কূটনৈতিক মিশনে হুমকি: বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্টের অপচেষ্টা
Advertisement
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও তুরস্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের কূটনৈতিক মিশন এবং সরকারি দফতরগুলোতে ই-মেইলের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি, অর্থ না দিলে ভয়াবহ হামলার হুমকি এবং একই ধরনের ভাষা ব্যবহারের ঘটনাগুলোকে কেবল সাধারণ সাইবার অপরাধ বা বিচ্ছিন্ন চাঁদাবাজি হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
এই অপরাধের অন্তরালে যে বিশাল ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার প্রয়াস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার সংঘবদ্ধ তৎপরতা কাজ করছে, তা উন্মোচন করা আজকের দিনের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা।
এই পুরো ঘটনার যে দিকটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের, তা হলো এর সময়কাল এবং এর পেছনে সক্রিয় রাজনৈতিক বয়ানের নিখুঁত মিল। যখন বাংলাদেশ তার অতীতের স্বৈরাচারী শাসনের কালো ছায়া ফেলে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পদার্পণ করছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করার এই অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। এই চক্রান্তের মূলে রয়েছে ভারত এবং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বহু পুরনো ও বহু-ব্যবহৃত উগ্রবাদের বয়ান পুনরুজ্জীবিত করার অপচেষ্টা।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল জঙ্গিবাদের ভয় দেখিয়ে সুবিধা আদায় করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমা মাধ্যম ও ভারতের কাছে শেখ হাসিনা নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যে, তিনি না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামি উগ্রবাদের ভয়াবহ উত্থান ঘটবে এবং পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। এই কল্পিত ভীতি বা ন্যারেটিভের ওপর ভর করেই তিনি দেশে একের পর এক অগণতান্ত্রিক নির্বাচন পরিচালনা করেছেন, রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করেছেন, গুম-খুন চালিয়েছেন এবং দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্বকে প্রতিবেশী ভারতের হাতে কার্যত তুলে দিয়েছেন।
ক্ষমতাচ্যুতির পরও সেই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত তীব্রভাবে দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি এবং পরবর্তীতে ১৮ আগস্ট ভারতের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য পাইওনিয়ার’-এ প্রকাশিত নিবন্ধে শেখ হাসিনা যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন, তা তাঁর সেই পুরনো কৌশলেরই ধারাবাহিকতা। সেখানে তিনি বাংলাদেশকে একটি গভীর সংকটগ্রস্ত, উগ্রবাদকবলিত এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন।
যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে এসব অনুষ্ঠানে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, কিন্তু দিল্লির মাটি ব্যবহার করে একজন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারীকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর সুযোগ দেওয়া এবং সেই বয়ানকে ভারতীয় গণমাধ্যমে দিনরাত প্রচার করা প্রমাণ করে যে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়, বরং এটি ভারত ও শেখ হাসিনার একটি যৌথ কৌশলগত চিত্রনাট্য।
ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, এই চক্রান্তের শিকড় কত গভীরে বিস্তৃত। ৫ আগস্ট ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সাবেক পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনা যে মনগড়া গল্প ফাঁদলেন, ঠিক কয়েক দিনের মাথায় ১৮ আগস্ট ‘দ্য পাইওনিয়ার’-এর নিবন্ধে সেই একই উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের জিকির পুনরায় তোলা হলো। এরপরের ধাপে বাংলাদেশে তাদের দোসর এবং সমভাবাপন্ন কিছু গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে জঙ্গিবাদের কাল্পনিক হুমকি নিয়ে বিশ্লেষণ ও সংবাদ পরিবেশন শুরু হয়। আর এর চূড়ান্ত ও সর্বশেষ টার্গেট হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ঢাকাস্থ কূটনৈতিক মহলকে।
উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার—তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন একটি কৃত্রিম আলোড়ন ও ভীতিকর আবহ তৈরি করতে চাইছে, যাতে বিশ্ব সম্প্রদায় বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে, শেখ হাসিনা এবং তাঁর ভারতীয় সহযোগীরা এতদিন ধরে বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান নিয়ে যে তথ্য অপপ্রচার করে আসছিল, সেটাই যেন সত্য। অর্থাৎ নিজেদের সাজানো বয়ান প্রতিষ্ঠা করাই এই চক্রের একমাত্র এজেন্ডা।
গত সাড়ে ১৫টি বছর ধরে শেখ হাসিনা, ভারত এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) এই কাল্পনিক জুজুর ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশে একচ্ছত্র ফ্যাসিবাদ কায়েম রেখেছিল। একটি অবাস্তব বা সাজানো গল্পকে কীভাবে পেশাদার কায়দায় আন্তর্জাতিক অপরাধের রূপ দিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিশ্বমঞ্চকে বিভ্রান্ত করা যায়, এই ধরনের প্রোপাগান্ডা কৌশলে তারা অত্যন্ত পারদর্শী।
তবে চক্রান্তকারীরা যত চতুরই হোক না কেন, তাদের পাতানো এই ফাঁদের অসারতা উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল তদন্তে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেছিলাম ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলামকে। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দূতাবাসগুলোতে ই-মেইলে হুমকির বিষয়টিকে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখেছে। হুমকি বার্তায় যে বিকাশ নম্বরগুলো দেওয়া হয়েছিল, তার মালিকদের পুলিশ ইতোমধ্যে শনাক্ত করেছে এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছে।
গোয়েন্দা প্রধানের অনুসন্ধানে যে সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা রীতিমতো চোখ খুলে দেওয়ার মতো—যাদের বিকাশ নম্বর হুমকি বার্তায় ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের অনেকের বাস্তবে কোনো বিকাশ অ্যাকাউন্টই নেই! তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এতটাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ যে, ই-মেইল জিনিসটি ঠিক কী, তা-ও তারা জানে না। ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলামের এই নিরপেক্ষ ও পেশাদার তথ্য বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, এটি স্রেফ একটি সাজানো চিত্রনাট্য।
সুতরাং এখানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মিশন বা তাদের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা বাস্তবে কোনো ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। এটি নিছকই বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং সাধারণ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে।
এখানে একটি প্রশাসনিক সত্য ও পেশাদারিত্বের প্রশংসা না করলেই নয়। ডিএমপি কমিশনার মোসলে উদ্দিন আহমেদ এবং গোয়েন্দা শাখা প্রধান শফিকুল ইসলাম পদে যোগদানের পর থেকে অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের কঠোর তদারকি ও নজরদারির কারণে অপরাধী ও চক্রান্তকারী চক্র মাঠ পর্যায়ে প্রত্যক্ষ কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ভার্চুয়াল সাইবার মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রজ্ঞা ও তৎপরতায় সেখানেও তারা হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ডিবির প্রাথমিক তদন্তেই আন্তর্জাতিক দরবারে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এটি পরাজিত স্বৈরাচারী গোষ্ঠী ও তাদের বিদেশি মিত্রদের এক হীন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।
এদিকে কূটনৈতিক মিশনগুলোতে পাঠানো ই-মেইলে ১০ বিলিয়ন টাকা চাঁদা দাবি করার যে তথ্য এসেছে, তা গাণিতিক ও বাস্তবতার নিরিখেও চরম হাস্যকর। বিকাশ বা নগদের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সেবার প্রতিদিনের লেনদেনের যে আইনি সীমা রয়েছে, তাতে এই ১০ বিলিয়ন টাকা তুলতে কয়েক দশক সময় লেগে যাওয়ার কথা। তাছাড়া বার্তায় দাবিকৃত অর্থ এবং মুদ্রার নাম বারবার পরিবর্তন করার যে অসঙ্গতি দেখা গেছে, তা কোনো পেশাদার অপরাধী চক্রের আর্থিক চাঁদাবাজির চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে।
প্রকৃত বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যাবে, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। বিশ্বশক্তির কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দেশগুলোতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মল বা পাবলিক স্থানে বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে। সেই বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণের চিত্র যথেষ্ট সন্তোষজনক ও শক্তিশালী।
প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বাংলাদেশে উগ্রবাদী তৎপরতা কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সুতরাং বিচ্ছিন্ন সাইবার বার্তা বা ষড়যন্ত্রমূলক ই-মেইলকে ভিত্তি করে পুরো বাংলাদেশকে উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার যে চেষ্টা ভারত ও শেখ হাসিনা চালিয়ে যাচ্ছেন, তা বাস্তবতার চরম বিকৃতি।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতির এক বিরাট কৌশলগত দেউলিয়াত্ব ও ভুল উন্মোচিত হয়। এখানে অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশ ও ভারতের ভূ-রাজনৈতিক, ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক মেলবন্ধন ঐতিহাসিক। একটি স্থিতিশীল, সুসংহত ও স্বাধীন বাংলাদেশ ভারতের নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য। কিন্তু নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল হলো, তারা ১৬ কোটি মানুষের একটি রাষ্ট্রকে না দেখে কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল এবং শেখ হাসিনা নামক একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেছে।
এখানে আমি মনে করি, ভারতের জন্য এখন একটি ঐতিহাসিক আত্মউপলব্ধির সময় এসেছে। নয়াদিল্লিকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশ কোনো একক ব্যক্তি বা পরাশক্তির পৈতৃক সম্পত্তি নয়, এটি একটি সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ জাতিরাষ্ট্র। বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে তোয়াক্কা না করে পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে পুনর্বাসনের দালালি করা কিংবা তাঁর সাজানো মিথ্যা বয়ানকে ইন্ধন দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম ক্ষতিসাধন করবে। বাংলাদেশে যদি ভারতের কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকেই থাকে, তবে বিচ্ছিন্ন চক্রান্তে ইন্ধন না দিয়ে তাদের উচিত বাংলাদেশের অফিসিয়াল নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরাসরি তথ্য বিনিময় করা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যখন এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও অপপ্রচারের কৌশল নেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও নিজস্ব আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, কৌশলগত প্রশিক্ষণ এবং শক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে নতুন ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য আনতে পারে।
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে বহুমাত্রিক এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো কৌশলগত জোটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততার বিষয়টি ভারতের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন কোনো পদক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশকে একক দেশের ব্ল্যাকমেইল থেকে মুক্ত রেখে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সমমর্যাদা ও ‘রেসিপ্রোসিটি’র ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করাই হবে বাংলাদেশের মূল শক্তি।
সুতরাং এই কৃত্রিম সাইবার ও কূটনৈতিক চক্রান্তের মোকাবিলায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে এখন দ্বিধাগ্রস্ত না হয়ে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক গোষ্ঠীর ওপর আগাম দায় না চাপিয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক, ই-মেইল হেডার বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ দমন সংস্থার সহায়তায় এই সাজানো চক্রান্তের নেপথ্যে থাকা মূল নির্দেশদাতাদের বৈশ্বিক রূপ উন্মোচন করতে হবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক পাড়া (গুলশান-বারিধারা) এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে দৃশ্যমান ও নিশ্ছিদ্র রাখতে হবে, যাতে বিদেশি কূটনীতিকদের মনে কোনো সংশয় না থাকে।
একই সঙ্গে শেখ হাসিনা ও ভারতীয় মিডিয়ার কুৎসিত অপপ্রচারের জবাবে আবেগভিত্তিক প্রতিক্রিয়া না দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, ডিবির তদন্ত প্রতিবেদন এবং বাস্তব পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও ডিপ্লোম্যাটিক কোরের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় গণমাধ্যমেরও গুরুদায়িত্ব রয়েছে। ই-মেইল বা হুমকি বার্তায় কোনো নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠনের নাম উল্লেখ থাকলেই সেটিকে চটকদার শিরোনামে ‘জঙ্গিদের হুমকি’ হিসেবে প্রচার করা যাবে না; বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে লিখতে হবে ‘উগ্রবাদী সংগঠনের নাম ব্যবহার করে অপপ্রচারের চেষ্টা’। এই ভাষাগত সূক্ষ্ম পার্থক্য আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ভাবমূর্তি রক্ষায় বিশাল ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশকে দুর্বল ও অস্থিতিশীল করার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয় তখনই, যখন আমরা প্রমাণের বদলে গুজবকে এবং রাষ্ট্রীয় কৌশলের বদলে আবেগকে প্রাধান্য দিই। ভারত এবং শেখ হাসিনার পুরনো ‘জঙ্গিবাদের জুজু’ সংক্রান্ত অপপ্রচার বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে না। বাংলাদেশ একটি স্বাবলম্বী, দায়িত্বশীল এবং আত্মমর্যাদাপূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সম্মান রক্ষা করতে হলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখতে হবে, অন্যদিকে তেমনি ভারত-হাসিনা অক্ষের ভুয়া রাজনৈতিক বয়ানের বিরুদ্ধে প্রজ্ঞাপূর্ণ কূটনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত ভারতের একপাক্ষিক ও আগ্রাসী নীতি থেকে বেরিয়ে এসে নয়াদিল্লির উচিত বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বাধীন সত্তাকে সম্মান জানানো। আর বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রধান দায়িত্ব একটাই—সাইবার ব্ল্যাকমেইলে জড়িত চক্রান্তকারীদের মুখোশ আন্তর্জাতিক দরবারে পুরোপুরি উন্মোচন করা এবং বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া যে, বাংলাদেশ কোনো পতিত স্বৈরাচারের সাজানো গল্পের শিকার হওয়ার মতো অকার্যকর রাষ্ট্র নয়; বাংলাদেশ তার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সম্পূর্ণ সক্ষম একটি বীরের জাতি। সুতরাং কোনো ষড়যন্ত্রই বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক ও মধ্যপন্থী মুসলিম রাষ্ট্রের পরিচয় থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
