চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছিল ম্যামথ
Advertisement
এ কে এম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চার থেকে ছয় লাখ বছর আগে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত অতিকায় হাতি ম্যামথ। ম্যামথ বরফ যুগের প্রাণী। তাই প্রকৃতি এর গায়ে চড়িয়েছিল বড় বড় পশম। কিন্তু পৃথিবী উষ্ণ হতে থাকলে এই বিরুদ্ধ প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ম্যামথ ব্যর্থ হয়। একসময় নির্বংশ হয়ে যায়। ডাইনোসরসহ অনেক প্রাণীর হারিয়ে যাওয়ার পেছনে এমন ব্যর্থতার ইতিহাস রয়েছে।
এরা শক্তির দাপটে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছিল ঠিকই; কিন্তু সংকটে নিজেদের রক্ষা করতে শেখেনি। অথচ ম্যামথেরও অনেক আগের প্রাণী তেলাপোকা। বহু লক্ষ বছর আগের পাথরের গায়ে তেলাপোকার ফসিল পাওয়া গেছে। এখনও দাপট নিয়ে আমাদের সঙ্গে বসবাস করছে এ ক্ষুদ্র প্রাণীটি। এদের পরিণতি ও বাস্তবতা দেখে বিশ শতকের ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আর্নল্ড জোসেফ টয়েনবি তার বিখ্যাত থিওরি প্রকাশ করেছিলেন, ‘থিওরি অব চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড রেসপন্স’, যা বাংলায় আমরা বলে থাকি ‘প্রতিবন্ধকতা ও মোকাবেলা তত্ত্ব’।
অর্থাৎ টিকে থাকতে হলে যে কোনো চ্যালেঞ্জের যৌক্তিক মোকাবেলা করতে হয়। শক্তির দাপট ক্ষণস্থায়ী। যদিও হাজার বছর ধরে এমন বাস্তব ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে যাচ্ছে, তবু আগুনের আলোয় ঝাঁপিয়ে পড়া পতঙ্গের মতো বিভ্রান্ত মানুষ শক্তি-মদমত্ত হয়ে সঠিকভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা না করে নিজেদের নিজেরাই পরাজিত করছে। বর্তমানের চাওয়া-পাওয়াটা প্রধান হয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবছে না কেউ।
এই যে, এখন বিএনপির মতো বড় দল ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে-এর জন্য তো প্রধান দায় বিএনপি নেতৃত্বেরই। মাটি ফুঁড়ে বেরোনো দলের ঐতিহ্য গড়ার জন্য যখন নেতৃত্বের অভিনিবেশ দরকার ছিল, তখনই ক্ষমতায় এসে বর্তমানকে নিয়ে মেতে রইল। উদাসীন থাকল নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার দায় থেকে।
বঙ্গবন্ধু-উত্তর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হতাশা ও ব্যর্থতার সুযোগে বিএনপি বড় জনসমর্থিত দলে পরিণত হলেও টিকে থাকার জন্য দল একটি সুসংহত কর্মীবাহিনী তেমনভাবে গড়ে তুলতে পারল না। কুল-পরিচয় উজ্জ্বল না থাকা হঠাৎ বড়লোক যেমন নিজের ওজন বুঝতে চায় না, বিএনপির দশাও অনেকটা তেমন হল। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মতৎপরতা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের পক্ষপুটে রাখা ও পাকিস্তানি লবির সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করে বিএনপি শুরু থেকেই নিজেদের জাত চিনিয়েছিল।
এর মধ্যে একাধিকবার ক্ষমতায় এসে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে থাকে। সন্ত্রাস আর দুর্নীতির ভয়ংকর কাব্য রচনা করতে থাকেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর্নল্ড টয়েনবির নির্দেশনার চ্যালেঞ্জকে আমলেই আনলেন না। ফলে মোকাবেলা করতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়লেন। নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবে কর্মী-সবল দল না হওয়ায় আজ এ সংকটের সময়ে আন্দোলনের কথা বললেও কর্মীদের মাঠে নামানো সম্ভব হচ্ছে না।
সামনে যে বিএনপি মাঠের রাজনীতিতে সবল হতে পারবে, তেমনও মনে হয় না। বিএনপি যে একা ডুবছে এমন নয়, এ দলের সঙ্গে জোট বেঁধে যারা রাজনীতিতে দাঁড়াতে চেয়েছে; তাদেরও পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে বসে এতটা সতর্ক যে, বিএনপি নেতৃত্ব ষড়যন্ত্রের রাজনীতির পথ ধরে ক্ষমতায় ফিরবে; সে সম্ভাবনাও অনেকটা ফিকে। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী প্রতিপক্ষ চাইবেই অন্যপক্ষকে কুপোকাত করতে। এ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব কৌশলী রাজনীতির পথ ধরে। কিন্তু নানা মত-পথের নেতাদের দিয়ে তেমন কৌশল সম্ভব নয়।
হতাশার কথা এই যে, বিএনপির এ অবধারিত অবক্ষয় শুধু দলটিকেই খাদের কিনারায় নিয়ে এলো না, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্যও নষ্ট করে দিল। ম্যামথের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যর্থ বিএনপি নেতৃত্বের ঘুরে দাঁড়ানো খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। সময়ের সুবিধাকে ব্যবহার করে এক সময় বিএনপি দেশের সুবিধাপ্রত্যাশী একদল এলিট শ্রেণির মানুষকে নিজেদের দলভুক্ত করতে পেরেছিল।
এখন স্বাভাবিক নিয়মে সেই বাঁধন অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। হালভাঙা নাবিক নয়, নাবিকবিহীন হাল হয়ে তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ রাজনীতির সমুদ্রে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে বিএনপি।
অপরদিকে, একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক উজ্জ্বল ঐতিহ্য ধারণ করে বেড়ে ওঠা আওয়ামী লীগও কি নিজ দলীয় আদর্শকে রক্ষা করতে পারছে? তবে ঠিক, আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনার দীর্ঘ সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় অনেক অর্জনের সোনালি পালক যুক্ত হয়েছে; কিন্তু টয়েনবির উল্লিখিত চ্যালেঞ্জ এবং এর মোকাবেলার প্রস্তুতি কি দলটির রয়েছে? বিরোধী রাজনৈতিক দলের চ্যালেঞ্জ না থাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে একটু হামবড়া ভাব চলে এসেছে-এটি সচেতন মানুষের চোখেই দৃশ্যমান।
আওয়ামী লীগ পরিচালকদের জবানি শুনলে মনে হয়, তাদের কথা আর চিন্তাই সর্বশ্রেষ্ঠ। যারা দলের কার্যক্রম বা অঙ্গসংগঠনগুলোর সমালোচনা করে, তা সংবাদপত্র হোক বা কলাম লেখক হোন; আওয়ামী লীগ নেতানেত্রীরা তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেনই। এমন মনোভাব আমাদের মধ্যে একটু আতঙ্ক তৈরি করে বৈকি!
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে আমি গবেষণার কাজে কয়েক বছর ভারতে ছিলাম। তখন একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা বলেছিলেন, তাদের সরকার গোয়েন্দাদের কাছ থেকে নানা ধরনের তথ্য তো গ্রহণ করেনই; এর পাশাপাশি তাদের একটি সেল আছে-এ সেলের কাজ ছিল পত্র-পত্রিকার লেখা, প্রতিবেদন এবং অধ্যাপক, শিল্প-সংস্কৃতির প্রথিতযশা গুণী মানুষের নানা পরামর্শমূলক বক্তব্যের সারকথা সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামে পাঠানো।
প্রায় গণতান্ত্রিক দেশে অমন চর্চা রয়েছে; কিন্তু আমাদের দেশের অতি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের ‘অযাচিত’ পরামর্শকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দেখেন এবং নিজেদের বক্তব্যে তা প্রকাশও করেন। এ সময়ই আমি আতঙ্কের সঙ্গে আর্নল্ড টয়েনবির তত্ত্বের কথা মনে করি। ম্যামথেরও তো শক্তির দাপট কম ছিল না। বিরুদ্ধ অবস্থায় পরমুহূর্তে নির্বংশ হয়ে গিয়েছিল।
একক ক্ষমতার ব্যবহার মাঝেমাঝে বিভ্রান্ত করতে পারে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এর প্রমাণ কি নেই? ১৮৮৫ সালে ইংরেজ সিভিলিয়ান এলান অক্টভিয়ান হিউম ভারতীয় নেতৃস্থানীয়দের নিয়ে ‘অল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ গঠন করেছিলেন। ভারতীয়দের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন। গঠনপর্ব থেকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলীয় নীতি ছিল কংগ্রেসের। প্রথম একটি বড় ঝাঁকি আসে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে সামনে রেখে। বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সমর্থন জানায় পূর্ববঙ্গের মানুষ। এখানকার নেতৃত্ব ও অধিবাসী বেশিরভাগ মুসলমান।
আর বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন পশ্চিমবঙ্গের, বিশেষ করে হিন্দু এলিট শ্রেণি ও রাজনীতিকরা। তারা বঙ্গভঙ্গকে ব্যাখ্যা করেন ব্রিটিশ শাসকদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’ বলে। অসাম্প্রদায়িক দল বলে পরিচিত কংগ্রেস মুসলমান নেতাদের সঙ্গে তেমন আলাপ না করেই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিল। এভাবে সাময়িক সংকটে পড়েছিল কংগ্রেস। এরই প্রতিক্রিয়ায় নিজ সম্প্রদায়ের দাবি উত্থাপনের জন্য ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’।
পাকিস্তান অর্জনের পর মুসলিম লীগ হয়ে যায় পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল। জনগণের চাহিদা পূরণ না করতে পেরে অধিকাংশের পছন্দের দল মুসলিম লীগকে আজকের বাংলাদেশে ম্যামথের পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। আর পাকিস্তানেও যে এ দলটি অনেক বেশি শক্তিমান, তেমন বলা যাবে না। অন্যদিকে, ভারতে নানা উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে চলেও গণতান্ত্রিক আদর্শকে বিসর্জন না দেয়ায় প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস প্রতাপের সঙ্গে এখনও টিকে আছে।
এ কারণেই আমাদের আতঙ্কিত হতে হয়। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ভীষণভাবে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট। প্রকৃত গণতান্ত্রিক বোধসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া একটি রাষ্ট্রের বিকাশ সম্ভব নয়। ভুললে চলবে না, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু এ অদ্ভুত গণতন্ত্রের মধ্যদিয়ে প্রকারান্তরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বৈরতন্ত্র। সাধারণ মানুষের মধ্যে আইয়ুব খানের জনপ্রিয়তা যে ছিল না, তেমন নয়। দৃঢ়তার জন্য তাকে পাকিস্তানের ‘লৌহমানব’ও বলা হতো।
তিনি বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ করে মানুষের আস্থাও অর্জন করেছিলেন। ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালনের তোড়জোড়ও চলছিল দেশজুড়ে। কিন্তু রাজনৈতিক ভুলের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ন্যায্য দাবির প্রতি সম্মান দেখাতে পারেননি। তাই দিনে দিনে আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলন তীব্র হতে থাকে। চেতনায় স্বৈরাচার আর প্রকাশ্যে মৌলিক গণতন্ত্রী আইয়ুব খান শক্ত হাতে মানুষের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু যথার্থভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পারায় এ লৌহমানবকেও ম্যামথের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়।
আমাদের রাজনীতিতে এখন আর বিকল্প কিছু নেই। বিএনপির ক্ষয়িষ্ণু দশার পর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়ার আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। তাই বলে খোলামাঠে গোল দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যদি মনে করেন জনমতের দরকার নেই, আমাদের বোধ-বিবেচনায় সব করব; তাহলে ‘প্রতিবন্ধকতা ও মোকাবেলা তত্ত্ব’কে অস্বীকার করতে হয়।
এমন অস্বীকার আইয়ুব খানও করেছিলেন। অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নতি, কোভিড মোকাবেলায় অনেকটা সাফল্য নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যথার্থই আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ইত্যাদি যেভাবে বেড়ে চলেছে, অস্থিতিশীল বাজার নিয়ে মানুষ যেভাবে বিপাকে পড়ছে; স্বাভাবিকভাবে এসবের দায় গিয়ে পড়বে সরকারের ওপর। মানুষ কি দিন দিন ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ছে না?
সুতরাং সরকারপক্ষ যতই অখুশি হোন না কেন, এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বলব, আইয়ুব খানও কিন্তু ভেবেছিলেন উন্নয়নের ফিরিস্তি এবং শক্তির আসুরিক দাপট দেখিয়ে বাঙালিকে দমিয়ে ফেলতে পারবেন; কিন্তু বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস তা বলে না। অবশ্য এটাও ঠিক, আইয়ুব খানের সময় আর বাস্তবতা এখনকার সময়ের মতো ছিল না। কিন্তু এ আপ্তবাক্যটিও তো অস্বীকার করা যায় না, ‘হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ’।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
