আগুনে গলে যাওয়া দেশ সুদান, সভ্যতার নিঃশেষ নীরবতা
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৪৩ পিএম
সুদানে সংঘাতে এখন পর্যন্ত দেড় লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। ছবি: আল জাজিরা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রক্তের রঙ কি কখনো সময়ের সঙ্গে বদলায়? হয়তো না। কারণ খার্তুমের আকাশে যে রক্তের কুয়াশা এখন ভাসছে, তা পনেরো শতাব্দীর মানবসভ্যতার সব মিথ্যাচারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
সুদান এক সময় নীলনদের তীরে সভ্যতার আশ্রয়স্থল ছিল আজ ধ্বংসের আর্তনাদে কাঁপছে। শহরের উপরে কালো ধোঁয়া, বাজারের জায়গায় বোমার গর্ত, হাসপাতালের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা রক্ত—এ এক এমন নরক যেখানে মানবতা কেবল একটি পরিত্যক্ত শব্দ।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন ইতিহাসের দীর্ঘতম আত্মবিধ্বংসী সংঘাতগুলোর একটি। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী আধা সামরিক গোষ্ঠী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) শক্তির ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় পিষ্ট হচ্ছে এক জাতির ভাগ্য। কিন্তু এই যুদ্ধ কেবল রাজনীতির জন্য নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে ঘোষিত এক নগ্ন বিদ্রোহ।
জাতিসংঘের মতে, ইতোমধ্যেই এক কোটি মানুষ গৃহহীন। শহরের পর শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শিশুদের দেহ বালুর নিচে, মায়েদের দৃষ্টি আকাশে স্থির যেন নীলনদও আজ রক্তে লাল।
বার্তা সংস্থা এপির তথ্যে জানা গেছে, উত্তর দারফুরে আরএসএফ বাহিনীর হামলায় মাত্র একদিনে ৪০ জন শরণার্থীকে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু।হাসপাতালগুলো আর হাসপাতাল নেই সেগুলো এখন মৃত্যু গণনার কেন্দ্র।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, পশ্চিম কুরদোফানে এক হাসপাতালের ওপর বিমান হামলায় পুরো সার্জারি ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেছে, ডাক্তাররা নিজেরাই রোগীর পাশে মারা গেছেন।
এই যুদ্ধ শুধু বুলেট বা বোমার নয় এটি এক পরিকল্পিত দানবীয়তার নাট্যমঞ্চ। আরএসএফ-এর সৈন্যরা ধর্ষণ করছে, অপহরণ করছে, শিশুদের ব্যবহার করছে যোদ্ধা হিসেবে।
দ্য গার্ডিয়ানের জানুয়ারি ২০২৫ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে—দারফুরে আরএসএফ গণহত্যা চালিয়েছে, এটি জাতিগত নিধনের আরেক নাম। একই সময়ে অ্যামেনিস্টি ইন্টারন্যাশনাল লিখেছে, “খাদ্য এখন অস্ত্র, ক্ষুধা এক কৌশল।”
মানবিক ত্রাণ আটকানো হচ্ছে, শরণার্থীদের পথে বোমা ফেলা হচ্ছে, মায়ের কোল থেকে শিশু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এ যেন এক প্রাগৈতিহাসিক পশুতার পুনর্জন্ম।
তবু পৃথিবী চুপ। নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদরদপ্তরে আলো জ্বলছে, ব্রাসেলসের কূটনৈতিক করিডরে কফির গন্ধ, আর দারফুরে মানুষ জ্বলছে তেলে আর আগুনে। এটাই আমাদের সভ্যতার আধুনিক নীরবতা এক এমন নীরবতা যা শব্দের থেকেও বেশি ভয়ংকর।
যেখানে প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি মৃতদেহের ওপর লেখা হচ্ছে, আর প্রতিটি সম্মেলনের রেজোলিউশন শিশুর আর্তনাদকে ঢেকে দিচ্ছে।
ইতিহাস সাক্ষী, দারফুরে ২০০৩ সালে একই রকম গণহত্যা হয়েছিল। তখন বিশ্ব তাকিয়ে ছিল, আজও তাকিয়ে আছে। কিন্তু বিচার হয়নি, দোষীরা বেঁচে গেছে, আর এই অবিচারই জন্ম দিয়েছে নতুন দানব—আরএসএফ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এখন বলছে, “বিচারহীনতা এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।” অর্থাৎ, সুদানে শুধু গুলি নয়, আইনের নীরবতাও হত্যা করছে মানুষকে।
এই যুদ্ধের ভেতর লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতীক সভ্যতার মৃত্যু। যখন শিশুদের ক্ষুধা দিয়ে হত্যা করা হয়, তখন পৃথিবীর প্রতিটি রুটি কলঙ্কিত হয়। যখন নারীর গর্ভে আগুন ঢালা হয়, তখন সব ধর্ম, সব নৈতিকতা ব্যর্থ হয়ে যায়। যখন একটি জাতি সাহায্যের জন্য চিৎকার করে, আর আমরা পর্দার সামনে নীরবে স্ক্রল করে যাই, তখন সেই নীরবতাই হয়ে ওঠে অপরাধের সহযাত্রী।
সুদানের এই ধ্বংস একক কোনো সরকারের ব্যর্থতা নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির ব্যর্থতা। আমরা উন্নয়নের নামে মহাকাশে মানুষ পাঠাই, কিন্তু খার্তুমে এক শিশুকে বাঁচাতে পারি না। আমরা গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধ শুরু করি, কিন্তু মানবতার নামে একটিও যুদ্ধ থামাতে পারি না।
আজ নীলনদের তীরে কেবল ধোঁয়া আর ছাই কিন্তু সেই ছাইয়ের মধ্যেও হয়তো কোনো শিশুর চোখে এখনও একটুখানি আলো বেঁচে আছে। সে আলোই হয়তো আমাদের শেষ সুযোগ নিজেকে মানুষ প্রমাণ করার।
কারণ, যদি সুদানের রক্তের হিসাব আমরা না দিই, ইতিহাস আমাদের বিচার করবে আর সেই বিচারে আমরা কেউই নির্দোষ থাকব না।
সুদান আজ আমাদের বিবেকের আয়না যেখানে আমরা নিজেদের বিকৃত মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
এ যুদ্ধ শেষ না হলে, শুধু সুদান নয়, পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যাবে কারণ যে সভ্যতা অন্যের মৃত্যুতে চুপ থাকে, তার নিজের মৃত্যুও কেবল সময়ের অপেক্ষা।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রতিবেদন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট, এপি নিউজ, দ্যা গার্ডিয়ান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুদান পরিস্থিতি প্রতিবেদন, ইউনিসেফ
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর।

