স্ক্রিনের আড়ালে কিশোর অপরাধ: ডিজিটাল আসক্তি থেকে মাঠের সহিংসতা
Advertisement
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
ছবি-এআই সম্পাদিত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের কিশোর সমাজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের একটি বড় অংশ ইতিবাচক। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একজন কিশোরকে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত করছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যখন পারিবারিক নজরদারি, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্মমুখী জীবনের বাইরে চলে যায়, তখন সেটিই কিশোরের জন্য বিপজ্জনক পথের দরজা খুলে দিতে পারে।
কিশোর অপরাধের কারণ তাই শুধু মাদক, দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি কিংবা খারাপ বন্ধুত্বের মধ্যে খুঁজলে চলবে না। বর্তমান সময়ে আমাদের দেখতে হবে আরও একটি শক্তিশালী বাস্তবতা—ডিজিটাল পর্দা কীভাবে কিশোরের চিন্তা, বন্ধুত্ব, বিনোদন, অর্থ উপার্জন এবং কখনো কখনো অপরাধের জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে বদলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল বিস্তারের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হিসাবে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল প্রায় ১৩ কোটি ১৪ লাখ এবং মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক ছিল ১১ কোটি ৬৪ লাখের বেশি। একই সময়ে মোট মোবাইল গ্রাহক ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৭ লাখ। জুলাই ২০২৬-এ মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা আরও বেড়ে ১২ কোটি ১৫ লাখের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ ইন্টারনেট এখন শহরের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রাম, উপজেলা, হাটবাজার এবং সাধারণ পরিবারের মধ্যেও পৌঁছে গেছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—একজন কিশোরের হাতে এখন এমন একটি যন্ত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে সে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের তথ্য, ছবি, ভিডিও, বিনোদন এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সে কী দেখছে এবং কার কাছ থেকে শিখছে?
এখানেই আমাদের উদ্বেগ।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। গ্রামের একটি পরিবারে বাবা হয়তো দিনমজুর, কৃষক, অটোরিকশাচালক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মা গৃহিণী অথবা তিনিও কোনো শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত। সন্তানটি হয়তো অষ্টম, নবম বা দশম শ্রেণিতে পড়ে। কোনো কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। সকালে কয়েক ঘণ্টা অটোরিকশা চালায়, দোকানে কাজ করে অথবা বেকার অবস্থায় বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরে। হাতে একটি পুরোনো স্মার্টফোন। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, সন্তানটি শুধু ফেসবুক বা ইউটিউব দেখছে।
কিন্তু সেই ছোট পর্দার ভেতরে কী ঘটছে, পরিবার অনেক সময় তা জানে না।
একজন কিশোর দিনের পর দিন এমন ভিডিও দেখতে পারে যেখানে মারামারি, প্রতিশোধ, অস্ত্র প্রদর্শন, অপরাধী জীবনযাপন, যৌনতা, অশালীনতা কিংবা অন্যকে অপমান করাকে বিনোদনের বিষয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে। সে দেখতে পারে কীভাবে কাউকে দলবদ্ধভাবে মারধর করা হচ্ছে, কীভাবে কাউকে ভয় দেখানো হচ্ছে, কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে অপমান করা হচ্ছে কিংবা কীভাবে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া যায়।
সমস্যা হলো, কিশোর সব সময় পর্দায় দেখা বিষয়কে পর্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না।
একসময় সে অনুকরণ করতে শুরু করে।
অপরাধবিজ্ঞানের সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব আমাদের বলে, মানুষ শুধু নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখে না; অন্যের আচরণ দেখেও শেখে। কিশোরদের ক্ষেত্রে এই অনুকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক মূল্যবোধ তখনো গঠনের পর্যায়ে থাকে। তাই কোনো অপরাধীকে যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তিশালী, সাহসী বা জনপ্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, একজন অপরিণত কিশোর সেটিকে ভুলভাবে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি অপরাধের মূল কারণ নয়; বরং এটি অপরাধ শেখা, অপরাধী বন্ধুত্ব তৈরি করা এবং অপরাধকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ বাস্তবতায় আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এলাকায় কিশোরদের অবসর কাটানোর জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সীমিত, কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ অপ্রতুল এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কিশোরদের জন্য বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা সব সময় কার্যকর নয়। ফলে দিনের বড় একটি অংশ তারা ব্যয় করে মোবাইল ফোন, চায়ের দোকান, বাজারের আড্ডা অথবা বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরিতে।
বাংলাদেশের ২০২৫ সালের শিশু পরিস্থিতির তথ্যেও শিক্ষাব্যবস্থার এই চাপ স্পষ্ট। নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির সামঞ্জস্যপূর্ণ হার ৬০.১ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্র ৫০.৮ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক বয়সী শিশুদের বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার হার ৩৩.৯ শতাংশ। অর্থাৎ একটি বড় অংশের কিশোর-কিশোরী শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে যুক্ত নয়। একই তথ্য অনুযায়ী ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে হাজার হাজার কিশোরের জীবন, যাদের একটি অংশ প্রতিদিন স্কুলের পরিবর্তে কর্মক্ষেত্র, রাস্তা, বাজার বা ডিজিটাল জগতে বেশি সময় কাটাচ্ছে।
আর এই জায়গাটিই অপরাধী গোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গ্রামের কোনো বাজারে একটি কিশোরকে আমরা হয়তো দেখি অটোরিকশা চালাচ্ছে। তার হাতে প্রতিদিন কিছু নগদ টাকা আসে। সে নিজের জন্য একটি ব্যবহৃত স্মার্টফোন কিনে। বন্ধুদের সঙ্গে একটি দল তৈরি করে। প্রথমে তারা ভিডিও বানায়, পরে স্থানীয় কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে ঠাট্টা করে, এরপর কারও সঙ্গে অনলাইনে ঝামেলা করে। কোনো এক সময় এলাকার বড় ভাই বা প্রভাবশালী কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগ তৈরি হয়।
সেখান থেকেই শুরু হতে পারে অন্য একটি গল্প।
কিশোরদের ব্যবহার করা তুলনামূলক সহজ। তারা কম বয়সী, দ্রুত উত্তেজিত হয়, দলের প্রতি আনুগত্য দেখাতে চায় এবং অনেক সময় পরিণত অপরাধের আইনগত ও সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়রা তাদের দিয়ে ছোটখাটো মারামারি, ভয় দেখানো, প্রতিপক্ষকে অনুসরণ করা, তথ্য সংগ্রহ, মোটরসাইকেল ব্যবহার, মাদক পরিবহন কিংবা ছিনতাইয়ের মতো কাজে যুক্ত করতে পারে।
এখানে কিশোর নিজে শুধু অপরাধী নয়; অনেক সময় সে অন্যের অপরাধের হাতিয়ারও হয়ে ওঠে।
গ্রামীণ সমাজে এই ব্যবস্থাটি আরও সূক্ষ্ম। কোনো কিশোরের হাতে যদি নিজের আয় থাকে, একটি মোটরসাইকেল থাকে, স্মার্টফোন থাকে এবং তার সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু থাকে, তাহলে তার সামাজিক পরিচয় দ্রুত বদলে যেতে পারে। সে হয়তো আগে ছিল ‘অমুকের ছেলে’; পরে হয়ে যায় ‘ওই গ্রুপের ছেলে’। দল তাকে আত্মবিশ্বাস দেয়, আবার একই সঙ্গে দলীয় আনুগত্য তাকে এমন কাজে ঠেলে দিতে পারে, যা একা অবস্থায় সে কখনো করত না।
এটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। পরিবার, বিদ্যালয়, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা এবং ইতিবাচক কর্মজগতের সঙ্গে কিশোরের সম্পর্ক যত দুর্বল হয়, সামাজিক নিয়মের প্রতি তার বাধ্যবাধকতাও তত দুর্বল হতে পারে। বিপরীতে অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হলে সেই দলই তার কাছে নতুন ‘পরিবার’ বা ‘পরিচয়’ হয়ে উঠতে পারে।
আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই দলকে আরও শক্তিশালী করে।
আগে গ্রামের একটি অপরাধী দলের যোগাযোগ সীমাবদ্ধ থাকত কয়েকটি মহল্লা বা বাজারে। এখন একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে কয়েক ডজন কিশোর যুক্ত হতে পারে। একটি উত্তেজনাপূর্ণ পোস্ট কয়েক মিনিটে অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একটি ব্যক্তিগত বিরোধ মুহূর্তে দলগত বিরোধে পরিণত হতে পারে।
বিশেষ করে প্রেমঘটিত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধ, অপমান, অনুসারী বা জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রতিযোগিতা—এসব বিষয় কিশোরদের মধ্যে দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। কখনো সেই উত্তেজনা অনলাইন থেকে অফলাইনে চলে আসে।
একটি মন্তব্য থেকে হুমকি, হুমকি থেকে দলবদ্ধ সংঘর্ষ, সংঘর্ষ থেকে অস্ত্র ব্যবহার—অপরাধের এই ধাপগুলো এখন অনেক দ্রুত অতিক্রম করতে পারে।
আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো ‘ভিউ’ ও জনপ্রিয়তার অর্থনীতি। একজন কিশোর যদি দেখে স্বাভাবিক শিক্ষামূলক ভিডিওর চেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বা বিতর্কিত ভিডিও বেশি মানুষ দেখছে, তখন সে আরও চরম বিষয় তৈরি করতে আগ্রহী হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা তখন তার কাছে সামাজিক স্বীকৃতির বিকল্প হয়ে ওঠে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বিষয় হলো—কিশোর অপরাধের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নয়, সামাজিক বঞ্চনা ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাও কাজ করতে পারে।
যে কিশোর বিদ্যালয়ে ভালো করতে পারছে না, খেলাধুলায় সুযোগ পাচ্ছে না, পরিবারে তার কথা কেউ শুনছে না, কর্মসংস্থানের পথ দেখছে না, সে অন্য কোথাও নিজের পরিচয় খুঁজবে। সেই পরিচয় যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা অপরাধী দলের মধ্যে পাওয়া যায়, তাহলে সেই পরিচয়ই তার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করতে পারে।
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের সাম্প্রতিক চিত্রও আমাদের সতর্ক করে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০২৫ সালের একটি যৌথ প্রতিবেদনেও দেখা যায়, ২০২২ সালে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কর্মরত শিশুর অনুপাত ছিল ৮.৯ শতাংশ এবং প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত ছিল।
অর্থাৎ আমাদের কিশোরদের একটি অংশ এমন পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে শিক্ষা, শ্রম, দারিদ্র্য, অবসর, প্রযুক্তি এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু পুলিশ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব?
পারব না।
পুলিশ অপরাধ ঘটলে আইন প্রয়োগ করবে। কিন্তু অপরাধী তৈরি হওয়ার আগের সময়টিকে সমাজকে গুরুত্ব দিতে হবে।
একজন কিশোরকে অপরাধী হওয়ার পর গ্রেপ্তার করার চেয়ে তাকে অপরাধের পথে যাওয়ার আগেই ধরে রাখা অনেক বেশি কার্যকর। এর জন্য পরিবারকে জানতে হবে সন্তান কী করছে। বিদ্যালয়কে জানতে হবে কে ঝরে পড়ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে জানতে হবে কোন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের সংখ্যা বাড়ছে। জনপ্রতিনিধি ও সমাজের নেতৃত্বকে জানতে হবে কোন কিশোরেরা দিনের পর দিন উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরছে। পুলিশকে শুধু অপরাধের মামলা নয়, কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কেও তথ্যভিত্তিকভাবে কাজ করতে হবে।
বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মমুখী শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
কারণ শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না।
একজন কিশোরের জীবন থেকে বিদ্যালয় সরে গেলে, কাজ না থাকলে, খেলাধুলা না থাকলে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হলে সেই জায়গা অন্য কেউ পূরণ করবে। সেই ‘অন্য কেউ’ হতে পারে ইতিবাচক কোনো শিক্ষক, প্রশিক্ষক বা সমাজকর্মী; আবার হতে পারে অপরাধী গোষ্ঠীর কোনো বড় ভাই।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রথম বিকল্পটিকে শক্তিশালী করা।
ডিজিটাল প্রযুক্তিকেও তাই শত্রু হিসেবে দেখলে চলবে না। স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং কিশোরকে শেখাতে হবে কোন বিষয় বিশ্বাসযোগ্য, কোন বিষয় ক্ষতিকর, কীভাবে অনলাইন হয়রানি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হয়, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার কীভাবে ঠেকাতে হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলে কীভাবে তা থেকে সরে আসতে হয়।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়োগ, কিশোরদের ব্যবহার, অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং বাস্তব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ডিজিটাল কার্যক্রম শনাক্ত করার সক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর আরও বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের কিশোর অপরাধকে তাই শুধু ‘খারাপ ছেলেদের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল সামাজিক সমস্যা।
সবচেয়ে বড় কথা, কিশোরকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে আমরা সমস্যার অর্ধেকই দেখতে পাব। অন্য অর্ধেক হলো—কে তাকে অপরাধী বানাচ্ছে, কেন সে সেই দলে যাচ্ছে এবং সমাজ কেন তাকে তার আগে ধরে রাখতে পারছে না।
আজ একটি কিশোরের হাতে থাকা স্মার্টফোন হয়তো তার ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিতে পারে। আবার ভুল পরিবেশে সেটিই তাকে অপরাধের জগতে নিয়ে যেতে পারে। একটি অটোরিকশা চালিয়ে উপার্জন করা কিশোর হয়তো নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে; আবার একই কিশোরকে কোনো অপরাধী গোষ্ঠী তার অর্থ, প্রযুক্তি, সময় ও আবেগ ব্যবহার করে অপরাধে ঠেলে দিতে পারে।
তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের নতুন দর্শন হতে হবে—শাস্তির আগে শনাক্তকরণ, অপরাধের আগে প্রতিরোধ এবং গ্রেপ্তারের আগে পুনর্বাসন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে কিশোরটি মোবাইলের পর্দায় অপরাধ দেখছে, সে আগামী দিনের অপরাধী হবেই—এমন নয়। কিন্তু তার হাতে প্রযুক্তি, সামনে বেকার সময়, পাশে ভুল বন্ধুত্ব এবং পেছনে দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে ঝুঁকি অবশ্যই বাড়তে পারে।
সেই ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়, শুধু পুলিশেরও নয়। এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব।
কারণ কিশোরের হাতে থাকা স্মার্টফোনটি আসলে একটি যন্ত্র মাত্র; সেটি ভবিষ্যতের অস্ত্র হবে, নাকি ভবিষ্যতের শিক্ষার জানালা হবে—তা নির্ভর করবে আমরা আজ তার চারপাশে কী ধরনের সমাজ তৈরি করছি তার ওপর।
ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার
অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার,
রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম,
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

