Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ইন্ডিয়ান হেজিমনি : ভূতের ভয়ের দিন শেষ

Icon

গৌতম দাস

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইন্ডিয়ান হেজিমনি : ভূতের ভয়ের দিন শেষ

বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় আধিপত্যের দিন আর নেই। ছবি: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।

Advertisement

বোমা ফেটেছে! কিন্তু তবু হুঁশ নাই!

শত প্রমাণ দিলেও বিশ্বাস করেনি একদল লোক/রাজনীতিবিদ যে, বাংলাদেশের ওপর ভারতীয় আধিপত্যের দিন আর নেই, সেসব নেই হয়ে গেছে এবং ট্রাম্পের আমেরিকা ভারতকে বরকন্দাজ রেখে ও থাকার জন্য ট্যাক্স দিয়ে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের কারবার আর করবে না, ছেড়ে দিয়েছে। কখন থেকে? এক. হাসিনার উৎখাত আর দুই. ট্রাম্পের নয়া শুল্কনীতি প্লাস অন্যান্য কিছু নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকে অন্তত!

কিছু পরগাছা পোকা আছে, যেগুলোকে ‘এটুলি’ বলে আঞ্চলিকভাবে। এরা পশুর গায়ে লেগে থাকে, সহজে খসে বা ঝরে যায় না, লেগেই থাকে আর রক্ত চুষতে থাকে। ‘ভারতীয় প্রভাব বাংলাদেশের ওপর আছেই, ফলে ভারতকে তেল মেরে চলতে হবে’-এমন মনের ওপর এটুলি হয়ে লেগে থাকা রাজনীতিবিদের সংখ্যা কিন্তু কম নয় এখানে। শীর্ষ পর্যায়েও আছে। আর ওদিকে ঠিক একইভাবে-আমি এখনো রাজা আছি, বাংলাদেশের ওপরে এভাব ছড়িয়ে বসে থাকা ব্যক্তিটা ছিল নরেন্দ্র মোদি। ট্রাম্পের নির্বাচনের আগে থেকেই মোদি এবং সঙ্গে হাসিনাও বিরাট আশা নিয়ে ট্রাম্পের জেতা দেখতে বসেছিলেন যে, এবার তাদের আকাঙ্ক্ষী বরপুত্র ট্রাম্প জিতে আসছেন। উনি এলেই মোদি বাংলাদেশের ওপর হারানো সাম্রাজ্য বা আধিপত্য ফিরে পাবেন; ফলে ইউনূসকে দেখিয়ে দেবেন, উপড়ে ফেলবেন ইত্যাদি।

এ আওয়াজ এতই তীব্র ছিল, হাসিনা ও তার চোরা অনুসারীদের মনোবল বাড়াতে একই সুরে গান ধরেছিলেন যে, ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে পরে লীগ ও হাসিনা গংদের ভাগ্য আবার খুলবে। তারা বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে আসবে!

কিন্তু হায় দিন আর কাটে না, আকাঙ্ক্ষাও সত্য হয় না। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর আমাদের এ অঞ্চল থেকে ট্রাম্পের প্রথম ভিজিটর হন মোদি, তিনি আর ধৈর্য রাখতে পারছিলেন না। কিন্তু ফলাফলে ভারতের সব স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে পড়া শুরু হয়ে যায়। মোদি তবু বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, এ ভেঙে পড়া দেখেও। ততধিক দুরবস্থা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের এমনকি তাতে লীগ/হাসিনারও!

সবশেষ একেবারে মুখে মারা বোমা :

সবশেষে ট্রাম্প নিজ ফয়সালা ঘোষণা করে দেন, আমেরিকায় ভারতীয় রপ্তানির ওপর ধার্য শুল্ক হবে ৫০ শতাংশ। এ হলো সেই মুখে মারা বোমা!

কারণ এবার আর ট্রাম্পের আমেরিকার ভারতের প্রতি নীতি-মনোভাব আর মোদি থেকে লুকিয় রাখার পথে থাকলেন না, মোদি সবটাই হারালেন। ট্রাম্পেরও সব উদাম হয়ে গেল!

২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট (সন্তান) জর্জ বুশ কংগ্রেসের আমলে ভারত সফরে এসেছিলেন। গত শতকের ষাটের দশকের পর কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেই প্রথম এসেছিলেন ভারতে। আর সেই থেকে শুরু হয় ভারতীয় রুস্তমি, বাংলাদেশের ওপর চোটপাট আর আধিপত্য নিয়ে জেঁকে বসবার খায়েস ও তৎপরতা!-‘মুই কী হনু রে!’ ‘চিনস আমারে!’-টাইপের হম্বিতম্বি!

পরে এসবের হাত ধরে আমাদের ওপরে এসেছিল কুখ্যাত ১/১১! ফলে আরও রুস্তমি ভারত-রাজ কায়েম করে ছেয়ে ফেলা! আর তা একেবারে বাংলাদেশের সেনাসদরে বসে অফিস খুলে বসা পর্যন্ত! আর কী লাগে?

আর এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দল কে ছিল বা কী হয়েছিল অর্থে, সেটা ছিল বিএনপি আর সেই সঙ্গে ততধিক খারাপ অবস্থায় ঝড় বয়ে যাওয়া জামায়াত-এ দুই দল! সাধারণভাবে অবশ্য ইসলামি দল মাত্রই!

অথচ সেই বাংলাদেশের সেনাসদরে জেঁকে বসা ভারতীয় ‘র’ ও বসানোর কারিগর হাসিনা সমূলে উৎখাত হয়ে গেল ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে। কিন্তু তবুও অনেকে ভক্তিভরে ভারতকে সালাম করছে, মোদির কোলেই আশ্রয় খুঁজছে! কেন?

একেবারে মূল কারণ পড়াশোনা না করা রাজনীতিবিদ এরা :

একালের মানে চলতি শতকের শুরু থেকেই দুনিয়া আর আগের মতো নেই। বৈশ্বিক রাজনীতি আর বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন মোচড় নিয়েছে। আসলে সেখানে মূল নিয়ামক হলো বৈশ্বিক অর্থনীতি আর তা থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও সঙ্গে এর সব পুরোনো নিয়মকানুনও! আর এদিকটা বুঝতে গেলে এবার পড়াশোনা লাগবেই! এক কথায় বললে, পড়াশোনা না করা রাজনীতিবিদ এ চলতি শতকে একেবারেই অচল হবে! এমনকি শুরু রাজনীতিবিদই নয়, নিজেকে বড় মনে করা সব একাদেমিশিয়ান/অধ্যাপকও অচল হবে!

শুধু তাই নয়; অবস্থা এখন এরকম যে, কট্টর চীনবিরোধিতা দেখিয়ে চলা খোদ মোদিই এখন চীনের কোলে উঠে বসেছে! এত কিছুর পরও কারও যদি হুঁশ না আসে, তবে বুঝতে হবে আসলে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কী করার আছে কী করতে হবে কিছুই বুঝছে না! এমন অবস্থায়! তাহলে রাজনীতিক পড়াশোনা বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইছি?

এর সোজা মানে হলো, সরাসরি সিটিং চীন ও আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নীতি-পলিসি খুঁটিয়ে পড়ার যোগ্যতা। যাতে এর প্রভাব বাংলাদেশের ওপর কেমন হবে, তা আন্দাজ করতে হবেই। এটা লাগবেই, এছাড়া নেতৃত্ব অচল হবেই! নেতা নিজে না পারলে অসুবিধা নেই, যোগ্য-দক্ষ লোক ভাড়া করেন! নিজের মফস্বলী আন্দাজ দিয়ে পথচলার দিন শেষ হয়েছে! একথা আমি নিজে অনেক বড় বড় টপ নেতাকে বলেছিও! মনে হয় না তাদের গায়ে লেগেছে বা ন্যূনতম কিছু বুঝেছেন! আসলে কী আমল করেছেন, তা তাদের তৎপরতা দেখেই বোঝা যায়!

মূলকথাটা হলো, এটা নিজেই বুঝতে হবে! দু-একটা মাথুর টাইপের বড় ‘র’র এজেন্ট ধরা বা খাতির রেখে কোনোই কাজ হবে না।

আচ্ছা ‘র’-এর কথা থাক! খোদ মোদির অবস্থাই দেখেন।

এবার ট্রাম্প যখন অতিরিক্ত শুল্কারোপের নীতি নিয়ে মোদির সঙ্গে কথা চলেছে বা তুলেছেন, তখন মোদির ব্লান্ডার বা মস্ত আকামটা লক্ষ্য করেন!

