Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

‘বাংলাদেশপন্থা’ ও জাতীয় ঐক্যের দর্শন: বিএনপির গৌরবোজ্জ্বল পথচলা

Advertisement

Icon

মাহবুব নাহিদ

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

‘বাংলাদেশপন্থা’ ও জাতীয় ঐক্যের দর্শন: বিএনপির গৌরবোজ্জ্বল পথচলা

Advertisement

একটি জাতির ইতিহাসে কিছু আন্দোলন, কিছু রাজনৈতিক দর্শন ও কিছু কালজয়ী মহৎ ব্যক্তিত্ব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই যখনই কোনো গভীর সংকট কিংবা স্বৈরাচারের তমসায় দেশ আচ্ছন্ন হয়েছে, তখনই জাতীয়তাবাদী আদর্শের অদম্য শক্তি মানুষকে আলোর দিশা দেখিয়েছে। আজ পয়লা সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের গণমানুষের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। 

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক শুভলগ্নে দাঁড়িয়ে এটি কেবল উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দলের ইতিহাস, স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ রক্তস্নাত সংগ্রাম, ত্যাগের সুগভীর ব্যাপ্তি, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার মহাসোপানে এগিয়ে যাওয়ার অবারিত যাত্রা এবং জাতীয় ঐক্যের যে ‘বাংলাদেশপন্থা’ দর্শনে দলটি গঠিত হয়েছিল, সেই দর্শনের দিকে ফিরে তাকানো আজ অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, মানবিকতা, সাম্য এবং একটি সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঐতিহাসিক বিপ্লব ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে যে দর্শনের ওপর ভিত্তি করে এ দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন মত, পথ, আদর্শ ও বিশ্বাসের মানুষকে এক ছাতার নিচে এনে দেশকে একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে রূপান্তর করা। 

এই রাজনৈতিক দর্শনের প্রধান ভিত্তিই হলো ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা।

শহীদ জিয়া ভাষাভিত্তিক, গোত্রভিত্তিক কিংবা অঞ্চলভিত্তিক সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে একীভূত করেছিলেন। যে মানচিত্রের জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, সেই মানচিত্রের প্রতিটি মানুষকে এক সূত্রে গেঁথে তিনি এক অনন্য দর্শনের জন্ম দেন; আর সেই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় বিএনপি। 

বিএনপি সবসময় বিশ্বাস করে গণমানুষের অধিকারের রাজনীতিতে, যেখানে কোনো কৃত্রিমতা, ভেদাভেদ বা বিভাজন নয়, বরং প্রাধান্য পায় অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে ‘বাংলাদেশপন্থা’।

দলের রাজনৈতিক আদর্শের দ্বার মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর উন্মুক্ত। প্রথমত, গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারে অবিচল বিশ্বাস; এবং দ্বিতীয়ত, দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করা। যারা একনায়কতন্ত্র কিংবা ফ্যাসিবাদের বিপরীতে এই দুটি মৌলিক আদর্শে বিশ্বাস করেন, তাদের সবার জন্যই বিএনপিতে রয়েছে অবারিত স্থান। 

ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭২-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে যখন বাকশালের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করে দেশজুড়ে এক রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করা হয়েছিল, তখন শহীদ জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটেছিল। তবে গণতন্ত্রের এই পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না; একে বারবার হত্যা ও সংকুচিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। আর যতবার গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়েছে, ততবারই বিএনপি ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

পরবর্তীকালে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন সমগ্র জাতির সাহসের এক অনন্য বাতিঘর। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বার্থে দেশের সর্বস্তরের মানুষ তাঁর আপসহীন নেতৃত্বকে ধারণ করে রাজপথে নেমে এসেছিল। 

দেশনেত্রীর সেই অদম্য সংগ্রামের ইতিহাস কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এক দিনে ৩০টিরও বেশি পথসভা করা, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সমগ্র দেশ চষে বেড়ানো এবং স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে গণতন্ত্রের পতাকা সমুন্নত রাখার নজির বিশ্বরাজনীতিতে বিরল।

ওয়ান-ইলেভেনের চরম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, শারীরিক নির্যাতন, উন্নত চিকিৎসার সুযোগবঞ্চিত বন্দিজীবন কিংবা একের পর এক প্রহসনমূলক মামলা দিয়ে তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরানোর চেষ্টার পরও তিনি একচুলও নতি স্বীকার করেননি। 

দেশনেত্রীর সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক আহ্বান আজও জাতীয়তাবাদী দর্শনের পথপ্রদর্শক—‘ধ্বংস নয়, প্রতিহিংসা নয়, প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা আর শান্তি দিয়েই আমরা দেশ গড়ব।’

বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্ধকার অধ্যায়ে বিএনপি ও তার নেতাকর্মীদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে এক নজিরবিহীন তাণ্ডব। ৬০ লাখেরও বেশি মিথ্যা ও রাজনৈতিক মামলা, হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও রাতের আঁধারে ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। 

লাখ লাখ নেতাকর্মী ঘরবাড়ি ছাড়া হয়ে বছরের পর বছর ফেরারি জীবনযাপন করেছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন এবং দীর্ঘদিন কারাবাস ভোগ করেছেন। রাজপথে রক্ত ঝরেছে অজস্র স্বাধীনতাকামী তরুণের।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর চালানো হয়েছে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে তাকে নির্বাসিত থাকতে হয়েছে। কিন্তু শত ষড়যন্ত্র, দমন-পীড়ন আর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের পরও বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি; বরং এই দল ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো বারবার জেগে উঠেছে গণমানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অদম্য সমর্থনে।

একই ধারাবাহিকতায় রক্তস্নাত ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াইয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সর্বকালের সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য। ‘ফ্যাসিবাদ বনাম বাংলাদেশ’—এই ঐতিহাসিক মেরুকরণে পুরো জাতিকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয়ের মোহনায় নিয়ে যান। 

আধুনিক প্রযুক্তি ও দূরদর্শী চিন্তাধারার মাধ্যমে সুদূর প্রবাসে থেকেও তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি তৃণমূল নেতাকর্মীকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছিলেন। তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে যে, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই স্মরণীয় দিনে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, বিএনপির রাজনীতি প্রতিহিংসা বা পেশিশক্তির রাজনীতি নয়; বরং তা সম্পূর্ণরূপে আইনের শাসন ও মানবিক মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নীতিতে এ দল কখনোই বিশ্বাসী নয়। 

প্রতিটি অপরাধের নিরপেক্ষ ও প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করাই জাতীয়তাবাদী দর্শনের মূল অঙ্গীকার।

স্বৈরাচারী শাসনের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপি কোনো সংকীর্ণ দলীয় গণ্ডির রাজনীতি করতে চায় না; বরং পারস্পরিক সহাবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণই এই দর্শনের চূড়ান্ত ভিত্তি।

আজকের এই ক্ষণ আমাদের পুনর্জন্ম, ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের এক ঐতিহাসিক স্মারক। শহীদ জিয়ার প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশপন্থা’, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন গণতান্ত্রিক লড়াই এবং তারেক রহমানের আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্যের দর্শনে বলীয়ান হয়ে বিএনপি আজ নতুন উদ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।

তারুণ্যের অমিত শক্তি এবং জনগণের রায়কে পাথেয় করে আগামী দিনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, মেধাভিত্তিক, মানবিক ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আজকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল দীপ্ত শপথ। 

সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে এক নতুন ভোরের প্রত্যাশায় জাতীয়তাবাদী শক্তির এই ঐতিহাসিক পথচলা চির অম্লান হোক।

মাহবুব নাহিদ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

আ.লীগ ও গুপ্তদের বিরুদ্ধে সতর্ক হোন

অধ্যাপক নার্গিস আ.লীগ ও গুপ্তদের বিরুদ্ধে সতর্ক হোন

বিএনপির বিতর্কিত নেতাকর্মীদের তালিকা হচ্ছে

বিএনপির বিতর্কিত নেতাকর্মীদের তালিকা হচ্ছে

৮ উপজেলায় প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির ‘সার্চ কমিটি’

চট্টগ্রাম দক্ষিণে ইউপি নির্বাচন ৮ উপজেলায় প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপির ‘সার্চ কমিটি’

মিষ্টির রাজনৈতিক উত্থান যেভাবে

মিষ্টির রাজনৈতিক উত্থান যেভাবে

আ.লীগ নেতাকে কারামুক্ত করতে প্রত্যয়ন বিএনপি নেতাদের

আ.লীগ নেতাকে কারামুক্ত করতে প্রত্যয়ন বিএনপি নেতাদের

কপাল পুড়ল টুঙ্গিপাড়া বিএনপি নেতার

কপাল পুড়ল টুঙ্গিপাড়া বিএনপি নেতার

আরও পড়ুন

লোহা নয়, প্রযুক্তি ও মেধা কিনতে হবে

লোহা নয়, প্রযুক্তি ও মেধা কিনতে হবে

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম