প্রান্তিক মানুষের স্বার্থহানি অনাকাঙ্ক্ষিত হবে
Advertisement
তারিক সাইদ হারুন
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখতে বাধা নেই। মানুষ তার শখ বা ইচ্ছানুযায়ী প্রিয়জনের নাম রাখতে পারলেও কানা ছেলের নাম কেউ পদ্মলোচন রাখে না। ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ প্রবচনের মতো আইনের মারপ্যাঁচে বৈধ হলেও অনেক সিদ্ধান্ত, অনেক উদ্যোগ বাস্তবসম্মত ও শোভন হয় না। যেমন-ক্রিকেটে ম্যানকাডিং রান আউট। বোলার বল ছোড়ার সময় নন-স্ট্রাইকিং অ্যান্ডের ব্যাটার ক্রিজ ছাড়লে বোলার কর্তৃক উইকেট ভেঙে রান আউট করার আইনি সুযোগ (যা ভারতীয় ক্রিকেটার ভিনু মানকাড়ের নামানুসারে ‘ম্যানকাডিং’ নামে পরিচিত) ক্রিকেটের স্পিরিটে অনৈতিক ও অখেলোয়াড়সুলভ হিসাবে বিবেচিত হয়। ঠিক তেমনি, ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১০২(১) ধারায় ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের সঞ্চয়ের সুদের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর বসানোর আইনি সুযোগ থাকলেও তা প্রান্তিক অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই কল্যাণকর নয়। ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ এবং ২০২১ সালের অর্থ আইনে এমআরএ সনদপ্রাপ্ত সংস্থার সার্ভিস চার্জ করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে, যার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো গ্রাহকদের এ সঞ্চয়। তাছাড়া ২০১০ সালের এমআরএ বিধিমালা অনুযায়ী আমানতের ওপর ন্যূনতম ৬ শতাংশ সুদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
সত্তরের দশকের আগে দেশের দরিদ্র মানুষ ঋণের জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল স্থানীয় মহাজনদের ওপর, যাদের সুদের হার ছিল বছরে একশ শতাংশের বেশি। ঋণ শোধ করতে গিয়ে ভিটেমাটি হারানোর পাশাপাশি বহু পরিবার তাদের সামাজিক মর্যাদাও হারাত। এ রূঢ় বাস্তবতার পটভূমিতেই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে এক নীরব বিপ্লবের সূচনা করেছিল। জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ প্রান্তিক মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতার চাবিকাঠি, যার প্রভাব নারীর জীবনে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী। পরিবারের একটি নারী যখন নিজের সন্তানের স্কুলে যাওয়া, নতুন পোশাক কেনা কিংবা বাড়তি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো সিদ্ধান্ত নিজে নেন, তখন বোঝা যায় ক্ষুদ্রঋণ কেবল আর্থিক লেনদেন নয়, এটি এক গভীর আচরণগত পরিবর্তনেরও মূল চালিকাশক্তি। অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র পরিসরের এ বিনিয়োগগুলোই সময়ের পরিক্রমায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে রূপ নেয়; ছোট ছোট প্রয়াসের তরঙ্গে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। এমআরএর নিয়মানুযায়ী ৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হলে মোট সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত এ ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা অত্যন্ত নগণ্য-মাত্র ০.০৬ শতাংশ মাত্র।
বলা বাহুল্য, ক্ষুদ্রঋণের এ গ্রাহকরা মূলত সমাজের গরিব ও প্রান্তিক মানুষ। প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ক্ষুদ্রঋণ সদস্যের প্রত্যেকের গড় সঞ্চয় ১৭ হাজার টাকারও কম, যারা বিপদের দিনের জন্য সপ্তাহে ৫০ বা ১০০ টাকা করে বিন্দু বিন্দু সঞ্চয় করেন। এদের বড় একটি অংশের আয় করমুক্ত সীমার অনেক নিচে অবস্থান করায় কর্তনকৃত কর সমন্বয় করার কোনো সুযোগ তাদের নেই। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কর আদায়ের মাধ্যমে সরকার এ অর্থ সংগ্রহ করতেই পারে, কিন্তু নীতিগতভাবে এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী হবে। যাদের সঞ্চয়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম, করের অতিরিক্ত বোঝা তাদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া-সমাজ ও রাষ্ট্রে এক ভুল বার্তা দেয়। এর ফলে প্রান্তিক গ্রাহকরা ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হবেন এবং আস্থা হারাতে শুরু করবেন। দেশের ৭২ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব না থাকায়, আনুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার সঙ্গে তাদের যুক্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান সেতু হলো এ ক্ষুদ্রঋণ খাত। সেই সেতুবন্ধ দুর্বল করা মানে কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, গোটা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
বর্তমান সরকার যেখানে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়ার উদ্যোগ সরকারের সামগ্রিক কল্যাণ দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর একা নির্ভর করে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি যখন মন্থর, শিল্প খাতে বিনিয়োগ যখন স্থবির এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি যখন মন্থর, তখন ক্ষুদ্রঋণ খাত নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এ খাত শুধু ঋণ বিতরণই করে না; এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উৎপাদন, সঞ্চয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে। দেশের বিস্তৃত গ্রামীণ নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী এবং তৃণমূলভিত্তিক অভিজ্ঞতাকে যথাযথ নীতিসহায়তা দেওয়া গেলে ক্ষুদ্রঋণ খাত ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং দারিদ্র্যবিমোচনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
পরিশেষে বলাই যায়, আইনগত বাধা না থাকলেও যেমন ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ রাখা যায় না, কিংবা আউট করার সুযোগ থাকলেও ক্রিকেটে ‘ম্যানকাডিং’ যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি কর আইনে বিধান থাকলেও ক্ষুদ্রঋণের গরিব গ্রাহকদের সঞ্চয়ের সুদে উৎসে কর কর্তন না করাই জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক।
তারিক সাইদ হারুন : ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞ
