কী অদ্ভুত কাণ্ড! খবরপাড়া বলছে তেল আছে। সরকার বলছে মজুত পর্যাপ্ত। অথচ পাম্পগুলো তেল দিচ্ছে না। বলছে নেই! বেশিরভাগ পাম্পই বন্ধ। ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুই দিনের দুনিয়া! কত জ্বালা মানুষের! ক্ষুধার জ্বালা, প্রেম জ্বালা, চৈত্রের চান্দি-ফাটা দুপুরে রাজধানীর জ্যাম জ্বালা, সংসারে জ্বালা, কত জ্বালায় আমাদের জ্বলতে হয় সারাদিন। জীবন তিতে তালা করে তোলা জ্বলুনির এ সাতকাহনে এবার নতুন আপদ হয়ে এলো... জ্বালানির জ্বালা!
‘মহারাজ’ ট্রাম্পের মুলুক থেকে ‘নটরাজ’ নেতানিয়াহুর তালুক- সবখানেই। বলা নেই কওয়া নেই হুট করে ইরান হামলা (২৮ ফেব্রুয়ারি)! দিন তিনেক না যেতেই ঢাকার তেল পাম্প বন্ধ! শহরের কোথাও তেল নেই! কারবালার পানির মতো তেলের জন্য হাহাকার! পেট্রল পাম্পগুলোর সামনে শত শত গাড়ি!
মোটরসাইকেল, প্রাইভেট, মাইক্রো, অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক, মিনি ট্রাক কী নেই সেখানে? মিনিটে মিনিটে বাড়ছে অপেক্ষার লেজ। সঙ্গে খিটমিটে মেজাজের চাপা বিরক্তি; অসহায় আস্ফালন!
কী অদ্ভুত কাণ্ড! খবরপাড়া বলছে তেল আছে। সরকার বলছে মজুত পর্যাপ্ত। অথচ পাম্পগুলো তেল দিচ্ছে না। বলছে নেই! বেশিরভাগ পাম্পই বন্ধ। কিছু কিছু পাম্পে আবার নববধূর ঘোমটা খোলার দশা।
কৌতুহলের লাইন বাড়তেই লজ্জাবতীর মতো মুখ লুকিয়ে ফেলছে। আর খোলে না! বউ দেখতে আসা পাড়ার লোকেরা তখন থ! কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ কেউ আবার ঝোঁপ বুঝে কোপ মারছে। তিথি-নক্ষত্র দেখে পাম্প খুলছে। দু/তিন ঘণ্টা যেতেই খেল খতম। দম শেষ। অথচ মাঠে তখন হাজার ফকিরের মেলা।
সকাল থেকে রাত; রাত থেকে ভোর। ২৪ ঘণ্টায় চলছে ঢাকার এই তেলপথ লড়াই। মাত্র ২০০ টাকার অকটেন/ পেট্রলের জন্য নিদেন পক্ষে ২ থেকে ৪ ঘণ্টার লড়াই। ২/৩ টা পাম্প ঘুরে এসে, আরও বেশি সময় পুড়ানোর পর বড়জোর ১ হাজার টাকার তেল জুটছে প্রাইভেট-মাইক্রোগুলোর পেটে!
খানিক কাকুতি-মিনতি করে কখনো-সখনো ২/১ লিটার বেশি পাওয়া গেলেও এত মানুষের সামনে অতি প্রয়োজনেও অতটা কাঁচুমাচুই বা হতে পারছেন ক’জন?
বলছি মহাখালী পার হয়ে জাহাঙ্গীর গেট থেকে বিজয় সরণিতে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার গল্প!
মঙ্গলবার দিবাগত রাত। হাত ঘড়ির ক্লান্ত ১২টার কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে রাত তখন ২টা ১০। অফিসের পাশের কুড়িল বিশ্বরোডের পাম্পে ব্যর্থ হয়ে কি যেন ভাবতে ভাবতে আনমনেই ছুটছিলাম নিদ্রাপুরীর পথে।
জাহাঙ্গীর গেট আসতেই দেখলাম সেই লম্বা লাইন। গড়াতে গড়াতে দাঁড়িয়ে গেলাম আমিও। একেবারে শেষজনের পেছনে। লাইনের শেষ কোথায় বুঝতে পারলেও ভিড়ের টিকিটা দেখতে পাচ্ছিলাম না। বাইক স্ট্যান্ড করে দেখার চেষ্টা করলাম শেষটা। মাথা আর মোটরসাইকেল; এর বাইরে কিছু নেই! -69b2e6c380617.jpg)
হঠাৎ চোখে ভেসে উঠল ভুলে যাওয়া সেই করোনার দিনগুলোর জ্বালা! গোটা দুয়েক ওষুধ কেনার জন্যও জেলের কয়েদির মতো বৃত্তবন্দি হতে হতো। যেন পিথাগোরাসের মার্শাল ল’ চলছে ফার্মেসির পিচঢালা রাস্তায়। মুখে মাস্ক; হাতে পলিথিন গ্লাভস। রেললাইনের ঐতিহাসিক দূরত্বে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতাম একপাতা ওষুধের আশায়! গায়ে গা লাগা দূরের কথা; বাঁ পাশের নিঃশ্বাস থেকেও দূরে থাকত ডানের ভদ্রলোক! ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে হঠাৎ ব্রাহ্মণ হয়ে ওঠার সে কি জ্বালা তখন আমাদের!
সুখের কথা হলো; এবেলায় আবার ওসব নাই। লম্বা লাইন। ১/২ কিলোমিটার তো বটেই। কোথাও আবার ৩/৪ কিলোমিটারও ছাড়িয়ে যাচ্ছে কখনও কখনও। জাত-পাতের বৈষম্য নেই। ধনী-গরিব সবাই আমরা মিলেমিশে একাকার। রংচটা কমদামি মোটরসাইকেলটাও চাকায় চাকা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনের পঙ্খীরাজের পেছনে!
দূর থেকে দেখলে আকালের দিনের রেশনের লাইনের চেয়েও কম কিছু নয়! গিজিগিজে ভিড়। শুধু গাড়ি আর গাড়ি। যতদূর চোখ যায়, ততদূর গাড়ি! ঘন্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছে গাড়ির মালিক-চালকরা! কাঁচা বয়স, মাঝবয়সি, যুবক... কত মানুষ এই শেষ রাতের লাইনে। ঘুম তাড়িয়ে নির্ঘুম অপেক্ষা। চোখেমুখে সারাদিনের ক্লান্তি। মাথার ভেতর ভনভন করছে সকালের অফিস; সেহরির আগে ঘরে ফেরার উদ্বেগ।
একটু সাহেবি ভাড়াটিয়াদের আবার আরেক চিন্তা! কাঁচা ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হবে দারোয়ানকে। মাত্র ২০০ টাকার তেলের জন্য ৩/৪ ঘণ্টা ঠ্যাং ভেঙে দাঁড়িয়ে থাকার ঘরের দরজায় আরেক বিড়ম্বনা! তার ওপর সারাদিনের ক্লান্তি!
গত কয়েকদিন ধরে এই নতুন রুটিনেই চলছে ঢাকা। স্বস্তিটা হলো, পাম্পগুলোতে টিসিবির লাইনের মতো হামলে পড়ার সেই অসহায়ত্বটা এখনও আসেনি! তবে ঈদযাত্রায় ঢাকার পেট্রল পাম্পগুলোর হাল ট্রেনের বেহাল ছাদের চেহারা পাবে কিনা, সে কল্পনায় এখন না যাওয়াই শ্রেয়।
ট্রাস্ট ফিলিং বরাবর দুই সারি। ফুটপাত ছুঁয়ে প্রধানমন্ত্রীর আলিশান অফিস দেখতে দেখতে থেমে থেমে এগোচ্ছে চার চাকাগুলো। পাশের সারিতেই দু’চাকার লম্বা মিছিল। একেকজন একেক তালে। কেউ একা। কেউ সবান্ধব। কারো সঙ্গে প্রিয়জন। কেউ গালে হাত দিয়ে বসে আছে বাইকে। চোখে মুখে অপেক্ষার বিরক্তি। কেউ ভিডিওকলে সময় কাটাচ্ছে ঘরণীর সঙ্গে।
মাঝে মাঝে দক্ষ ক্যামেরাম্যানের মতো ফোনটা দু’হাতে উচু করে ধরে পৃথিবীর নতুন আশ্চর্য দেখাচ্ছেন পরিবারকে। কেউ শুনছেন হারানো দিনের গান। কেউ আবার মুখ গুজে মোবাইল খুটছেন একমনে। কি-ই বা করার আছে মোবাইল ছাড়া এই নিরুপায় রাতে!
সামনে প্রায় দুই কি.মি. পথ। কেউ আবার হাঁটতে হাঁটতে কথা বলছে ফোনে। তবে নিজের গাড়ি ছেড়ে খুব দূরে কাউকে যেতে দেখলাম না৷ কিন্তু কেন? শুধুই কি সিরিয়াল হারানোর ভয়ে?
কারণটা খুঁজতেই জট খুলল সেই গোপন রহস্যের। ১০ মিনিট সামনে গিয়ে ফেরার পথেই পড়লাম গোলকধাঁধায়। সারি সারি বাইক। মাথার পর মাথা। নিয়ন বাতির আবছা আলোয় রেখে যাওয়া নিজের বাইকটায় খুজে পাওয়া দায়!ভিড়ের ভেতর তালগোল পাকিয়ে যায়!
লাইন এগোচ্ছিল ১০/১৫ মিনিট পরপর। সিরিয়ালে টান পড়তেই সবাই সজাগ। যার যার গাড়ি ঠেলা শুরু। পিএম অফিসের সামনে যখন এলাম, রাত তখন সাড়ে তিনটার ঘরে। আমার মতো বাকিদেরও এতক্ষণে সয়ে গেছে অপেক্ষার জ্বালা।
পাশের গাড়িগুলোর ভেতরেও স্মার্টফোনের আলো। সময় কাটছে ইউটিউবে। কেউ এক ধ্যানে গেমসে। নেমে আরেক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলছে কেউ। কেউ আবার গাড়ি দরজায় হেলান দিয়ে হাওয়ায় উড়াচ্ছেন অবসাদের ধোঁয়া।
তাদেরই একজনের মুখে শুনলাম, হেমায়েতপুর থেকে এসে দাঁড়িয়েছেন লাইনে। গাবতলীর পাম্পেও তেল পাননি। এখানে ১ হাজার টাকার নিয়েছেন রাত ২টায়। ফিরে এসে আবার দাঁড়িয়েছেন লাইনের শেষে। মাইক্রো-প্রাইভেটে এর বেশি দিচ্ছে না।
এক ট্রাকচালক বললেন, ৪০ লিটার নেওয়ার ইচ্ছা তার। ১টায় এসে মিশেছেন লাইনে। চোখেমুখে আগুনের ফুলকি। ‘হা... পু... এসি রুমে বসে বসে আছে। হা...গোরে লা...ইতে লা...ইতে আমগোর মতো লাইনে দাঁড় করায় রাহন দরকার।’
কাউকেই যেচে প্রশ্ন করার মতো নেই। পাংশু/শুকনো চেহারায় প্রচ্ছন্ন বিরক্তি। দেখে মনে হচ্ছে স্বাভাবিক; মুখ খুললেই ফুটছে।
দু-চারটে কথা বলে জিজ্ঞেস করতেই মতিন নামের পঁচিশোর্ধ্ব এক যুবক বললেন, সন্ধ্যা থেকে আমি কু...র মতো ঘুরছি। বাড়ি আব্দুল্লাহপুর। সেখানকার এক পাম্পে বাইকে মাত্র ২৫০ টাকার তেল দিচ্ছে। তাও আবার ৪০ মিনিট পর। তেল নিয়ে টান দিলাম উত্তরায়। ৩/৪টা পাম্প ঘুরলাম, বন্ধ। খবর পেলাম আর্মিদের এই পাম্পই নাকি সবচেয়ে বেশি তেল দিচ্ছে। ৬০০ টাকার। ২৪ ঘন্টায় এখানে দিচ্ছে। অন্যদের মতো ২/৩ ঘন্টা দিয়ে লাইনে লোক থাকতেই মুখের সামনে সপাং করে দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে না।
মাথায় টুপি, পাঞ্জাবি-পাজামা পরা আরেক হুজুর বললেন, আমি রামপুরা থেকে এসেছি তেল নিতে। প্রথমে গিয়েছিলাম মতিঝিলে। ২/৩টাতে ঢুঁ মারলাম, বন্ধ। শেষ পর্যন্ত এখানে এসে পেলাম।
আমার থেকে ২০/২৫ জন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মোটাসোটা গোছের ভদ্রলোক সেলিম খানেরও একই ভোগান্তি। সাতরাস্তার সিটি পাম্প তেল দিচ্ছে না। তেজগাঁওয়ের কোনো পাম্পেও তেল পাননি। মহাখালীর পাম্প বন্ধ পেয়েছেন। শেষমেশ এখানে।
পিএম অফিসের শেষ কোনায় এসেই নজর পড়ল রাজবাড়ী অতন্দ্রপ্রহরী সেনা-পুলিশ পোস্টে। অবাক চোখে দেখছেন। আপাদমস্তক পরখ করছেন লাইনের সবার। মনে হলো এত দিনের নিঃসঙ্গ পাহারায় হঠাৎ সঙ্গীসমুদ্র পেয়ে নিশিরাতের অসহ্য একাকিত্বটুকু অন্তত তাদের কাটছে।
দুই বন্ধুকে দেখলাম মোহাম্মদপুর থেকে এসেছে তেল নিতে। দাঁড়িয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে সমবয়সি ৩/৪ জনের সঙ্গে। দুখীরা সব এক হলে সুখের পালা গায়। গাও-গেরামের মুখে শোনা কথাটার আজ ষোলো আনায় বুঝলাম এদের দেখে।
প্রতীক্ষার এ লাইন ঘিরে জমে উঠেছে পান সিগারেটের ভ্রাম্যমাণ ব্যাবসাও। গলায় দোকান ঝুলিয়ে হেঁটে হেঁটে রাউন্ড দিচ্ছেন এ মাথা থেকে শেষ মাথা। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। নাখাল পাড়ার গলিটা পার হয়ে অতিরিক্ত প্রকৌশলীর কাছারির সামনের ফুটপাতে দোকান সাজিয়েছে দুই কিশোর আসাদ আর ইব্রাহিম।
সিগারেটের সঙ্গে আবার চা-ও আছে এখানে। ভীষণ ব্যস্ত। হাত চলছে ঝড়ের বেগে। কথা বলার ফুরসত নেই। দ্বিধা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করতেই বলল, এখানে এখন রাত-দিন নেই। সবসময়ই মানুষ। বেলা ৩টায় বসি আমরা। উঠি সেহরির আগে। গত তিনদিন ধরে বসছে তারা। গড়ে ৪/৫ হাজার করে বিক্রি হচ্ছে প্রতিদিন। ওখানে দাঁড়িয়েও সময় কাটাচ্ছে অনেকে। কিছু তরুণ-তরুণীও জুটছে সেই দলে।
খানিক দূরেই দেখলাম, প্রিয়জনের ঘাড়ে হাত রেখে কী যেন দেখছে দুজনে। আর খুনসুটি করছে। দামি হেলমেট চুরি হয়ে যাবে ভেবে হাতে নিয়েই টহল শুরু করছে পাম্পের সীমান্ত বরাবর। হয়ত বিড়বিড় করে গাইছে, আর কতদূর পাঞ্জেরি। আর কত দিন?
অবশেষে ধরা দিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মাঝরাত ডুবে তখন সেহরির ওয়াক্ত। ঘুরতে ঘুরতে ঘড়ির কাঁটাও ভোরের রথে। ঠিক ৪টা ১০ মিনিটে এলাম সেই সোনার খনির দরজায়। একসঙ্গে ৬ জন করে ঢোকায় সীমানার ভেতরে। সেখানেও দেখি আরেক জাহাঙ্গীর গেট। প্রায় ২০টা বাইক। আরেকপাশে চারচাকার পথ। আরও অন্তত মিনিট পনেরোর বিড়ম্বনা। তবু খুশি সবাই। চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক।
আমার পেছনের জন বলছে, তবু ভালো ভাই; দিনের টাক ফাটা (উনার মাথা চুল কম ছিল) রোদে গা পোড়ানোর চেয়ে রাতে ঠান্ডায় ঠান্ডায় তেল নিয়ে গেলাম আরামছে। গাড়ির ধোঁয়া-ধুলোও খেতে হলো না।
রহমান ভাই বললেন, দিনের বেলা ৪/৫ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপরও তেল পাওয়া যাচ্ছে না!
বললাম, ঈদের পর যদি তেল না পান তো কী করবেন? সবার যা গতি আমারও তাই! বাইকই আর বের করব না। শা...র (হাসতে হাসতে) এই তেলের লাইনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে জীবনটাই তেজপাতা হয়ে গেল!
লেখক: সাংবাদিক, যুগান্তর