মোদি ছুটে গেলেন রাশিয়ার পুতিনের কাছে। অজিত দোভালকে পাঠালেন। আর তাতে পুতিন একটা বিবৃতি দিলেন মোদির পক্ষে আর ট্রাম্পের বিপক্ষে! বোকা মোদি হাততালি দিয়ে উঠলেন! পুতিন বলেছিলেন, কোন দেশ কার থেকে বা অন্য কোনো দেশের মালামাল বাণিজ্যে শামিল থেকে কত মালামাল আমদানি-রপ্তানি করবে, সেটা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত! এখানে ট্রাম্প অন্য রাষ্ট্রকে ফাঁদে ফেলে জোর খাটিয়ে কেনাবেচা করতে বাধ্য করতে পারে না। মানে পুতিন বলতে ছিলেন, ভারতের রাশিয়ার ওপর আমেরিকার অবরোধে ভেঙে সস্তার তেল কেনাটা জায়েজ ছিল।

আর তাতে কী হলো, ভারতের সস্তায় তেল কিনে তা আবার শোধন করে রপ্তানি করার কথাটা সারফেসে আলোচনার টেবিলে উঠে এলো! আর তাতেই ট্রাম্প এবার রাশিয়ান তেল কেনার অভিযোগে মোদির ওপর বাড়তি শুল্ক ৫০ শতাংশে নিয়ে ঠেকিয়ে দিলেন!

এখন বৈশ্বিক আইনগত দিক থেকে দেখলে ভারত অবশ্যই স্বাধীন, সে কোন দেশ থেকে কী আমদানি-রপ্তানি করবে। কেউ চাপ দিলে সে অন্যদিকে মানে অন্য দেশের দিকে যেদিকে সুবিধা চলে যাবে! কিন্তু সঙ্গে বিপরীত কথাটাও আছে। আমেরিকান ট্রাম্প তিনিও তো স্বাধীন-কোন দেশের ওপর কী শুল্ক ধরবেন এ ব্যাপারে! অর্থাৎ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি রাজনৈতিক অধিকারের কথা তুলে এর কোনো ফয়সালা নেই, হবে না।

কিন্তু এতে নিট যেটা পরিণতি হবে সেটা হলো, অন্তত ১৯৮০ সাল গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক/বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বেই! এতে আমার বা যারা বোঝে, তাদের কোনোই সন্দেহ নেই। অর্থাৎ ট্রাম্পের এ বিশেষ বাড়তি যথেচ্ছাচার শুল্কনীতি-এটি বর্তমান আমেরিকান নেতৃত্বের চলমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকেই ভেঙে অচল করে দেবে। যার সোজা মানেটা হলো, এর বিকল্প হিসাবে চীনা নেতৃত্ব বা প্রভাবের বিকল্প একটা বাণিজ্য ব্যবস্থা জায়গা করে নেওয়ার পথটাই গোঁয়ার ট্রাম্প করে দিচ্ছেন! আর এতে আমেরিকা ছাড়া বাকি দুনিয়া মানে মুখ্যত ‘গ্লোবাল সাউথ’ আর ইইউ-এর সমর্থন সেদিকেই ক্রমশই সবল হয়ে হাঁটবেই! মূল কারণ, একালে এখন এসে প্রতিটি রাষ্ট্রই একমাত্র টিকে থাকতে পারে ব্যাপক অবাধ আমদানি-রপ্তানি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য করেই! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কিছু এক্সপেরিমেন্টের পরে (আইএমএফভিত্তিক) ১৯৮০ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে যে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেটাই এখন চীনের নেতৃত্বে (ঢেলে সাজানো আইএমএফের জায়গায় ব্রিকসের আইডিয়ায়) পুনর্গঠিত হতে শুরু করবেই ক্রমশ!

কিন্তু আমাদের মূল প্রসঙ্গ এটি নয়। মূল প্রসঙ্গ হলো, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব (সঙ্গে একাদেমিশিয়ানেরা) কী এরপরও ভারতীয় আধিপত্য যে আগের মতোই আছে, এ জুজুর ভয়ে ইন্ডিয়া-লেপ্টে থাকার পক্ষে বোকা বুঝ নিয়েই থাকবে? নাকি পরিষ্কার দেখতে পাবে যে, আমেরিকা-ইন্ডিয়ান কোনো ন্যূনতম বিশেষ খাতিরের সম্পর্কটাই নাই হয়ে গেছে! অন্তত নিকি হ্যালিবেরির করুণ আবেদনটা দেখেও তো তাদের বোঝা উচিত, নাকি? আর কতদিন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদের পড়াশোনা ছাড়া কথিত ইন্ডিয়ান হেজিমনির ভূতের ভয়ে পথ চলবে?

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

Advertisement

ভারত

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

দৃষ্টিপাত সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম