেবল প্রযুক্তির বিস্তার নয়, বরং সরকারের বৈধতা ও নাগরিকদের আস্থা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত হাতিয়ার।

দেশে প্রশাসনিক কার্যক্রমে সুশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্পষ্টতা, যাকে প্রায়ই ‘ব্ল্যাক বক্স’ হিসাবে অভিহিত করা হয়। এজেন্টিক এআই এ সমস্যা সমাধানে ‘গ্লাস বক্স’ বা স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো উপহার দেয়। এ মডেলে এআই-এর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও যুক্তি একটি নিখুঁত অডিট ট্রেইল বা ডিজিটাল প্রমাণ হিসাবে সংরক্ষিত থাকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো মনে করে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি তহবিলের অপব্যবহার বা ‘হটস্পট’গুলো আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। এটি দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘প্রিডিক্টিভ অডিটিং’-এর পথ প্রশস্ত করে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ধারায় এজেন্টিক এআই-এর সংহতকরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এ প্রযুক্তির গভীর কৌশলগত মিল রয়েছে। ৩১ দফার ২ নম্বর দফায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এজেন্টিক এআই ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি ‘পারসোনালাইজড পাবলিক সার্ভিস’ প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের একটি নতুন সামাজিক চুক্তি বা ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ তৈরি করতে পারে। ১৩ নম্বর দফায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ এবং ১৫ নম্বর দফায় অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এজেন্টিক এআই সরকারি দপ্তরের ফাইলের স্তূপ কমাতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে সক্ষম। ৩১ দফায় উল্লিখিত ‘ন্যায়পাল’ পোর্টালে এ প্রযুক্তি যুক্ত করা হলে নাগরিকদের প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত আমলে নেওয়া এবং সমাধানের অডিট লগ রাখা সহজতর হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তরুণদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখছেন, তার মূলে রয়েছে আইসিটি শিক্ষার আধুনিকায়ন। বর্তমানে বাংলাদেশে আইসিটি ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের ফেল করার যে প্রবণতা রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে না পারলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ প্রতিযোগিতামূলক যুগে টিকে থাকা কঠিন হবে। এজেন্টিক এআই তরুণ ফ্রিল্যান্সার ও উদ্যোক্তাদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে এবং শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এজেন্টিক এআইকে রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণের অংশ করা অপরিহার্য।

ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; উপদেষ্টা, বিএনপি অস্ট্রেলিয়া এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহির্বিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

শিক্ষকের নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সংকট

সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন : বাস্তবতায় পৌঁছানোর পথ

সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন : বাস্তবতায় পৌঁছানোর পথ

হালফিল বয়ান সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম