Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ ডাক শুনতে আকুতি কেন?

Advertisement

Icon

কাকন রেজা

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৪:১৬ পিএম

সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ ডাক শুনতে আকুতি কেন?

লেখকের ছবি

Advertisement

দক্ষিণ এশিয়ার ‘স্যার সিনড্রোম’ নিয়ে আমার একটি প্রকাশিত লেখা ছিল। ওই লেখার আলাপের একটা বড় অংশ ছিলো হালের অনেক সরকারি কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ ডাক শোনার আকুতি।

সম্ভবত বছর দুয়েক আগের লেখা। তাতে শংকা ছিলো এই সিনড্রোমের ক্রমবৃদ্ধি নিয়ে। শংকার সেই রূপ এখন ক্রমেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

দৈনিক যুগান্তরের একটি খবরে দেখলাম, এক নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেলক্রসিংয়ের গেটম্যানকে মারধর করেছেন। ট্রেন আসার সংকেত পেয়ে ক্রসিংয়ের গেট নামিয়েছিলেন সেই গেটম্যান। এটা মানতে পারেননি সেই সরকারী কর্মকর্তা। তার গাড়ি পার হতে না দিয়ে গেট নামানোকে তিনি ‘ঔদ্ধত্য’ হিসাবে ধরে নিয়েছেন।

এই যে, ঔদ্ধত্য হিসাবে ধরে নেয়ার জমিদারী মানসিকতা, এটাই ‘স্যার সিনড্রোম’। এ সিনড্রোমের কারণ হলো, নিজের আত্মপরিচয় বিস্মরণ। কাজের ধরণ ও কারণ বিস্মৃত হওয়া।

তাদের কাজ হলো, পাবলিককে সার্ভ করা, অর্থাৎ সার্ভিস দেয়া। জনগনের জন্য শ্রম দেয়ার কারণে তারা জনগণের টাকা হতে মজুরি পায়, যাকে বেতন নামে আখ্যায়িত করা হয়। হালজামানায় ফ্যাশন করে বলা হয় সেলারি।

এই যে, মজুরি যখন থেকে সেলারি হয়েছে, সর্বনাশের শুরু তখন থেকেই। আরেকটু খোলাসা করে বলতে গেলে, পাবলিক থেকে পদবির আগে যখন গর্ভমেন্ট যুক্ত হয়েছে তখন থেকেই খোল-নলচে বদলে শ্রমজীবীদের অনেকেই নিজেদের মালিক ভাবতে শুরু করেছেন।

অবশ্য এর কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। আমাদের ভূখন্ডের মানুষেরা বিভিন্ন সময় নানা ভাবে শোষিত, নিগৃহিত হয়েছে। জমিদারি প্রথার কথাই বলি।

স্বয়ং রবিঠাকুরের পরিবারও আমাদের বঙ্গের মানুষকে নিগৃহিত করেছে, শোষণ করেছে। মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দু জনগোষ্ঠী কিংবা বৌদ্ধরা এই জনপদে সামন্ত প্রভুদের হাতে নির্বিচারে নিগৃহিত হয়েছে।

অত্যাচার আর শোষণের সে মাত্রা সকল সীমা অতিক্রান্ত করেছে কখনো কখনো। আর নিরন্ন নিরূপায় মানুষ সে অত্যাচার-শোষণ সয়ে নিয়েছে মাথা নিচু করে। আর মনের গহীনে জ্বেলে রেখেছে প্রতিশোধের আগুন। বংশ পরম্পরার প্রতিশোধ প্রবণতার সেই আগুনের রূপই হচ্ছে স্যার সিনড্রোম।

যার তাপে যখন তখন যে কেউ ঝলসে যায়, যেতে পারেন। যেমন গিয়েছে সেই রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান।

পাওলো ফ্রেইরি বলেন, ‘অত্যাচারিতরা ক্ষমতা পেলে তারা অত্যাচারীদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি অত্যাচারী হয়ে উঠে।’
দাসদের ক্ষমতা দিলে তারা মালিকের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্ম তারই বর্ণিত রূপ।

সেখানে পশুর খামারে মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পশুরা এবং মানুষকে হঠিয়ে তারা মানুষের চেয়ে বেশি ক্রুর হয়ে উঠে।
সে জন্যেই ফ্রেইরি বলেন, ‘মুক্তির মূল কথা হচ্ছে মনের দাসত্ব থেকে মুক্তি। নিজের মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি না পেলে একজন মানুষ কখনো মুক্ত মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। তারমধ্যে থেকে যায় দাস থাকাকালীন প্রতিশোধ প্রবণতা। যা তাকে পরবর্তীতে মালিকের চেয়ে আরো নিষ্ঠুর করে তোলে।’  

আমাদের মধ্যে যারা ক্ষমতাবান হন, তাদের অনেকেরই পেছনে থাকে নানা বঞ্চনার ইতিহাস। তারা নিগৃহিত হন ক্ষমতাবানদের দ্বারা, শোষিত হন মালিক কর্তৃক। যার ফলে পরিবারগত ভাবে এসব প্রতিকূল অভিজ্ঞতা নিয়েই অনেকে বড় হন এবং মেধা ও ভাগ্যগুনে একসময় নিজেই হয়ে উঠেন প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী।

যারা মনের দাসত্ব থেকে মুক্তি পান তারা এই প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে লাগান মানব কল্যাণে, নম্রতায় ও বিনয়ে। আর যারা মানসিকতায় দাস থেকে যান, তাদের অবচেতনের প্রতিশোধ স্পৃহায় হয়ে উঠেন উদ্ধত আর অত্যাচারী।
তারাও সেই সামন্ত জমিদারদের মতন সবাইকে নিজ রায়ত ভাবেন, আচরণে আমজনতাকে প্রজা হিসাবে গণ্য করেন।

তারা চান, সবাই যেন রায়তাধীন প্রজার মতন মাথা নিচু করে থাকেন তাদের সমুখে। মাথা উঁচু করে কথা বলাকেই ভাবেন ঔদ্ধত্য। মানুষের কথাকে ঔদ্ধত্য হিসাবে পরিগণিত করার এমন কান্ডই স্যার সিনড্রোম।

এ শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের কারো কারো মধ্যেই রয়েছে এমনটা নয়। এটা রয়েছে নানা পেশা ও শ্রেণির মানুষের মধ্যে। সরকারে চাকুরে ছাড়াও মানুষ নানা ভাবে ক্ষমতাবান হন। আর আমাদের মতন দেশগুলিতে ক্ষমতাবান হওয়া খুব বেশি কঠিন কাজ নয়।

কে, কেনো, কিভাবে এবং কখন ক্ষমতাবান হয়ে উঠে বা উঠেছেন তা কারো অজানা নয়। এসবের দৃশ্যচিত্র সবই আমাদের দৃষ্টির সীমানাতেই দৃশ্যমান।

অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থা থেকে, অনেকে যাদের ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘রাস্তা থেকে উঠে আসা’ এমন লোকও এক সময় প্রচন্ড ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারেন।  

চলতে পারেন দেহরক্ষীর বিশাল বহর নিয়ে দর্পিত জমিদারদের মতন। মানুষের কথা বলাকে ভাবতে পারেন বেয়াদবি, জনতাকে শায়ানের গানের ভাষায় বলতে পারেন, বেয়াদব জনতা।

হালের ক্যাসিনোকান্ড এমন চিত্রই দৃশ্যমান করেছে সাম্প্রতিকের সেলুলয়েডে।

আবারও পাওলো ফ্রেইরির কথায় আসি। তিনি বারবার বলেছেন, ‘শোষিত দাসদের সত্যিকার মুক্তি তাতেই, যখন তারা নিজ মনের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাবে।’  

কদিন আগে দেখেছি আরেক সরকারি কর্মকর্তা তিনিও নারী, এক মাছ বিক্রেতাকে মেরেছেন তাকে স্যার না ডাকায়। এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। যা কখনো প্রকাশ্যে আসে, কখনো আসে না। গণমাধ্যমও স্যার দেখে ভয় পায়।

গণমাধ্যমের অনেক মালিকই পাওলো ফ্রেইরির ভাষায় নিজের মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পাননি বলে স্যার সিনড্রোমেন সমুখে রায়ত হয়ে যান, প্রজার মতন আচরণ করেন। আর তাদের সেই আচরণে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভটিও নতজানু হয়ে ভেঙে পড়তে থাকে। মানুষ হারায় ভরসার শেষ জায়গার একটা।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

 

Advertisement

স্যার

Advertisement

আরও পড়ুন

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম