Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

শ্রমিক অসন্তোষ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক পরীক্ষা

Icon

মাহমুদুর রহমান সুমন

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৮ পিএম

শ্রমিক অসন্তোষ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক পরীক্ষা

Advertisement

একটি রাষ্ট্রের পতনোন্মুখ অর্থনীতিকে একদিন প্রশ্ন করা হলো, ‘তোমার সবচেয়ে বড় ক্ষত কোথায়?’ অর্থনীতি উত্তর দিল, ‘আমার শূন্য কোষাগারে নয়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেখানে জনগণের সম্পদ রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্তরাই আস্থার ভিত্তি ভেঙে দিয়েছে।’

কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান একটি রাজনৈতিক বিজয়; কিন্তু তার রেখে যাওয়া দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও বৈষম্য দূর করে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ আরও কঠিন ঐতিহাসিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের সামনে এখন প্রধান পরীক্ষা—রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে টেকসই অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণে রূপান্তর করা।

২০০৭–০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসন এবং পরবর্তী পনেরো বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যাংকিং দুর্বলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি গভীর হয়েছে। ফলে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব কেবল প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার নয়; রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

নভেম্বর ২০২৬-এর পোশাকশ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। মজুরি বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত দাবির পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সহিংসতা এবং কারখানা বন্ধের ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশকে ঝুঁকিতে ফেলছে।

পোশাকশিল্পের মালিকদের বিনিয়োগ, উৎপাদনব্যয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিয়েই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ জরুরি। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওভারটাইম-বোনাসসহ কোনো কোনো শ্রমিকের আয় ৬০ হাজার টাকা এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মরত পরিবারে সম্মিলিত আয় লক্ষাধিক হতে পারে—এমন অনুমান উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত নয়; প্রকৃত আয় দক্ষতা, কর্মঘণ্টা ও বেতনকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।

একই সঙ্গে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে সাবেক কর্তৃত্ববাদী শক্তি কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। গোয়েন্দা সংস্থার আগাম সতর্কতা, তথ্যভিত্তিক নজরদারি ও নিরপেক্ষ তদন্ত জোরদার করে প্রমাণিত নাশকতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা জরুরি। 

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবাধীন ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি, দুর্বল আর্থিক তদারকি এবং প্রকল্পব্যয়ের অস্বচ্ছতা অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৩.২ শতাংশে পৌঁছায় এবং রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে। বিনিয়োগের স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকেও দুর্বল করেছে। অতীতের ক্ষমতাকাঠামোর সুবিধাভোগীরা প্রশাসনিক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বজায় রাখলে সংস্কার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই স্বচ্ছ তদন্ত, স্বাধীন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

সংকটের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আহ্বান, শিল্পনিরাপত্তায় নির্দেশনা এবং শ্রমিক-মালিক প্রতিনিধিত্বসহ মজুরি বোর্ড গঠন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ইতিবাচক নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দ্রুত গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো, উৎপাদন পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং সংস্কারের বাস্তব ফলাফলের ওপর।

বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর উচিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আত্মরক্ষামূলক রাজনীতি অতিক্রম করে গঠনমূলক গণতান্ত্রিক ভূমিকা গ্রহণ করা। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার সমর্থনের পাশাপাশি শিল্পের নিরাপত্তা, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার এবং সংসদীয় জবাবদিহিতে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারেরও কর্তব্য বিরোধী মতের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা। কারণ শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি শুধু নির্বাচিত সরকার নয়; স্বাধীন বিরোধী দল এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যও।

বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনির্ভরতা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বিদেশি প্রভাব, তথ্যযুদ্ধ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন; তবে যেকোনো সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে হবে।

বিশেষত রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে নাগরিকের অবাধ চলাচল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন অক্ষুণ্ণ রেখে। পাশাপাশি মাদকমুক্ত, শিক্ষিত, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই হবে নিরাপদ সমাজ, উৎপাদনশীল অর্থনীতি এবং টেকসই জাতীয় পুনর্জাগরণের অন্যতম ভিত্তি। জাতীয় নিরাপত্তা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং শিল্পের ধারাবাহিকতা—এই তিনটির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য শর্ত।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উৎপাদনশীল শিল্পের সুরক্ষা, শ্রমিকের মর্যাদা, উদ্যোক্তার আস্থা এবং দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ওপর। সরকারকে সংস্কারের নেতৃত্ব দিতে হবে, বিরোধী দলকে গঠনমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষকে জাতীয় স্বার্থে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। বাংলাদেশের প্রকৃত পুনর্জাগরণ ঘটবে তখনই, যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারে রূপান্তরিত হবে।

লেখক: অর্থনৈতিক সহসম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটি

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ পালটাপালটি ধাওয়া, মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ

মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ পালটাপালটি ধাওয়া, মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ

সীমান্তের ওপারের ইশারায় অনেকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সীমান্তের ওপারের ইশারায় অনেকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শ্রমিকের অর্থনৈতিক উন্নতি মানেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

শ্রমিকের অর্থনৈতিক উন্নতি মানেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

বিক্ষোভ সহিংসতা তাণ্ডব

৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে দিনভর আন্দোলন বিক্ষোভ সহিংসতা তাণ্ডব

সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ডিসেম্বর সামনে রেখে একটি মহল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে: প্রধানমন্ত্রী

ডিসেম্বর সামনে রেখে একটি মহল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে: প্রধানমন্ত্রী

আরও পড়ুন

শ্রমিক অসন্তোষ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক পরীক্ষা

শ্রমিক অসন্তোষ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক পরীক্ষা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: জিয়া জাতির নির্ভরতার মহান কাণ্ডারী

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: জিয়া জাতির নির্ভরতার মহান কাণ্ডারী

নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

নির্বাচনি সমীকরণে আটকে গেলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু

গার্মেন্টস থেকে পাহাড়: বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা!

গার্মেন্টস থেকে পাহাড়: বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা!

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম