Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

প্রত্যাশা ছিল অনেক, প্রাপ্তিও কম নয়

Advertisement

Icon

সাকিব আনোয়ার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্যাশা ছিল অনেক, প্রাপ্তিও কম নয়

Advertisement

ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ইতিহাসের এক নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে শেষ হয় সাড়ে ১৫ বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের। এ আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল, গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম এবং স্বপ্ন ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার-যেখানে নিশ্চিত হবে জনগণের সব নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সুশাসন।

আবার জুলাই পেরিয়ে আগস্ট এসেছে। চোখের পলকেই পেরিয়ে গেছে একটি বছর। লিখতে বসে মনে হচ্ছে, এই তো সেদিন এই টেবিলে বসে থাকা অবস্থায়ই বাসায় র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা আর ডিবির নজরদারি শুরু হলো। কল আসতে শুরু করল র‌্যাবের মিডিয়া উইং পরিচয়ে। সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস ফেলে বেরিয়ে পড়লাম পেছনের রাস্তা দিয়ে। ২৪-এর সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দল এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এ সরকার হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল। কিন্তু আন্দোলনকে ‘মেটিক্যুলাস ডিজাইন’ হিসাবে তুলে ধরে জনগণের বাস্তব ভূমিকা অস্বীকার করা হয়। অভ্যুত্থানের একক নেতৃত্ব ও কৃতিত্ব নির্দিষ্ট করতে গিয়ে গণ-আন্দোলনের বহুমাত্রিকতা সংকুচিত করে ফেলার চেষ্টা হয় সচেতনভাবেই। আন্দোলনের সময় কেউ দেখেনি তার পাশের লোকটা কে? তার রাজনৈতিক পরিচয় কী? তার সামাজিক অবস্থান কী? লিঙ্গ কী, ধর্ম কী? সে গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গ করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে এবং পাশের লোকটার সঙ্গে এক হয়ে গেছে। সে মুহূর্তটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। সেই মানুষে মানুষে মিশে যাওয়া, রক্তে রক্তে মিলে যাওয়া-সে সময়টা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। সেখান থেকেই প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে ফারাকের শুরু; বছর শেষে যা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ওপর আমাদের প্রত্যাশা এত বেশি যে, এক বছর পর ওটাই মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ এ অভ্যুত্থানকে বিপ্লব বলার চেষ্টা করছিলেন। প্রথম সংকট ছিল আন্দোলনের অংশীজনের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা আর দ্বিতীয় সংকট হলো, এ অভ্যুত্থানকে জোর করে বিপ্লব হিসাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কারণ, বিপ্লবের কাছে আমাদের চাওয়া, আমাদের প্রত্যাশা অনেক বড় থাকে। বিপ্লবের পর সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে বহু ক্ষেত্রে খোলনলচেই পালটে যায়। কিন্তু আমরা যদি একে গণ-অভ্যুত্থান হিসাবেই গ্রহণ করতাম, সেক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা কম, কিন্তু সুনির্দিষ্ট থাকত। গণ-অভ্যুত্থানের কাছ থেকে যতটুকু অর্জন করা সম্ভব, আমরা অন্তত অতটুকু অর্জন করতে পারতাম। কেউ কেউ বিপ্লবী সরকার গঠন করতে না পারা, সংবিধান ছুড়ে ফেলে দিতে না পারার ব্যর্থতার কথা বলেন। বাস্তবতা হলো, অভ্যুত্থানের সরকারের ওপরে বিপ্লবের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার কারণে একটা শক্তিশালী সরকারই গঠন করা যায়নি। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের কাছ থেকে আমাদের যতটুকু প্রাপ্তি সম্ভব ছিল, ততটুকু পাইনি।

আমরা যখন সংস্কারের আলোচনায় প্রবেশ করলাম, তখন কেউ কেউ অনেক কিছু একসঙ্গে করে ফেলতে চাইল আর আরেক পক্ষ সেই লক্ষ্যকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করল। সংস্কার প্রশ্নেও দলীয় এজেন্ডা সামনে নিয়ে আসা হলো। সংস্কার এবং নির্বাচনকে পরস্পরবিরোধী এবং পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। এমনকি প্রায় দুই মাস চলা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় দফার সংলাপে অংশ নেওয়া অনেক দলও আলোচনা চলমান অবস্থায় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ থেকে এ সংলাপ থেকে গৃহীত সনদে স্বাক্ষর না করার হুঁশিয়ারি দেয়। কিছু দল এখন বলছে, সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতি ছাড়া তারা অংশ নেবে না। অথচ প্রায় ৬ মাস আগে ঐকমত্য কমিশন কাজ শুরু করার পর থেকে প্রথম পর্বে এমনকি দ্বিতীয় পর্বের সংলাপ শুরুর পরও এ আলোচনা তারা সামনে আনেননি। তারও আগে যখন ১১টি কমিশন গঠিত হয় এবং রিপোর্ট প্রদান করে, তখনো এ ধরনের দাবির প্রসঙ্গ সামনে আসেনি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ যখনই সফলতার মুখ দেখতে শুরুর করল এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ঐতিহাসিক জাতীয় সনদের দিকে আমরা অগ্রসর হতে শুরু করলাম, কেউ কেউ ঠিক তখনই এসব বিষয় সামনে আনতে শুরু করল। সংস্কার, বিচার বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক না হলে নির্বাচনে যাব না-এসব দাবি রাজনৈতিক চাপের এজেন্ডা হলে ঠিক আছে; কিন্তু এসব দাবি তুলে কি নির্বাচন আটকে দেওয়া হচ্ছে? এ কথা বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট তথ্য ও যুক্তি আছে যে, জুলাই অভ্যুত্থানপরবর্তী বাংলাদেশকে যে পক্ষ অস্থিতিশীল করে রাখার চেষ্টা করেছে, তারাই এখন নানা যুক্তিতে নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ তো নির্বাচনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠন আবশ্যিক ছিল। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তাকে ছাড়া সম্ভব হতো না। সরকারের দুর্বলতা রয়েছে। শুধু দুর্বলতা নয়, সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ পক্ষপাত দেখিয়েছে। একশর বেশি মাজার ভাঙা হয়েছে, বিভিন্ন ইস্যুতে নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছেন, নাটক বন্ধ করা হয়েছে, বাউলগান বন্ধ করা হয়েছে, একজন নারী কীভাবে ওড়না পরবেন বা সিগারেট খাবেন কি না, সেটি নিয়েও কথা হয়েছে। এ ক্ষেত্রগুলোয় সরকার খুব একটা শক্ত অবস্থান নেয়নি। মনে হয়েছে, সরকারের মধ্যে কারও কারও এ নিয়ে এজেন্ডা আছে। তারা হয়তো চেয়েছেন, মাঠের একটি বড় শক্তি হিসাবে দক্ষিণপন্থি এ গোষ্ঠীকে প্রতিষ্ঠিত করতে। জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছে যাদের প্রতি সরকারের পক্ষপাত এখন এতটাই প্রকাশ্য যে, কেউ আর এ বিষয়কে অস্বাভাবিক মনে করছে না। এ অংশ থেকেই সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা, তাদের এপিএস, পিও এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সেক্টরে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে এখন দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠে আসছে, কারও কারও বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থানের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এ বিশেষ অংশের দখলে চলে গেছে। এ প্ল্যাটফর্ম এবং এখান থেকে সৃষ্ট কমিটি এবং দল দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বলা বাহুল্য, দেশের প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য রাজনৈতিক দল এমনকি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলও দুর্নীতি, দখলদারিতে মোটামুটি প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এ আন্দোলন নিয়ে দুই হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। স্বৈরাচারী শাসনামলের মতোই এ মামলাগুলো নিয়েও বাণিজ্য হয়েছে, হচ্ছে। এ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় দেড় হাজার মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে। অথচ এক বছরে বিচারিক প্রক্রিয়ার তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন, তারা এখনো মাঝেমধ্যে সুচিকিৎসার জন্য রাস্তায় নামছেন। যারা ক্ষমতায় গেলেন, তারা এ মানুষগুলোর খোঁজ রাখেননি; এ মানুষগুলোর কাছে যাননি। ফাউন্ডেশন হয়েছে; কেউ কেউ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার কৃতিত্ব নিয়ে সেই ফাউন্ডেশন চালিয়েছেন। যারা নিজেদের আন্দোলনের নেতা বলে দাবি করেন, তারা তাদের রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত এবং আহত ব্যক্তিদের যতটা সম্ভব নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছেন প্রয়োজনমতো।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে লিখতে বসেছিলাম। হয়তো হতাশার কথা বেশি বলা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, আমরা সেই ভয়ংকর সময় অর্থাৎ শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামল থেকে মুক্তি পেয়েছি। তাই প্রত্যাশার চাপ অনেক বেশি; সেটা সরকারের ওপর যেমন, তেমনই রাজনৈতিক দলের ওপরও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি, বিরোধী মত দমনের নানা পুরোনো কৌশল এবং আইন এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এটাও ঠিক, অনেক কিছু আমরা অর্জন করেছি এই এক বছরে। প্রায় দুই মাস সব রাজনৈতিক দল একত্রে বসে কোনো ধরনের উত্তেজনা ছাড়াই অর্থবহ সংলাপ শেষ করতে পেরেছি। পাশাপাশি সমাবেশ চলছে কোনো অস্থিরতা ছাড়াই। রাস্তার দুপাশে পরস্পরবিরোধী স্লোগানে মিছিল হচ্ছে। কিন্তু কেউ শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করছে না, কেউ কারও ওপর হামলা করছে না। এ রাজনৈতিক সংস্কৃতিই তো আমরা চেয়েছিলাম। এবার প্রয়োজন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণ। প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। তবে পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন, তাদের মনে রাখতে হবে-জুলাই অভ্যুত্থান শুধু সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের লড়াই।

সাকিব আনোয়ার : রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

হালফিল বয়ান পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সর্বজনীন

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

ইউরোপের আন্দোলন : আবারও সেই ইসলামভীতি!

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম