Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

Advertisement

Icon

মেজর (অব.) মনজুর কাদের

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ

Advertisement

সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীনকে ঘুমাতে দাও; যখন সে জেগে উঠবে, সে বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেবে।’ তিনি ১৮১৭ সালে লর্ড অ্যামহার্স্টকে এ মন্তব্যটি করেছিলেন। লর্ড আমহার্স্ট ছিলেন ব্রিটিশ কূটনীতিক ও ঔপনিবেশিক প্রশাসক। তিনি ১৮২৩ থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ-ভারতের প্রতিবেশী ছিল চীন। আমহার্স্টকে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যদি চীনের বিশাল জনসংখ্যার সঙ্গে সম্পদ সুষ্ঠুরূপে সংগঠিত হয়, তবে দেশটি বিদ্যমান বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূলভাবে পরিবর্তন করবে।’

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু : নেপোলিয়নের এ উক্তিটি পড়ার সময় হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনে হয়নি অথবা পড়ে থাকলেও পাত্তা দেননি। ট্রাম্প তার নিজের দেশে ১৯৭০-এর দশকে নির্মিত ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’ টেলিভিশন সিরিজে, ডক্টর ডেভিড ব্যানারের (বিল বিক্সবি অভিনীত) সংলাপও ভুলে গিয়েছিলেন। কঠিনভাবে সতর্ক করে ব্যানার তার প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন : ‘মিস্টার ম্যাকগি, আমাকে রাগাবেন না। আমি রেগে গেলে আপনি আমাকে পছন্দ করবেন না।’ তাই তিনি প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার পরপরই (২০১৭ সালে) চীনের বাণিজ্য কৌশলের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর ২০১৮ সালের মার্চ মাসে তিনি চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিশাল অঙ্কের শুল্কারোপের ঘোষণা দেন, যা একই বছরের জুলাই মাসে কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যযুদ্ধের সূচনা ঘটে; যা স্নায়ুযুদ্ধে রূপ নেয়।

ঘুমন্ত চীন জেগে ওঠে : গণচীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং-এর পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন। মাওয়ের মতো তিনিও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) ‘মূল’ নেতা এবং কোনো উত্তরসূরি বা মেয়াদসীমার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ সুগম করেন। ঠিক এ সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ঘুম ভেঙে দেন। জেগে উঠে চীন। নেপোলিয়নের উক্তি অনুযায়ী ‘বিশ্বকে কাঁপিয়ে’ দেওয়ার জন্য দেশটি প্রস্তুত হতে থাকে।

ওল্ফ ওয়ারিয়র কূটনীতি : প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতা সুসংহত করে নড়েচড়ে বসেন। ২০১৯-২০ সালের দিকে তিনি বেশি আলোচনায় আসেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, শি-এর সময়ে চীন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে ‘ওল্ফ ওয়ারিয়র কূটনীতি’ চালু করে। ওল্ফ কূটনৈতিক ধারা হলো, চীনা কূটনীতিকরা আগের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, দৃঢ় এবং প্রকাশ্য ভাষায় চীনের স্বার্থ রক্ষা করেন। এ নামটি এসেছে চীনের জনপ্রিয় দেশপ্রেমের বিষয় নিয়ে তৈরি অ্যাকশন চলচ্চিত্র ওল্ফ ওয়ারিয়র এবং ওল্ফ ওয়ারিয়র ২ থেকে। ওল্ফ ওয়ারিয়র কূটনীতি হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে চীন প্রয়োজনে আপসহীন ও প্রকাশ্যভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরে, যেখানে আগে তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষা বেশি ব্যবহৃত হতো। এ কূটনীতির বৈশিষ্ট্যগুলো হলো : ১. বিদেশি সরকার বা গণমাধ্যমের সমালোচনার তীব্র জবাব দেওয়া। ২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে চীনের অবস্থান তুলে ধরা। ৩. তাইওয়ান, হংকং, জিনজিয়াং ও দক্ষিণ চীন সাগরের মতো ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া। ৪. চীনের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

‘ওল্ফ ওয়ারিয়র কূটনীতি’ : বাংলাদেশ প্রসঙ্গ : চীনের কূটনৈতিক তৎপরতার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের বিষয়। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে বলেছে : ১. ‘চীন বাংলাদেশকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা সমুন্নত রাখতে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করতে সমর্থন করে।’ ২. চীনের বাংলাদেশস্থ দূতাবাস ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছে, ‘বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগের জন্য চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংযোগ সড়ক উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত রয়েছে।’ ৩. চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে প্রস্তুত। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জনজীবনের মান উন্নয়ন ও দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি খাতের স্বার্থে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও যে কোনো মূল্যে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। তবে এ ক্ষেত্রেও রয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক করিডর : চীনের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরে যুক্ত হতে বাংলাদেশ কোথায় কোথায় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, তা নিয়ে পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের রুট হিসাবে চীনের করিডর তৈরির প্রস্তাব এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, চীনের এ প্রকল্প বিসিআইএম নামে পরিচিত। বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব একযুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালে সামনে এনেছিল বেইজিং। কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তা এগোয়নি। পরে ভারতকে বাদ দিয়েই চীন মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর তৈরির পরিকল্পনা করে, তাতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি আসে।

নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রস্তাব : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২ জুন থেকে যখন তিন দিনের সফরে চীনে ছিলেন, তখন তার সঙ্গে বৈঠকে অর্থনৈতিক করিডরের ওই প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আলোচনায় আসছে ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন। কূটনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ভারতের অবস্থান সেখানে একটি বড় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, সেটাও বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে এ করিডর যাবে মিয়ানমারের মান্দালয়ে। সেখান থেকে করিডরের একটি অংশ যাবে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন এবং অন্য অংশ বিস্তৃত হবে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সংযোগটি সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হলেই বাংলাদেশ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আসিয়ান জোটভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব আরও গভীর হবে-যা হতে পারে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

প্রতিবন্ধকতা : উত্তরণের পথ রয়েছে চীনের হাতে : অনেক বিশ্লেষক বলছেন, মিয়ানমারের উত্তরাংশ বিদ্রোহীদের দখলে থাকার কারণে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিরূপ আচরণে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অসুবিধা হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের বর্তমান ওল্ফ কূটনৈতিক তৎপরতা এসব সমস্যার সমাধান ত্বরিতগতিতে করে দেবে। এ সংযোগ সড়ক স্থাপিত হলে চীন কার্যত বাংলাদেশের প্রতিবেশী হিসাবে আবির্ভূত হবে, যা বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী ভারতের পছন্দ নয়। বাংলাদেশের জনগণ বন্ধু হিসাবে এখন ভারতের বিকল্প খুঁজছে। চীনের প্রেসিডেন্ট বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। চীনের ‘ওল্ফ ওয়ারিয়র কূটনীতির’ বাতাস বাংলাদেশে বইতে শুরু করেছে। এ বাতাসের বেগের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কার আছে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

প্রয়োজন ‘প্যারিস’-এর : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য হলো আধিপত্যবাদী শক্তির ‘একিলিস হিল’। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম, অরুণাচল, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা-এ সাতটি রাজ্য চীন, বার্মা (মিয়ানমার), ভুটান এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সীমান্তবর্তী হওয়ায় ব্রিটিশ ও পরে ভারতীয় নেতৃত্ব কৌশলগত কারণে এ অঞ্চলকে ভারতের অংশ হিসাবে ধরে রাখতে আগ্রহী ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট এ সাতটি রাজ্য ভারতের অংশ হয়ে গেলেও ভারত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে; যার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী ভারত ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার মাটিতে ভারতের সেনাবাহিনী পাঠিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করায়। এরপর বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে চাইলে বাংলাদেশের মানুষ বারবার ভারতের এ দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং বিজয়ী হন।

নতুন স্নায়ুযুদ্ধ : নতুন বিশ্ব : এছাড়া বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে গেছে। নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি বাংলাদেশের জনগণের অনুকূলে এসেছে। বিগত স্নায়ুযুদ্ধের সময় সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী ভারত ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভেঙে দেয় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকে। এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পুঁজিবাদের নেতা যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে সহায়তা করে। এ দিন স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া বর্তমান স্নায়ুযুদ্ধের সময়েও পূর্বের স্নায়ুযুদ্ধের মতো বহু দেশ যে ভেঙে যাবে এবং নতুন নতুন পতাকা আসবে দৃশ্যপটে, তার আলামত দেখা যাচ্ছে।

বিপদ উতরে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে : বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের সময় ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসের মতো একজন বীরকে পেয়েছিলেন-তিনি হলেন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক, বীর উত্তম খেতাবধারী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। জিয়া খুঁজে বের করেছিলেন আধিপত্যবাদী শক্তির ‘একিলিস হিল’ (দুর্বলতম স্থান)-তিনি এ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। শহীদ জিয়ার সন্তান তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, পারবেন কি তিনি জিয়াউর রহমানের মতো দৃঢ়চিত্তে আধিপত্যবাদী শক্তিকে রুখে দিতে? জনগণ প্রস্তুত, তারা শুধু দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।

মেজর (অব.) মনজুর কাদের : সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ-সদস্য

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম