গরিবের সঞ্চয়ে করারোপ : বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শঙ্কা
Advertisement
ফেরদৌস সালাম
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের জনগণ নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে। এই সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। তারেক রহমানের সরকার যখন দেশের গরিব, হতদরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষের কাছে আর্থসামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করছে, ঠিক তখনই কিছু কার্যক্রম এই অর্জনকে ম্লান করে দিতে চলেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘গরিবের সঞ্চয়ের ওপর করারোপ’।
মূলত দেশে ৬৪টি তফসিলি ব্যাংক থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো তৃণমূল পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে পারছে না। দেশে লোকসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি, যাদের শতকরা ৮০ ভাগ এখনও গ্রামেই বসবাস করেন। আবার এদের মধ্যে এখনো প্রায় ২২.৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ও অতি দারিদ্র্যের শিকার। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ ভাগ লোক এখনো কোনো ব্যাংক হিসাব খোলেননি বা হিসাব খোলার উপযুক্ত হয়নি বা সুযোগ পাননি। আর বাকি ৬০ ভাগ লোকের মধ্যেও ১০ টাকার হিসাবধারীরা না থাকলে ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের সংখ্যা দাঁড়াবে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ভাগ। ব্যাংকগুলো যেহেতু বাণিজ্যিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, সেক্ষেত্রে বেছে বেছে মূল্যবান (বিত্তবান) গ্রাহকদের হিসাব খুলে থাকে, যাদের আর্থিক লেনদেন করার মতো অধিক অর্থ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে দরিদ্র মানুষ তো দূরের কথা, সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও হিসাব খোলার সুযোগ নেই। আর গ্রাম পর্যায়ে তাদের কোনো শাখাও নেই।
এ অবস্থায় গ্রামীণ জনপদের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষের কাছে এনজিওরাই হচ্ছে তাদের ব্যাংক অর্থাৎ গরিবের ব্যাংক। গ্রামের নারীরা খুব গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করে-আশা ব্যাংক, বুরো ব্যাংক, টিএমএসএস ব্যাংক এবং ব্র্যাক এনজিওর শাখাকেই তারা ব্যাংক বলে থাকে। কারণ, তারা তাদের ক্ষুদ্র সঞ্চয় ৫ টাকা, ১০ টাকাও এসব এনজিওতে তাদের হিসাবে জমা রাখার সুযোগ পায়। এই বিষয়টি দেশের আর্থসামাজিক খাতে এক নীরব বিপ্লব বয়ে এনেছে। গ্রামের মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় এখন এমএফআইগুলোর হিসাবে জমা হওয়ার সুবাদে জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। উন্নত বিশ্ব বাদই দিলাম, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাংকিং সঞ্চয়ী সংখ্যার হার অতি সামান্য, যার হার ৮ শতাংশ এরও নিচে ছিল। সেক্ষেত্রে এনজিও/ এমএফআইদের
(মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন) কল্যাণে সঞ্চয়ী মানুষের হিসাবের সংখ্যার হার এখন ৪০ শতাংশের ওপরে। কারণ, দেশের ৪ কোটিরও অধিক মানুষ এনজিও/এমএফআইদের সদস্য। তারা যেমন এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিচ্ছেন, তেমনি ক্ষুদ্র সঞ্চয়ও রাখছেন।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) এর তথ্যসূত্রে জানা যায়, দেশে কয়েক হাজার এনজিও থাকলেও সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ৬৩৩টি-যাদের সদস্য সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ। বর্তমানে তাদের সঞ্চয় স্থিতি রয়েছে ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয় অনুযায়ী সুদের হার ৬ থেকে ১২ শতাংশ। তারপরও মোট সঞ্চয়কে সদস্য সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে গড়ে জনপ্রতি সঞ্চয় দাঁড়ায় ২০ হাজার ২৩৭ টাকা। এ টাকার বার্ষিক সুদ দাঁড়ায় ১ হাজার ২১৪ টাকা থেকে ২ হাজার ৪২৮ টাকা। এর ওপর ১০ শতাশ কর দিলে ১২১ টাকা থেকে ২৪২ টাকা কাটা যাবে। এতে করে সঞ্চয়ের মুনাফা থেকে ১০ শতাংশ কাটা হলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪ কোটি ৭৩ লাখ গরিব মানুষের সঞ্চয়ের মুনাফা থেকে ৫০০ কোটি টাকা কাটা হলে রাষ্ট্রের এত মানুষের মধ্যে সরকার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা জন্ম নেয়াটাই স্বাভাবিক।
একটি কথা ভাবলে অবাক হতে হয় যে, এ দেশে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাত স্থবিরতার শিকার। ব্যাংকিং খাত যেখানে দেশের সার্বিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হওয়ার কথা, সেটি এ দেশে বরং বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাত নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের শিকার হয়ে অনেকটাই পর্যুদস্ত। অনেক ব্যাংকের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ গ্রাহকদের জমা করা অর্থও ফেরত দিতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।
সেক্ষেত্রে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এনজিও/এমএফআই সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হচ্ছে।। আজকের বাংলাদেশ যে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে তার পেছনে ক্ষুদ্র অর্থায়নের ভূমিকা ব্যাপক। বলতে গেলে ব্যাংকিং খাত যেখানে স্থবিরতার পর্যায়ে, সেখানে দেশের বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিই হচ্ছে এমএফআই। এ খাত বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি টাকার সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে, আর এর আদায় হার প্রায় ৯৭ শতাংশ। এর ফলে দেশের প্রায় ৪ কোটিরও অধিক দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা, কৃষিজাত প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
আরেকটি বিষয় ভাবা দরকার এনজিও/এমএফআই এর পরিচালনাকারীরা কেউ এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক নন এবং এসব প্রতিষ্ঠানের লাভ তাদের পকেটস্থ হয় না। প্রতিষ্ঠানের যা কিছু অর্জন সবই দরিদ্র ও হতদরিদ্র সদস্যদের অর্থাৎ গরিব জনগোষ্ঠীর নানামুখী উন্নয়নেই ব্যয় হয়ে থাকে। দেশের নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মুহূর্তেও এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
পরিশেষে বলব, সরকারের তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন কার্যক্রমকে বিশেষ করে দারিদ্র্য নিরসন কার্যক্রমসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রয়োজনেই এনজিও/এমএফআই সেক্টরকে গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। যেখানে বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন, সেখানে এমন কোনো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনো ক্রমেই ঠিক হবে না, যাতে দেশের গরিব জনগোষ্ঠী সঞ্চয় বিমুখ হয় এবং ক্রমান্বয়ে আরও হতদরিদ্র হয়ে পড়ে।
ফেরদৌস সালাম : সিনিয়র সাংবাদিক ও ক্ষুদ্রঋণ গবেষক
