Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

গার্মেন্টস থেকে পাহাড়: বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা!

Icon

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

গার্মেন্টস থেকে পাহাড়: বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা!

আহসান হাবিব বরুন।

Advertisement

দেশ কি আবারও কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি? রাজধানীর শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, কারখানায় ভাঙচুর, সড়কে সংঘাত; অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ ও উত্তেজনা— সব মিলিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এমন পরিস্থিতি নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর বাংলাদেশ যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের অবস্থান পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে, তখন একের পর এক অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।

 ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ৩ নভেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের আন্দোলনে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলে সংঘাত ও কারখানা বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। সরকার মজুরি পর্যালোচনার জন্য বোর্ড গঠন করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ এবং চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এ দুটি পরিস্থিতিকে একই সুতায় গাঁথার আগে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। তবে এটুকু স্পষ্ট— দেশের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল এবং নিরাপত্তার দিক থেকে সংবেদনশীল পার্বত্যাঞ্চলে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তার অভিঘাত জাতীয় জীবনের বহু ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রশ্ন হলো— এই অস্থিরতার সুযোগ কারা নিচ্ছে, কারা সহিংসতা উসকে দিচ্ছে এবং রাষ্ট্র কেন আগাম সতর্কতা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে না?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প কেবল একটি রপ্তানিমুখী শিল্প নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে এখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব কেবল কারখানার মালিক কিংবা শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পরিবহণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রা।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দাবি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় যখন ক্রমাগত বাড়ছে, তখন শ্রমিকের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্র ও শিল্পমালিক— উভয়ের দায়িত্ব। শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি চাইবেন, সংগঠিত হবেন এবং আইনসম্মতভাবে দাবি জানাবেন— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ন্যায্য দাবির আড়ালে যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ কিংবা সহিংসতা চালায়, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শ্রমিকের অধিকার এবং সহিংসতার দায় এক বিষয় নয়। যে শ্রমিক ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন, তাকে অপরাধীর সঙ্গে এককাতারে দাঁড় করানো যেমন অন্যায়, তেমনি শ্রমিকের আন্দোলনকে ব্যবহার করে শিল্প ধ্বংসের চেষ্টা হলে সেটিও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এখানেই তৈরি পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক অস্থিরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় বেতন পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়ার পরও যদি আন্দোলনের নামে কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের ওপর বর্বর হামলার ঘটনা ঘটে, তাহলে সেসব কর্মকাণ্ডের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন এক বিষয়, আর সেই আন্দোলনকে পুঁজি করে শিল্পাঞ্চলে পরিকল্পিত নৈরাজ্য সৃষ্টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বস্তুত এর পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা এখন গভীরভাবে সামনে এসেছে। তা না হলে মজুরি বোর্ড গঠনের পরও তথাকথিত আন্দোলনকারীদের একটি অংশ কেন কাজে যোগ না দিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করছে? কেন পুলিশের ওপর বর্বর হামলা চালাচ্ছে, গাড়ি ভাঙচুর করছে এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথ বেছে নিচ্ছে?

যে প্রতিষ্ঠান বা কারখানা সাধারণ শ্রমিকের দৈনন্দিন রুটি-রুজির সংস্থান করে, সেখানে নিজেরাই আগুন দেওয়া ও ভাঙচুর করা কি কোনো সাধারণ বা নিরপরাধ শ্রমিকের পক্ষে সম্ভব? কখনোই নয়। এখানে পতিত ও পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা এবং তার বিদেশি দোসরদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে যে এসব নাশকতা পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট খাতের অর্থাৎ গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারাও একই ধরনের গভীর আশঙ্কা ও উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সূত্রের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, পতিত স্বৈরাচারের দোসর সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং শেখ হাসিনার আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী কিছু অসাধু শিল্পমালিকও এই অস্থিতিশীলতা তৈরিতে সরাসরি অর্থ ও ইন্ধন জোগাচ্ছেন। টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার বহু চিহ্নিত কারখানার মালিক গোপন আস্তানায় বসে নিয়মিত কোটি কোটি টাকা ঢালছেন, যাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে স্থায়ী বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সীমান্তের ওপারে বসে পলাতক শীর্ষ নেতারা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠাচ্ছেন এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার জন্য শ্রমিকবেশে ক্যাডারদের হাতে টাকা পৌঁছে দিচ্ছেন।

শুধু পোশাকশিল্পেই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও চরম বিভ্রান্তি ছড়াতে ডিসেম্বর মাসকে ঘিরে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ‘অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের’ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন গল্প ছড়িয়ে নাশকতার জ্বালানি জোগানো হচ্ছে। দেশজুড়ে ছোটখাটো ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতামূলক অপচেষ্টা চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং নিজেদের ঝিমিয়ে পড়া সন্ত্রাসী বাহিনীকে চাঙা রাখাই এর একমাত্র উদ্দেশ্য। একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলা যায়— এই তথাকথিত ‘ফিরতি বার্তা’ একটি দেউলিয়া রাজনৈতিক অপকৌশল বা ‘স্ট্যান্ডবাজি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাস্তবতা হলো— ফ্যাসিবাদের প্রতীক শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য চরম দণ্ডে দণ্ডনীয় এবং বিচারে ফাঁসির মুখে থাকা এক ফেরারি আসামি। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশে পা রাখা মাত্রই তাকে সরাসরি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে ঠাঁই নিতে হবে। তার মতো একজন ধূর্ত ও ভীতু চক্রান্তকারী মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় দেশে এসে বিচারের সম্মুখীন হবেন— এমন চিন্তা নিছক দিবাস্বপ্ন মাত্র। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণেও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই। সম্প্রতি প্রখ্যাত মার্কিন আন্তর্জাতিক গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ক্রিস্টিন ফেয়ার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনাকে মোদি সরকার কোনোভাবেই জীবিত অবস্থায় বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না। ভারতের নীতিনির্ধারকরাও ভালো করেই বোঝেন, হাসিনাকে ফিরিয়ে দিলে তাদের দীর্ঘদিনের বাংলাদেশকেন্দ্রিক একপেশে ও চরম ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির মুখোশ খুলে পড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা— জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আজ স্বীকৃত ও প্রমাণিত যে, জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার একক নির্দেশনায় প্রায় দুই হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে পঙ্গু ও রক্তাক্ত করা হয়েছে। এমন এক রক্তচোষা গণহত্যাকারীকে বাংলাদেশের মাটি আর কখনো রাজনৈতিকভাবে মেনে নেবে না। আজ আওয়ামী লীগ কেবল প্রশাসনিকভাবেই নিষিদ্ধ নয়; একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে দলটির বিচার এবং রাজনীতি থেকে চিরতরে বিতাড়নের দাবিও উঠেছে সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে। অতএব, হাসিনাকে নিয়ে অলৌকিক স্বপ্নের ফানুস উড়িয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার এই চেষ্টা কেবল তাদের চরম দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ।

গার্মেন্টস খাতের পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পাহাড়ি জনপদকেও বেছে নেওয়া হয়েছে। রাঙামাটির সাজেক ও পানছড়ি এলাকায় আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে কেবল দুই পক্ষের আধিপত্যের লড়াই বলে চালিয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার এই নতুন পরিকল্পনার পেছনে জড়িয়ে রয়েছে বিদেশি শক্তির ভূরাজনৈতিক কূটকৌশল। দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি অঞ্চলের এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তভিত্তিক নিরাপদ আশ্রয়ের নেটওয়ার্ক রয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মূল ভূখণ্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই পাহাড়ের শান্তি বিঘ্নিত করা হচ্ছে। সাজেকে ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা পরিষদ’ বা ‘কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’-এর মতো পকেট সংগঠন তৈরি করে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সেখানে নতুন করে বাঙালি পুনর্বাসনের বানোয়াট গুজব ছড়িয়ে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধানোর অপচেষ্টা চলছে।

সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো— এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যখন প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করছে এবং পর্যটনশিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তখন তাদের একটি অংশকে টিকিয়ে রাখতে ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে বহিরাগত প্রভুরা নানাভাবে মদত জুগিয়ে যাচ্ছে। পর্যটননির্ভর পার্বত্য অর্থনীতিতে ধস নামিয়ে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলার মাধ্যমে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি অশান্তির ক্ষেত্র প্রস্তুত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

আজকের এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— কে বা কারা এই অপশক্তির নেপথ্য নায়ক? দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে লুণ্ঠন করা শেখ হাসিনা আজ ভারতে বসে এ দেশের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বুনছেন। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে এবং জনগণের অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে ম্লান করতে তিনি ও তার দোসররা বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা ঢালছেন। দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে বেঈমানি করে যারা সীমান্তপারের প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, ইতিহাস তাদের কাউকেই ক্ষমা করেনি, এবারও করবে না।

ভারতের কিছু নীতিনির্ধারক মহল ও গোয়েন্দা সংস্থার বাংলাদেশবিরোধী চরম আগ্রাসী মনোভাব আজ আর গোপন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করতে যারা অতীতে স্বৈরাচারকে সর্বাত্মক সমর্থন জুগিয়েছে, আজ তারাই পালিয়ে যাওয়া খুনিকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। কলকাতার মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নাশকতার ছক কষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির এই অপচেষ্টা কেবল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারপরিপন্থীই নয়, বরং এটি সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর এক নগ্ন আঘাত।

বর্তমান অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপুল জনরায়ে নির্বাচিত সরকারকে সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। কালবিলম্ব না করে দেশের প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং উৎপাদনব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দেশের অর্থনীতি এবং সার্বিক রফতানি বাণিজ্যে এমন বড় ধরনের ধস নামতে পারে, যা প্রকারান্তরে ওই পতিত ও পলাতক স্বৈরাচার এবং তাদের দোসরদের দেশবিনাশী ইচ্ছাই পূরণ করবে। বাংলাদেশের জনগণ বহু রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে স্বৈরাচারমুক্ত একটি নতুন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছে। কোনো কুচক্রী মহলের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র এ দেশের অগ্রযাত্রাকে রুখে দিতে পারবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবিলম্বে মাঠপর্যায়ে কার্যকর জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। যারা শ্রমিকের ছদ্মবেশে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, অগ্নিসংযোগ করে কারখানায় তাণ্ডব চালাচ্ছে, তাদের আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চিহ্নিত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

একই সঙ্গে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য। পোশাকশিল্পের মালিক, প্রকৃত শ্রমিক নেতা, রাজনৈতিক দল এবং আপামর জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে যৌথ বাহিনীকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে, যেন কোনো দেশি-বিদেশি সন্ত্রাসী চক্র পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি ব্যবহার করে দেশের অখণ্ডতায় আঘাত হানতে না পারে।

পরিশেষে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই— গার্মেন্টসশিল্পের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জনপদ পর্যন্ত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার যে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা সামনে এসেছে, তা মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সতর্ক, দায়িত্বশীল ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক স্বার্থ যেন বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক সম্প্রীতি ও সার্বভৌমত্বকে জিম্মি করতে না পারে। পলাতক স্বৈরাচার ও তাদের দেশি-বিদেশি মদদদাতাদের যেকোনো অপতৎপরতার জবাব দিতে হবে জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক দৃঢ়তা, আইনের শাসন এবং জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার সামরিক বা প্রশাসনিক সক্ষমতায় নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জনগণের ঐক্য, জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার এবং সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার মধ্যে। বহু ত্যাগ, রক্ত ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। বাংলাদেশ কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে নতিস্বীকার করার রাষ্ট্র নয়; এই দেশ তার জনগণের, এই দেশের ভবিষ্যৎও নির্ধারিত হবে এ দেশের মানুষের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষায়। সুতরাং কোনো অপশক্তিই বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কিংবা সার্বভৌম অস্তিত্বকে স্তব্ধ করে দিতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

ই-মেইল:[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

গার্মেন্টস থেকে পাহাড়: বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা!

গার্মেন্টস থেকে পাহাড়: বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা!

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যে ৪ প্রভাব ফেলবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যে ৪ প্রভাব ফেলবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে

অন্যমত জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

জাপানি সহায়তা এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

মজুরি সমস্যা সমাধানে চাই সদিচ্ছা ও সংলাপ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম