শিক্ষাদর্শন ছাড়া শিক্ষা-সংস্কার অর্থহীন
Advertisement
ড. শওকত হোসেন
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার হলেও শ্রেণিভেদে এ মৌলিক অধিকারটিও যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য নিশ্চিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র আর যাই হোক, কোনোভাবেই কল্যাণ রাষ্ট্র হতে পারে না। যথোপযুক্ত শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতিই সত্যিকার অর্থে অগ্রগতি লাভ করছে এমনটি বলা যায় না। এমনকি বৈষয়িক উন্নতির নিরিখে বিবেচনা করলেও শিক্ষা ছাড়া উন্নত দেশ ও জাতি কল্পনা করা যায় না। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক ক্ষমতা বা অন্য যেসব সূচকে যেসব দেশকে আমরা অগ্রসরমান বলে মনে করি সেসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নজর দিলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। জনসাধারণকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করা, সুস্থ সংস্কৃতির লালন এবং মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে একটি মার্জিত ও সত্যিকারের আদর্শ জাতি গঠনের জন্যও প্রয়োজন সুশিক্ষা। আর এজন্য দরকার সুনির্দিষ্ট শিক্ষা পরিকল্পনা। প্রকৃতপক্ষে একটি দেশের কাঠামোগত শিক্ষার ওপরেই জাতীয় চরিত্র নির্ধারিত হয়। আমরা কেমন জাতি চাই, তা নির্ভর করে আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনা কেমন এবং তা কতটা সঠিকভাবে কার্যকর করা হচ্ছে তার ওপর। একটি উন্নত দেশ ও জাতি গঠনের জন্য তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপযুক্ত জনশক্তি তৈরি করতে হয়। শ্রম বাজারের জন্য দক্ষ শ্রমিক যেমন দরকার, তেমনি উচ্চতর কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রযুক্তিবিদ্যায় অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞও প্রয়োজন। ঠিক একইভাবে চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে যেমন উচ্চতর গবেষক দরকার, তার পাশাপাশি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এমনকি শ্রমিকও প্রয়োজন। দেশের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসন পরিচালনা থেকে শুরু করে সব সেবা ক্ষেত্র এবং উৎপাদন ক্ষেত্রের জন্য দক্ষ কর্মী বাহিনী ও উচ্চতর মেধাবী গবেষক উভয় শ্রেণির প্রয়োজন রয়েছে একটি আদর্শ রাষ্ট্র বা জাতির জন্য। এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরিতেও রয়েছে শিক্ষার একনিষ্ঠ ভূমিকা।
আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে দার্শনিক প্লেটো একটি আদর্শ রাষ্ট্র পরিকল্পনা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। তার শিক্ষাব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সত্যিকার অর্থেই যোগ্য এবং ন্যায়পরায়ণ আদর্শ শাসকশ্রেণি তৈরি করা। তার এই কল্পিত রাষ্ট্রের জন্য তিনি তৈরি করেছিলেন একটি সুনির্দিষ্ট শিক্ষাদর্শন। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্র একটি দার্শনিক প্রকল্প, একটি মডেল। যুগের পরিবর্তনে এবং দেশগত, জাতিগত ভিন্নতার কারণে এ মডেল সর্বক্ষেত্রে কখনোই প্রযোজ্য হবে-বিষয়টি তা নয়। তিনি তার সমাজে অর্থাৎ তৎকালীন গ্রিসেও এটি প্রবর্তন করতে পারেননি। তবে তার ওই রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য তিনি সুনির্দিষ্ট একটি শিক্ষানীতির কথা প্রস্তাব করছিলেন; শিক্ষাদর্শনের ইতিহাসে যা ব্যাপক তাৎপর্য বহন করে।
আজকের দুনিয়ায় প্রত্যেকটি জাতি তাদের উন্নতির জন্য ভিনদেশি কোনো নীতিকে কিছুটা অনুসরণ-অনুকরণ করলেও প্রত্যেকটি সফল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে তাদের জাতীয় স্বার্থভিত্তিক এবং জাতির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবভিত্তিক শিক্ষাদর্শন। পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা যেমন তাদের দেশ ও জাতির প্রকৃতি ও স্বপ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, তেমনি চীন, জাপান, সিঙ্গাপুরসহ প্রাচ্যের দেশগুলোর উন্নতিও তাদের নিজস্ব শিক্ষাদর্শনের দ্বারা পরিচালিত।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমরা শুধু বিদেশমুখী। আমরা কখনো কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম করে অথবা ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাম করে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে অনুকরণ করতে চাই, আমদানি করতে চাই, আবার মাঝে মাঝে গড়পড়তা কথা যেমন বিশ্বমানের শিক্ষার কথা বলি। বিশ্বের সব রাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলানো অথবা প্রতিযোগিতা করা কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান উদ্দেশ্য হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে নিজের দেশের জন্য কোনো নীতি উপযুক্ত সেটা নির্ধারণ করতে হয় দেশের বাস্তবতার বিষয়টি মাথায় রেখে। নিজের সামর্থ্য ও সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি দিয়ে কীভাবে জাতীয় উন্নতি নিশ্চিত করা যায়-সেরকম একটি দার্শনিক চিন্তার ভিত্তিতেই গঠিত হতে পারে একটি শিক্ষানীতি। এ শিক্ষানীতি অনুযায়ী পাশ করতে হয় বিভিন্ন শিক্ষা আইন এবং সেগুলো শিক্ষা প্রশাসক, ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট সবার যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবায়ন করলেই দেশ শিক্ষাক্ষেত্রে সত্যিকারের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারবে বলে বিশ্বাস করা যায়। বিশ্বের সব দেশের ক্ষেত্রে সেরকমটিই হয়েছে। তাই শিক্ষাকে হতে হবে দেশ উপযোগী। আর এজন্য দরকার দেশকেন্দ্রিক শিক্ষাদর্শন।
দেশকেন্দ্রিক শিক্ষাদর্শন বলতে সেই ধরনের শিক্ষাবিষয়ক দিকনির্দেশনাকে বোঝায়, যেটা সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য। শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠ্য বিষয় তথা কোর্স কারিকুলাম, পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়ন পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি যেমন অন্তর্ভুক্ত থাকবে, ঠিক তার পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষা-প্রশাসক, শিক্ষার আনুষঙ্গিক পরিবেশ ইত্যাদির ক্ষেত্রেও নিজ দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে শিক্ষাদর্শনে। জোড়া-তালি দেওয়া শিক্ষানীতি কখনোই কার্যকর হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ফিনল্যান্ডের কোর্স কারিকুলাম এবং পাঠদান পদ্ধতি আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি কার্যকর করতে চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সেখানকার শিক্ষক বাছাই পদ্ধতি, শিক্ষকদের যোগ্যতা এবং তাদের বেতন স্কেল ও অন্য সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি বিষয় আমলে না নেওয়া হয়, তাহলে তা কার্যকর হবে না। বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুকরণে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণার লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেসব অনুকরণীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত বাজেট বিষয়টিও আমলে নিতে হবে। সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ কতটা শঙ্কামুক্ত-সে বিষয়টিও ভেবে দেখতে হবে। জাতিগতভাবে নাগরিক সমাজের বড় অংশ অথবা সরকারে থাকা ব্যক্তিরা সবাই আমরা অনুকরণপ্রিয়। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করার মধ্যদিয়ে আনন্দ অনুভব করি। কিন্তু নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বনামধন্য করে তুলতে সক্রিয় হই না। আসলে নিজ নামে বড় হতে গেলে দরকার সক্রিয় কর্মপরিকল্পনা এবং তার পর্যাপ্ত বাস্তবায়ন।
দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়া অনুপস্থিত থাকার কারণে সব শ্রেণির মানুষের স্বার্থরক্ষার জন্য এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থ বিবেচনার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। বরং ক্ষমতার প্রয়োজনে অথবা রাজনৈতিক স্বার্থে নানা রকম শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষক সমাজের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়েছে। তাই সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর। আর এ কাজটি করতে হলে শুধু জনতুষ্টিমূলক রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে, শিক্ষায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন-যার মূলে থাকবে জাতীয় অগ্রগতি নিশ্চিত করার নিমিত্তে সুচিন্তিত দার্শনিকতত্ত্ব।
ড. শওকত হোসেন : অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
