বাইফোকাল লেন্স
ক্ষমতা বদলায়, ক্ষমতার সংস্কৃতি কি বদলায়
Advertisement
একেএম শামসুদ্দিন
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা বারবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহণ, বাজার, ভূমি এবং স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোয় নতুন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব বাড়ে। আগের পক্ষের কিছু মানুষ বাদ পড়ে, নতুন পক্ষের কিছু মানুষ জায়গা করে নেয়; কিন্তু কাঠামোটি প্রায় একই থাকে। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে-আমরা কি কেবল ক্ষমতার মালিক পরিবর্তন করছি, নাকি ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতিও পরিবর্তন করছি?
রাজনৈতিক পরিচয় যদি থানায় কল করার ক্ষমতা দেয়, ভূমি দখলের নিরাপত্তা দেয়, টেন্ডার পাওয়ার সুবিধা দেয়, বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয় কিংবা অপরাধের পর আইনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রযন্ত্রে কারা এখনো সক্রিয়?’
একটি সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতারও বড় পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের সবকিছু কি সত্যিই বদলেছে? নাকি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর কিছু অংশ নতুন পরিচয়, নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় এবং নতুন সুবিধাভোগীর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে এখনো সক্রিয়? এ প্রশ্নটি এখন আর নিছক রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়। কারণ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ছিনতাই, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন ঘটনায়ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু একটি দলের নয়; বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে ক্ষমতার সুবিধাভোগ করার একটি সংস্কৃতি চলতে থাকবে?
একটি কথা মনে রাখতে হবে, অপরাধ বাড়লে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা যে হারে বেড়েছে, তা দেশের নাগরিকের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, প্রকাশ্যে গুলি, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় অপরাধের সংখ্যা যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি হলো অপরাধের প্রতি সামাজিক সহনশীলতা তৈরি হওয়া। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে, ‘অভিযোগ করে লাভ নেই’, ‘ওর রাজনৈতিক লোক আছে’, ‘পুলিশ কিছু করবে না’, ‘মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না’; তখন আইনের প্রতি নাগরিকের আস্থার ঘাটতি বেড়ে যায়। আর আইনকে পাশ কাটিয়ে যখন কিছু মানুষ নিজেরাই বিচার করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি হত্যা ও ধর্ষণের পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ২,৩৩২টি হত্যা এবং ৪,৪০২টি ধর্ষণের ঘটনা ‘নথিভুক্ত’ হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯,৩৪৭টি। বেসরকারি সংস্থার পরিসংখানে জানা গেছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৩৪১ জন নারী ও কিশোরীকে হত্যা হয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত এবং ৯৭০ জন আহত হয়েছে।’ মব সহিংসতা’য় মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সাধারণ অপরাধ বলেই মনে হতে পারে; কিন্তু যখন একই সময়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আইন অমান্য করার প্রবণতা, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া এবং অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতার যোগাযোগের অভিযোগ দেখা যায়, তখন বিষয়টি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা থাকে না; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এ পরিস্থিতি কি একদিনেই তৈরি হয়েছে এবং এর দায়ভারই বা কার?
প্রথম দায় অবশ্যই রাষ্ট্রের। নাগরিকের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কোনো এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব বা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও যদি অপরাধীরা দীর্ঘদিন আইনের আওতার বাইরে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে। আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়; আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা।
দায় রয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কোনো দলের নেতাকর্মী যদি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল কিংবা প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তাহলে তার দায় শুধু ব্যক্তির নয়; সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনেরও। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট করতে হবে, দলের পরিচয় অপরাধের ঢাল হতে পারে না।
এর দায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও পড়ে। পুলিশ বা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে অপরাধী উৎসাহিত হয়। একইভাবে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি এবং প্রভাবশালী অপরাধীর প্রতি নমনীয়তা, দুটিই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। ফলে বদলি-পদোন্নতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সিদ্ধান্তের জন্যও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
দায় রয়েছে অপরাধীচক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের। চাঁদাবাজি বা দখলদারি কখনো একক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ, স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগ ওঠে। তাই শুধু দৃশ্যমান অপরাধীকে গ্রেফতার না করে তার পেছনের অর্থ ও যোগাযোগের নেটওয়ার্কও অনুসন্ধান করা জরুরি।
তবে সমাজের সচেতন নাগরিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল ব্যক্তিরাও সম্পূর্ণ দায়মুক্ত নয়। নাগরিক সমাজের নীরবতা, রাজনৈতিক অন্ধ আনুগত্য, অপরাধকে দলীয় পরিচয়ে বিচার করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন গুজব ছড়ানো এ পরিস্থিতিকে আরও গভীর করে তোলে। একজন অপরাধী নিজের পরিচয়কে রাজনৈতিক ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে পারে তখনই, যখন সমাজের একটি অংশ তাকে সেই সুযোগ করে দেয়। সবশেষে রয়েছে পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়। মূল্যবোধ, নৈতিকতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান; এসব কেবল আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই এর ভিত্তি তৈরি হয়। অতএব, বাংলাদেশের বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্য একক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। দায় বহুস্তরীয়।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রশাসন; কিন্তু প্রশাসন যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কৃতিও বদলায় না; শুধু আনুগত্যের কেন্দ্র বদলায়। সাম্প্রতিক সময়ে টিআইবির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও স্বাধীন করার পরিবর্তে রাজনৈতিকীকরণের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এবং অভিযোগটি সত্য কিনা, তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই প্রয়োজন। কারণ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা যদি মনে করেন তার পদোন্নতি, বদলি কিংবা চাকরির নিরাপত্তা পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাহলে তিনি জনগণের কাছে নয়, ক্ষমতাবানদের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়বেন। এমন প্রবণতা আমরা শেখ হাসিনার শাসনামলেও দেখেছি। এটি রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর।
এখন প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, জবাবদিহির সংস্কৃতি। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের প্রমাণ হবে বিচারের ভিত্তি; প্রশাসনের আনুগত্য নয়, পেশাগত দক্ষতা হবে মূল্যায়নের মানদণ্ড; আর নাগরিকের নীরবতা নয়, আইনসম্মত প্রতিবাদ হবে সামাজিক দায়িত্বের প্রকাশ।
এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। তাই এটি থেকে বের হতেও সময় লাগবে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে, রাজনৈতিক দলগুলোও যদি নিজেদের অপরাধী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং নাগরিক সমাজ নীরব দর্শকের ভূমিকা থেকে যদি বেরিয়ে আসে, তাহলে এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক
