যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যে ৪ প্রভাব ফেলবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে
Advertisement
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৪ এএম
ছবি-এআই সম্পাদিত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের মিডটার্ম (মধ্যবর্তী) নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। যদিও মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার প্রধান নির্বাহী ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে থাকে, তবুও কংগ্রেসের উভয় কক্ষ (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেট)—এর রাজনৈতিক সমীকরণ হোয়াইট হাউসের ক্ষমতাকে অনেকখানি সীমিত বা প্রভাবিত করতে পারে।
রিপাবলিকান পার্টি যদি কংগ্রেসের হাউজ এবং সিনেট দুটিতেই বা যেকোনো একটিতে নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে ট্রাম্পের অবশিষ্ট প্রেসিডেন্সি মেয়াদে বৈদেশিক নীতিতে যেসব বড় ধরনের পরিবর্তন ও ধাক্কা আসতে পারে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ইরান নীতি ও সামরিক বাজেটের ওপর লাগাম
মার্কিন সংবিধানে যেকোনো প্রকার সরকারি বা সামরিক অর্থায়নের বিল শুরু হতে হয় হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস থেকে।
*যুদ্ধে অর্থায়ন সংকট: ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকেন্দ্রিক কোনো সামরিক অভিযান, নতুন নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক ব্যয় বাড়াতে চাইলে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউজ সেই বাজেট আটকে দিতে পারে বা শর্ত জুড়ে দিতে পারে।
*কংগ্রেশনাল তদন্ত ও তদারকি: সিনেট বা হাউজের পররাষ্ট্র ও সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটিগুলোর নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, বিশেষ করে ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা নিয়ে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কংগ্রেসে তলব করে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা হবে।
*ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট (War Powers Resolution): ট্রাম্পের একতরফা সামরিক সিদ্ধান্ত বা পারমাণবিক হামলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ রুখতে কংগ্রেস ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ প্রয়োগের চেষ্টা বাড়াবে, যাতে প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা সীমিত হয়।
২. ইসরাইল-ফিলিস্তিন নীতিতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্কের ট্র্যাডিশনাল নীতি নিয়ে এক বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে।
*অস্ত্র সরবরাহে শর্ত ও নিষেধাজ্ঞা: ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ইসরাইলে ঢালাও এবং অনিয়ন্ত্রিত সামরিক সাহায্য ও অস্ত্র সরবরাহের ওপর কড়া শর্ত আরোপের উদ্যোগ নেবে।
*ফিলিস্তিনি ও গাজা ইস্যুতে চাপ: হোয়াইট হাউসের একতরফা ইসরাইল ঘেঁষা নীতি এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের সমর্থনে বাধা সৃষ্টি করা হবে, যা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু অক্ষের জন্য বড় কূটনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।
৩. মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের সাথে সম্পর্ক (সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহ)
*পরমাণু ডিল ও অস্ত্র বিক্রি স্থগিত: সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের পারমাণবিক ও বিশাল অস্ত্র চুক্তিগুলো সিনেটে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
*মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা: ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ওপর মানবাধিকার ও আঞ্চলিক সংঘাত কমানোর বিষয়ে চাপ বাড়াবে, যা ট্রাম্পের সরাসরি ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
৪. ‘ল্যাম ডাক’ প্রেসিডেন্সি ও ট্রাম্পের একতরফা নির্বাহী আদেশ
কংগ্রেসে বিরোধী দল জয়ী হলে ট্রাম্প ঘরোয়া নীতিতে আইন পাসের সক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলবেন (যাকে রাজনীতির ভাষায় Lame Duck President বলা হয়)।
*পররাষ্ট্রনীতিতে অতিরিক্ত মনোযোগ: ঘরোয়া রাজনীতিতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রায়শই নিজেদের প্রভাব জাহির করতে বিদেশি সংঘাত বা পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি আক্রমণাত্মক বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ (Executive Orders) ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে পারেন।
*বিশ্বমঞ্চে মার্কিন গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস: মার্কিন আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের এই গৃহবিবাদ ও দ্বিধাবিভক্তি দেখে রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মতো বৈশ্বিক প্রতিপক্ষগুলো মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক চাপকে দুর্বল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ পাবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র

