বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে ডিজিটাল মুদ্রা
Advertisement
ড. শাহ জে মিয়া
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও শিল্প খাতে প্রযুক্তির দুর্বলতা এবং এর ফলে উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত প্রকট। অনিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং নিম্নমানের আইটি অবকাঠামো এ চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, সাইবার অপরাধীরা সুইফট আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ২০১৩ সালে সোনালী ব্যাংকের ৪ কোটি টাকা চুরি করেছিল। এর চেয়েও বড় সাইবার আক্রমণ ঘটে ২০১৬ সালে, যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১,২৩২ কোটি টাকা ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হয়। উন্নত দেশ, যেমন : যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের আধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর তুলনায় আমাদের ব্যাংকের আইটি সিস্টেম অত্যন্ত ভঙ্গুর। ফলস্বরূপ সরকারি, বেসরকারি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং শিল্পকারখানার আইটি সিস্টেমগুলো ঘনঘন অকার্যকর হয়ে পড়ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকি।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইটি ব্যবস্থার দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীভূত ব্যাংকিং ব্যবস্থারও বেশকিছু উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের জন্য আমরা পুরোপুরি ব্যাংক ও সরকারের ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হলো, ব্যাংক চাইলেই যে কোনো অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারে বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে, অ্যাকসেস অস্বীকার করতে পারে বা উত্তোলন সীমা আরোপ করতে পারে। সরকার মুদ্রার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতির দিকে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে অনুন্নত অঞ্চলের মানুষের জন্য ব্যাংকিং পরিষেবাগুলোয় প্রবেশাধিকার সীমিত থাকে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ব্যাংক স্থানান্তর (সুইফট, ওয়্যার ট্রান্সফার) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েকদিন সময় নিতে পারে।
সব দেশেই ফিয়াট মুদ্রা তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যারা সীমাহীন অর্থ মুদ্রণ করতে পারে। এর কারণে আমরা দেখেছি দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দেশগুলো (যেমন: ভেনেজুয়েলা, জিম্বাবুয়ে) অতিমুদ্রাস্ফীতির মুখে পড়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে দেশগুলোকে অত্যন্ত দুর্বল করে দিয়েছে এবং জনগণ সীমাহীন ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমগুলো (ক্রেডিট কার্ড, পেপ্যাল) প্রতিটি লেনদেন ট্র্যাক করে, সরকার এবং করপোরেশনগুলো ব্যবহারকারীর ডেটা সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ব্যাংকের মতো মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করে, যারা দুর্নীতিগ্রস্ত বা অদক্ষ হতে পারে এবং সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো রেকর্ড ম্যানিপুলেট করতে বা আর্থিক লেনদেন লুকাতে পারে। আর্থিক ব্যবস্থা ধীর, ব্যয়বহুল, কেন্দ্রীভূত এবং মুদ্রাস্ফীতি, সেন্সরশিপ ও দুর্নীতির জন্য দুর্বল থাকে।
এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ব্লকচেইনের মতো উদ্ভাবনী প্রযুক্তিগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর উপযোগী সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রটিতে প্রযুক্তিকেন্দ্রিক উচ্চমানের নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। আমি মনে করি, আমাদের বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আইটি সিস্টেমকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যেন তা অর্থ পাচার রোধ, নিরাপদ আর্থিক লেনদেন নিশ্চিতকরণ, ব্যাংকিং খাতকে হ্যাকারদের হাত থেকে রক্ষা করা এবং দ্রুত, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী লেনদেনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারবে; যা সাধারণ মানুষ তার সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ থেকে শুরু করে বড় করপোরেশনসহ সব ধরনের ব্যবসার জন্য অপরিহার্য।
ডিজিটাল মুদ্রা এমন অর্থ, যা শুধু ইলেকট্রনিক রূপে বিদ্যমান এবং লেনদেন ও বাণিজ্যের জন্য কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই ব্যবহার করা যায়। এ ব্যবস্থা প্রচলিত নগদ অর্থের বিপরীতে একটি ডিজিটাল লেজার সিস্টেমে সংরক্ষিত হয়, যা দ্রুত ও সুরক্ষিত অর্থ স্থানান্তরকে সম্ভব করে তোলে। ডিজিটাল মুদ্রার প্রধানত তিনটি প্রকারভেদ রয়েছে : প্রথমত, ক্রিপ্টোকারেন্সি যেমন: বিটকয়েন বা ইথেরিয়াম, যা বিকেন্দ্রীভূত লেজার প্রযুক্তি (সাধারণত ব্লকচেইন) ব্যবহার করে পরিচালিত হয় এবং কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না। দ্বিতীয়ত, ভার্চুয়াল মুদ্রা, যা কোনো নির্দিষ্ট ভার্চুয়াল পরিবেশে (যেমন : গেমিং বা সামাজিক প্ল্যাটফর্মে) ব্যবহার করা হয় এবং তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা, যা একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা সরাসরি জারি ও নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এটি দেশের ফিয়াট মুদ্রার একটি ডিজিটাল সংস্করণ। এ প্রযুক্তিগত ভিন্নতা সত্ত্বেও সব ডিজিটাল মুদ্রার মূল লক্ষ্য হলো আধুনিক লেনদেনব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও সহজ করে তোলা।
ডিজিটাল মুদ্রা দ্রুত লেনদেনের সময় এবং কম খরচের মতো সুস্পষ্ট সুবিধা দিলেও এটি বেশকিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখে পড়ে। এক্ষেত্রে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি এবং উচ্চমূল্যের অস্থিরতা অন্যতম। এ হ্যাকিংয়ের ঝুঁকিগুলোর কারণে বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বা সিবিডিসি নিয়ে গবেষণা করছে। সিবিডিসি প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা উন্নত করা, আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সমাজের বৃহত্তর অংশকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় নিয়ে আসা। উদাহরণস্বরূপ, সিবিডিসির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সরাসরি ব্যাংকিং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে, যা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করবে। ডিজিটাল মুদ্রার ভবিষ্যৎ সম্ভবত স্টেবলকয়েনের মতো উদ্ভাবন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। স্টেবলকয়েন এমন ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা ডলার বা সোনার মতো একটি স্থিতিশীল সম্পদের সঙ্গে তাদের মূল্যমান ১:১ অনুপাতে ধরে রাখে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল মাধ্যম সরবরাহ করতে পারে।
ডিজিটাল মুদ্রার অন্যতম সুবিধা হলো, এটি আন্তঃসীমান্ত লেনদেনকে সহজ করে তোলে। এ মুদ্রাগুলো ব্যবহার করে লেনদেনগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এবং নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়। এর অর্থ হলো, যদি যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কোনো ব্যক্তি সিঙ্গাপুরের একটি পক্ষের সঙ্গে একই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকেন, তবে তিনি খুব সহজে ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই পেমেন্ট করতে পারবেন। ডিজিটাল মুদ্রার কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এগুলোকে প্রথাগত ফিয়াট মুদ্রা থেকে আলাদা করে। ডিজিটাল মুদ্রাগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত বা বিকেন্দ্রীভূত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কাগজের টাকা বা নোটের মতো প্রথাগত ফিয়াট মুদ্রাগুলো ব্যাংক এবং সরকারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে, ক্রিপ্টোকারেন্সি যেমন বিটকয়েন এবং ইথেরিয়াম একটি বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় কাজ করে, যেখানে কোনো একক সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ এটির নিয়ন্ত্রণ করে না। ডিজিটাল মুদ্রার এ মৌলিক প্রকৃতি এটিকে লেনদেনের একটি আধুনিক মাধ্যম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এখন ডিজিটাল মুদ্রার তিনটি প্রধান প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রধানত তিন ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা থাকলেও এর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি সবচেয়ে পরিচিত। ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো সেই ডিজিটাল মুদ্রা, যা একটি নেটওয়ার্কের মধ্যে লেনদেন সুরক্ষিত ও যাচাই করার জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে। ক্রিপ্টোগ্রাফি এ মুদ্রাগুলোর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণকেও পরিচালনা করে এবং বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বায়ত্তশাসন, যার মানে হলো এটির ওপর কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ বা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই; বিনিয়োগকারীরা সরাসরি একটি পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কে তাদের সম্পদ ধারণ করে। তবে এ ধরনের মুদ্রার নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিভিন্ন দেশের আইনগত বিচারব্যবস্থায় ভিন্ন হতে পারে এবং এটি সব দেশে সমানভাবে নিয়ন্ত্রিত নাও হতে পারে।
বর্তমান আধুনিক ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলে মনে করা হয়, কারণ এটি কোনো ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় কর্তৃক্ষের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তহবিল স্থানান্তরের জন্য একটি বিকেন্দ্রীভূত, সুরক্ষিত এবং সম্ভাব্য দ্রুত উপায় সরবরাহ করে। এটি কম ফি এবং আর্থিক পরিষেবাগুলোয় বৃহত্তর অ্যাকসেসযোগ্যতাসহ সীমানাহীন লেনদেনের অনুমতি দেয়, বিশেষ করে যারা ব্যাংকিং পরিষেবা পাননি বা সীমিত পরিষেবা পান, তাদের জন্য। এটি উচ্চ প্রতিদানের সম্ভাবনাসহ একটি বিকল্প বিনিয়োগ সম্পদ হিসাবেও ব্যবহৃত হতে পারে, যদিও এতে উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা রয়েছে।
যা হোক, ব্যাংকিং ও অর্থ খাতকে রূপান্তরের জন্য আমি একটি তিন ধাপের রোডম্যাপ প্রস্তাব করছি। প্রথম ধাপের রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও অর্থ খাতের ভিত্তি আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়তা নিশ্চিত করা। এর ধাপের পর্যায়ক্রমিক কাজগুলোর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের আধুনিকীকরণ; এক্ষেত্রে বিদ্যমান পুরোনো সিস্টেমগুলোকে ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামোতে স্থানান্তরিত করা হবে এবং দৈনন্দিন কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করতে এআই-চালিত কোর ব্যাংকিং সলিউশন চালু করা হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নতিসাধন করতে হবে। এটি অর্জনের জন্য দেশজুড়ে ডিজিটাল ওয়ালেট, কিউআর কোড এবং মোবাইল পেমেন্ট সিস্টেমের সমন্বয়ের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেনকে উৎসাহিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে ব্লকচেইনভিত্তিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক চালু করা হবে। অবকাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য সাইবার নিরাপত্তা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখতে এআইভিত্তিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং অ্যাকাউন্টের সুরক্ষার জন্য মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং বায়োমেট্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে। এ পদক্ষেপগুলো প্রথম ধাপে ব্যাংকিং খাতের একটি মজবুত ও সুরক্ষিত ডিজিটাল ভিত্তি স্থাপন করবে।
দ্বিতীয় ধাপে মনোযোগ দেওয়া হবে উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা এবং তথ্য বিশ্লেষণের ওপর। এ সময়কালে এআইচালিত ব্যক্তিগতকৃত ব্যাংকিং সুবিধা চালু করা হবে, যেখানে গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত আর্থিক পণ্য তৈরি করতে এআই ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা হবে এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যাংকিং প্রতিক্রিয়ার জন্য রোবো-অ্যাডভাইজার চালু করা হবে। ঋণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা আনতে স্মার্ট ঋণদান এবং ক্রেডিট স্কোরিং মডেল নিয়ে আসা হবে; এক্ষেত্রে এআইচালিত ক্রেডিট স্কোরিং মডেল চালু করা হবে এবং স্বচ্ছ স্বয়ংক্রিয় ঋণ বিতরণের জন্য ব্লচেইনভিত্তিক সমাধান চালু করা হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা হবে, যা নিয়ন্ত্রণমূলক সম্মতি এবং প্রতিবেদন তৈরিতেও সাহায্য করবে। এছাড়াও বাজারের প্রবণতা পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স টুলস ব্যবহার করা হবে। এ ধাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রসারিত করা, যার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সহজ, নিরাপদ এবং গ্রাহকসেবাকেন্দ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
তৃতীয় ধাপ হলো, একটি সম্পূর্ণ এআই এবং ব্লকচেইনভিত্তিক ফিনটেক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরের কাজ শুরু করা। এ স্তরে একটি ব্লকচেইনভিত্তিক আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হবে। কেওয়াইসি সম্মতি এবং জালিয়াতি কমাতে ব্লকচেইনচালিত পরিচয় যাচাইকরণ চালু করা হবে এবং টোকেনাইজড সম্পদ ও সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা প্রবর্তন করা হবে। মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই পিয়ার-টু-পিয়ার ঋণদান, বিমা এবং সঞ্চয়ের জন্য ডিসেট্রালাইজড ফিনান্স (DeFi) ইন্টিগ্রেশন প্ল্যাটফর্মগুলো চালু করা হবে এবং আর্থিক চুক্তিগুলোর স্বয়ংক্রিয় সম্পাদনের জন্য স্মার্ট কন্ট্রাক্টভিত্তিক DeFi সিস্টেমগুলোর অন্তর্ভুক্তকরণ সহজতর করা হবে। চূড়ান্তভাবে, সাইবার নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা বাড়ানোর জন্য জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার, থ্রেট ইন্টেলিজেন্স এবং এআইচালিত শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মতো উন্নত সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলো প্রয়োগ করা হবে। এ পদক্ষেপের সঙ্গে গ্রাহকের ডেটা সুরক্ষিত রাখতে গ্লোবাল ডেটা সুরক্ষা নীতিগুলোর (যেমন: ডিপিআর) সঙ্গে সম্মতি নিশ্চিত করা হবে। এ তিন ধাপের রোডম্যাপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বিশ্বমানের একটি আধুনিক ও নিরাপদ ফিনটেক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হবে।
অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত উদার পররাষ্ট্রনীতি বা ‘ব্লক-নিরপেক্ষ’ পররাষ্ট্রনীতির আলোকে একটি সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসাবে মার্কিন আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমের বিকল্প হিসাবে ব্রিকস পেমেন্ট সিস্টেমের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। ব্রিকস পে কার্ড হলো একটি ব্লকচেইনভিত্তিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানো এবং অন্য মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুইফট সিস্টেমের বিকল্প হিসাবে চালু করা হয়েছে। এ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মুদ্রার বৈচিত্র্য এনেছে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সুবিধাজনক করে তুলেছে।
ড. শাহ জে মিয়া : প্রফেসর অব বিজনেস অ্যানালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া; বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য
