অন্যদেরও আনন্দের ভাগীদার করা দরকার
Advertisement
আসিফ রশীদ
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র কী হওয়া উচিত-কল্যাণমূলক, নাকি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষাকারী? এ প্রশ্ন যখনই সামনে আসে, তখন অর্থনীতির গাণিতিক হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সম্প্রতি ঘোষিত নবম পে-স্কেল যেন ঠিক সেদিকেই আঙুল তুলেছে। জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বাসাভাড়া বেড়েছে। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত-সবকিছুর খরচ বেড়েছে। ফলে তাদের বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাকি জনগোষ্ঠীর সমস্যা কে দেখবে?
সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের জন্য বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এর পেছনের সমীকরণগুলো যখন মেলাতে যাই, তখন এক গভীর অস্বস্তি জেঁকে বসে। এ কোন অর্থনীতি, যেখানে দেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ২৪ লাখ (১.৩৩ শতাংশের মতো) রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর সুফল ভোগ করে, অথচ তাদের এই বেতন বৃদ্ধির ঘানি টানতে হয় বাকি প্রায় নিরানব্বই শতাংশ সাধারণ মানুষকে? পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ বুঝতে খুব বেশি অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। রাষ্ট্র যখন তার বাজেটের একটি বিশাল অংশ সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পেছনে বরাদ্দ করে, তখন সেই অর্থের উৎস খুঁজতে আমাদের পকেটই হাতড়াতে হয়। এই বাড়তি টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। আসে জনগণের দেওয়া পরোক্ষ কর, ভ্যাট এবং সাধারণ মানুষের ঘাম ঝরানো আয়ের অংশবিশেষ থেকে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে বাড়তি টাকা আসা মানেই বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যাওয়া, যার অনিবার্য পরিণতি সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়া। অথচ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন গতিতে পিষ্ট হয়, তাদের আয় বাড়ে না।
এ এক অদ্ভুত বৈষম্যমূলক নীতি। রাষ্ট্র যেন নিজেই দুটি শ্রেণি তৈরি করে দিচ্ছে-একদিকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা সুবিধাভোগী প্রজাতন্ত্রের ‘কর্মকর্তা-কর্মচারী’, অন্যদিকে আক্রার বাজারে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে প্রতিনিয়ত হেরে যাওয়া আমজনতা। এ কেমন অর্থনীতি, যেখানে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের চাবিকাঠি সাধারণের কল্যাণের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকে? এখানেই প্রশ্ন-রাষ্ট্রের অর্থনীতি কি এমন হওয়া উচিত, যেখানে একটি অপেক্ষাকৃত সংগঠিত শ্রেণির আয় দ্রুত বাড়বে, আর বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সেই ব্যয়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বোঝা বহন করবে? প্রশ্নটি সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্নটি রাষ্ট্রের বেতননীতি নিয়ে। আসলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা আয় নিয়ে নয়, বণ্টন নিয়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতিসংক্রান্ত বিতর্কে আমরা প্রায়ই বলি-দেশের আয় বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। কিন্তু একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু অর্থনীতি কত বড় হলো তা নয়; প্রশ্ন-সেই সম্পদের কতটা কার হাতে গেল।
সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তাদের ন্যায্য বেতন পাওয়ার অধিকার আছে। রাষ্ট্র যদি দক্ষ ও সৎ প্রশাসন চায়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদের এমন বেতন দিতে হবে যাতে তারা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন এবং দুর্নীতির প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে পারেন। কিন্তু ন্যায্য বেতন এবং বৈষম্যহীন অর্থনীতি-দুটিকে পরস্পরের বিপরীত হিসাবে দেখারও কোনো সুযোগ নেই। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন রাষ্ট্র শুধু একটি নির্দিষ্ট কর্মজীবী শ্রেণির আয় সমন্বয় করে; কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আয়, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্নটি হয় উপেক্ষিত।
সরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়াতে হলে একইসঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, বেসরকারি চাকরিজীবীর আয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার নীতিও থাকা দরকার। তা না হলে একটি শ্রেণির জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি অন্য শ্রেণির ওপর চাপ সৃষ্টি করবেই।
এখানে কার্ল মার্কসের কথা আসতে পারে। মার্কস পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ ও উৎপাদনের মালিকানার কেন্দ্রীভবন এবং শ্রেণিবৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা আজও অর্থনীতির প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। মার্কস আজ বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, এটি পুঁজিবাদের এমন এক বিকৃত রূপ, যেখানে উৎপাদনের মাধ্যম নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে উদ্বৃত্ত মূল্যকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর পকেটে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। মাকর্সের ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বা সাম্যবাদ এ যুগে সরাসরি বাস্তবায়ন করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়, তবে এর মানে এই নয় যে, বৈষম্যের দানবীয় রূপকে আমরা প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেব। বিকল্প চিন্তার দরজা তো বন্ধ হয়ে যায় না।
এই জায়গাটিতেই ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির (‘একুশ শতকের কার্ল মার্কস’ নামে পরিচিত) তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। পিকেটি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, পুঁজি যখন সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশে কুক্ষিগত হতে থাকে এবং এর প্রবৃদ্ধির হার সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুততর হয়, তখন সমাজে আয় ও সম্পদের বৈষম্য অনিবার্যভাবে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। পিকেটির মূল প্রস্তাবনা ছিল সম্পদ ও আয়ের এই অসম বণ্টন নিরসনের বিষয়ে। এজন্য তিনি প্রগতিশীল করারোপ (Progressive Taxation) এবং সম্পদের সুষম পুনর্বণ্টনের ওপর জোর দিয়েছেন। পিকেটির বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-সম্পদ থেকে পাওয়া আয় যদি শ্রমের আয়কে দীর্ঘমেয়াদে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সম্পদ ক্রমেই অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এর ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় পিকেটির ভাবনার একটি নীতিগত শিক্ষা হতে পারে-শুধু আয় নয়, সম্পদের ওপরও ন্যায্য করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বাংলাদেশে আমরা কি এমন একটি করব্যবস্থা তৈরি করতে পারি না, যেখানে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকবে; কিন্তু অতিরিক্ত সম্পদ, বিলাসী ভোগ, উত্তরাধিকার ও অস্বাভাবিক মূলধন লাভের ওপর উপযুক্ত কর আরোপ করা হবে? এতে রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়বে। সেই রাজস্ব দিয়ে শুধু সরকারি বেতন নয়; সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, পরিবহণ ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা যাবে।
কিন্তু আমাদের দেশের নীতিপ্রণেতারা ঠিক এর উলটো কাজটি করে চলেছেন। তারা সাধারণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে সেই অর্থ ঢেলে দিচ্ছেন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পকেটে। এটি পিকেটির মূল দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি সমতাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রের আর্থিক নীতিমালায় মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। কেননা শুধু সরকারি খাতের একটি ক্ষুদ্র্র অংশকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মাপা যায় না। বরং দেখতে হবে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে কিনা। বেসরকারি খাতের লাখ লাখ মানুষের বেতনের অনিশ্চয়তা, তরুণদের বেকারত্ব এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার লড়াইকে পাশ কাটিয়ে কেবল প্রশাসনিক বলয়ের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদে একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। সময় এসেছে কাঠামোগত এই বৈষম্যমূলক নীতি থেকে বেরিয়ে আসার। টমাস পিকেটির চিন্তার আলোকে আমরা যদি আমাদের করনীতি এবং সম্পদ পুনর্বণ্টন প্রক্রিয়াকে সাজাতে পারি, তাহলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ আশা করা যায়-যেখানে রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে, কোনো বিশেষ শ্রেণি এককভাবে রাষ্ট্রের সব সুফল ভোগ করবে না।
আমরা ‘সমতাভিত্তিক’ অর্থনীতির কথা বলি। সমতাভিত্তিক অর্থনীতি মানে সবার আয় সমান করে দেওয়া নয়। সেটি বাস্তবসম্মতও নয়। সমতা মানে সুযোগের সমতা। ন্যায্যতার সমতা। রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য কমানো। একজন দরিদ্র পরিবারের সন্তান যেন শুধু অর্থের অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। একজন কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে দরিদ্র না থাকে। একজন শ্রমিক যেন হাঁড়ভাঙা পরিশ্রম করেও চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিরাপত্তার অভাবে অকালে মারা না যায়।
রাষ্ট্রের অর্থনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে আয় বাড়বে, কিন্তু বৈষম্য বাড়বে না। তাই পে-স্কেলকে দেশের সামগ্রিক আয়-বণ্টন নীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সরকারকে বলতে হবে-সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে, কিন্তু পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ানো হবে না। সরকারকে বলতে হবে-রাজস্ব বাড়ানোর জন্য নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন বোঝা চাপানো নয়; বরং কর ফাঁকি বন্ধ করা হবে, অবৈধ অর্থের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং উচ্চ সম্পদশালীদের কাছ থেকে ন্যায্য অংশ আদায় করা হবে। সরকারকে বলতে হবে-সরকারি বেতন বাড়বে, পাশাপাশি সরকারি সেবার মানও বাড়বে।
একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে তিনি আনন্দিত হবেন-এটাই স্বাভাবিক। একজন শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও তার পরিবার আনন্দিত হবে। একজন কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পেলেও আনন্দিত হবেন। একজন বেসরকারি কর্মচারীর আয় বাড়লে তার পরিবারও স্বস্তি পাবে। রাষ্ট্রের কাজ হলো একজনের আনন্দকে অন্যের দুর্ভোগে পরিণত না করা, বরং অন্যকেও আনন্দিত করা।
আসিফ রশীদ : উপসম্পাদক, যুগান্তর
