পাকিস্তানের পারমাণবিক সুরক্ষা : একটি বিশ্লেষণ
Advertisement
কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সর্বাধিক আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো-পাকিস্তান প্রদত্ত একটি সম্ভাব্য ‘পারমাণবিক আচ্ছাদনের’ (Nuclear Umbrella) আওতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। একাধিক বিশ্লেষক, কৌশলবিদ এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক অনেক ক্ষেত্রেই অতি মাত্রায় উৎসাহী হয়ে এবং আবেগপ্রবণতার বশবর্তী হয়ে মনে করছেন, ভারতের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক আধিপত্য, সীমান্তে অবিরাম হত্যা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং কৌশলগত বেষ্টনী নীতির মোকাবিলায় এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর প্রতিরোধ ও সামগ্রিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে বিষয়টি আকর্ষণীয় বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, এর মাধ্যমে এমন একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে কোনো সামরিক আগ্রাসন পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে সক্রিয় করতে বাধ্য করবে। ফলে ভারতের সম্ভাব্য আগ্রাসনের রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য অনেক বেড়ে যাবে এবং নয়াদিল্লিও হয়তো আরও সংযত অবস্থান গ্রহণে বাধ্য হবে।
কিন্তু বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি এবং সামরিক কৌশলের বিচারে এ ধারণাটি বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। উপরন্তু এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে নতুন ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। প্রথমত, পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতির বাস্তবতার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্মই হয়েছে ভারতের সামরিক শক্তিকে প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে। ঐতিহাসিকভাবে তাদের পারমাণবিক নীতি পুরোপুরিভাবে ভারতকেন্দ্রিক; তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানের লক্ষ্যে নয়। অন্যদিকে, ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য Extended Nuclear Deterrence প্রদান করে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সামরিক জোট, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, অগ্রবর্তী মোতায়েনব্যবস্থা কিংবা আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক প্রতিরক্ষা নীতি নেই। ফলে বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের যে কোনো পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি বাস্তব অপারেশনাল সক্ষমতার চেয়ে প্রতীকী ঘোষণা হিসাবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দ্বিতীয়ত, ভৌগোলিক বাস্তবতা। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মাঝখানে বিস্তৃত ভারতীয় ভূখণ্ড ও আকাশসীমা অবস্থান করছে। ফলে যে কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পক্ষে বাংলাদেশকে দ্রুত প্রচলিত সামরিক সহায়তা দেওয়া কার্যত অসম্ভব। কার্যকর পারমাণবিক প্রতিরোধ তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন নিরাপত্তা-দাতা রাষ্ট্রের হাতে সামরিক হস্তক্ষেপের বাস্তব সক্ষমতা এবং সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট কোনো সংঘাতে পাকিস্তান আদৌ ভারতের বিরুদ্ধে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে কি না-সেটিও অত্যন্ত অনিশ্চিত। বিশেষত, পাকিস্তান নিজেই সরাসরি আক্রমণের মুখে না পড়লে তা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ নিজেকে একটি শান্তিপ্রিয়, দায়িত্বশীল এবং অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর তাই পাকিস্তানের পারমাণবিক নিরাপত্তাবলয়ের সঙ্গে দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হওয়ার ধারণা বাংলাদেশের এই ইতিবাচক ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগে বাংলাদেশের নৈতিক অবস্থানও দুর্বল হতে পারে। চতুর্থত, ভারতের পালটা প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা। এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে ভারত সম্ভবত তার পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি করে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করবে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর করবে এবং বাংলাদেশের ওপর তার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি পানিবণ্টন ইস্যুকেও কৌশলগত হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে বঙ্গোপসাগরে নৌসামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, আঞ্চলিক কূটনৈতিক চাপ এবং অন্যান্য কৌশলগত পদক্ষেপও গ্রহণ করা হতে পারে। এর ফলস্বরূপ যে পারমাণবিক ছায়াকে নিরাপত্তার উৎস হিসাবে কল্পনা করা হচ্ছে, সেটিই উলটো বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে অধিকতর জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
নেতিবাচক পূর্বাভাস সত্যেও বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, প্রস্তাবিত নিরাপত্তাব্যবস্থার কিছু সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এটি সীমিত পরিসরে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের দরকষাকষির অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে এবং বাংলাদেশ যে কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নয়, সেই বার্তাটিও শত্রুভাবাপন্ন দেশের নিকট পৌঁছে দিতে পারে। তবে এসব সুবিধা পুরোপুরি নির্ভর করবে পাকিস্তান প্রকৃত সংকটময় পরিস্থিতিতে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা ইচ্ছুক ও সক্ষম তার ওপর।
অধিকতর বাস্তবসম্মত বিকল্প
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার সর্বোত্তম কার্যকর পথ নিহিত রয়েছে তার স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার মাঝে। এর জন্য প্রয়োজন-সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকীকরণ; বিমান ও নৌপ্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা; সাইবার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি; গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; একটি শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা; এবং সর্বোপরি, প্রতিটি সক্ষম ও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এবং বিশেষভাবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে বাংলাদেশের পক্ষে এমন কোনো একচ্ছত্র (exclusive) সামরিক জোটে জড়ানো উচিত হবে না, যা দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে কার্যকর কূটনীতি-এসবই বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও সুসংহত করবে।
পরিশেষে, সর্বদিক বিবেচনায় এবং নিরপেক্ষ বিচারে পাকিস্তানের পারমাণবিক ধারণাটি ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলায় একটি আকর্ষণীয় কৌশলগত বিকল্প হিসাবে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও আমি মনে করি, বাস্তবতার বিচারে এটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কিংবা কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়। বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা নিহিত রয়েছে তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক ভারসাম্য, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে অন্য কোনো রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের ওপর নির্ভরশীলতায় নয়।
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে মৌলিক বিষয়টি আমাদের মনে রাখা জরুরি তা হচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী যে কোনো বৃহৎ সামরিক চুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সামরিক কৌশলবিদদের একক সিদ্ধান্তের বিষয় হতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐকমত্য এবং সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান, বীরপ্রতীক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
