পেঁয়াজ আর লবণের ক্রাইসিস ও কাজির কেতাবি গরু
Advertisement
কাকন রেজা
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ০৮:০৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পেঁয়াজেরও এখন পুলিশ লাগে। অন্তত যুগান্তরের শিরোনাম সে কথারই জানান দেয়। ‘রাজশাহীতে পুলিশি পাহারায় পেঁয়াজ বিক্রি!’ বিস্ময় চিহ্ন দিয়ে এমন শিরোনামই করেছে কাগজটির অনলাইন ভার্সন। এটা নিয়ে কথা বলার আগে ‘বাস্তব’ আর ‘গুজবে’র পার্থক্যটা করি।
লবণ নিয়ে যা শুরু হয়েছিলো, তা ছিল গুজব। কারণ তা সামাল দেয়া গেছে। সেই ক্রাইসিসটা ছিল নকল। না হলে সামাল দেয়া সম্ভব ছিল না। আর পেঁয়াজের ক্রাইসিসটা বাস্তব, তাই এটা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দায়িত্বশীলদের।
বিমানে আর জাহাজে পেঁয়াজ আসার কথা ঘোষণা দিয়েও খুব একটা কমানো যায়নি পেঁয়াজের মূল্য। মাঝে একটু কমলেও আবার বেড়েছে। এরমধ্যে পুলিশী অভিযানের ফল হয়েছে অনেকক্ষেত্রে হিতে বিপরীত। অনেক বিক্রেতা ঝামেলার ভয়ে পেঁয়াজ বিক্রিই বন্ধ করে দিয়েছেন। যা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
দোকানি অনেকের কথা, ‘পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে বেশি দামে, অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে চাপের মুখে কম দামে, তারচেয়ে না বিক্রি করাই ভালো, অন্তত লোকসান তো গুনতে হচ্ছে না।’ এই যে অনেক দোকানি বিক্রি বন্ধ করেছেন এরও কিন্তু একটা নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
মানুষ ভাবছে পেঁয়াজ যখন এরা বিক্রি করছে না, তাহলে পেঁয়াজের ক্রাইসিস অবশ্যই রয়েছে। সুতরাং যেখানে দাম বাড়তো দশ টাকা সেখানে বাড়ছে বিশ টাকা। পেয়াদা দিয়ে ঠেঙিয়ে সব কাজই উদ্ধার হয় না।
পেঁয়াজের উৎপাদন ও আমদানির সাথে চাহিদার হিসাবে একটা খটকা রয়েছে। যা উঠে এসেছে পেঁয়াজ বিষয়ে গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের আলোচনায়। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি মতে এবার পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় চব্বিশ লাখ মেট্রিক টন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে সতেরো লাখ মেট্রিক টনের কথা। আমদানি হয়েছে আরও সাত লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদন ও আমদানি দুয়ে মিলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দাঁড়ায় তেত্রিশ লাখ মেট্রিক টন আর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চব্বিশ লাখ মেট্রিক টন। আমাদের চাহিদার কথা বলা হয়েছে চব্বিশ লাখ মেট্রিক টন।
দুটো হিসাবেই আমাদের পেঁয়াজ বিষয়ক কোনো সংকট হবার কথা নয়। কিন্তু হয়েছে। অর্থাৎ খটকাটা জানিয়ে দেয়, চাহিদার সাথে প্রয়োজনের পরিসংখ্যানটা হলো ভুল।
চাহিদার ভুল পরিসংখ্যান আমাদের সবক্ষেত্রেই। আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার অংক প্রায় ক্ষেত্রেই মেলে না। বলা হচ্ছে, আমাদের জিডিপি দুই হাজার বিশ সালের মধ্যে আট শতাংশে পৌঁছাবে। এটা একটা বিরাট সাফল্য। এই বৃদ্ধির হার ভারতের চেয়েও বেশি।
অথচ এমন জিডিপি’র দেশে এখনো মানুষের মাথাপিছু আয় বছরে মাত্র উনিশ’শ ডলার। তাও আবার সরকারি ভাবে। বাস্তবের পরিসংখ্যান আরও অনেক কম। অথচ জিডিপি’র হিসাব অনুযায়ী এমনটি হবার কথা নয়। তবু হচ্ছে। পরিসংখ্যানের ফাঁকটা এখানেই।
সম্পদের সুষমে বণ্টনের ব্যর্থতাই এর জন্য দায়ি। রাষ্ট্র একটা শ্রেণিকে ধনি হবার মদত দিচ্ছে, আরেকটা অংশ সেই মদতের বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় ক্রমেই দরিদ্র হচ্ছে। আমাদের জিডিপি’র বৃদ্ধির হার ধরে আমরা কানাডা কিংবা অন্য উন্নত দেশগুলোকেও পিছে ফেলার কথা।
যেসব দেশের পেছনের ক্রমিকে থাকা দেশটির আয়ও বছরে মাথাপিছু ষাট হাজার ডলারের মতন। দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ‘খাতাপত্র’ ঠিক রাখার একটা ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই চালু রয়েছে। ওই যে, কাজির গরুর মতন, কাগজে আছে গোয়ালে নাই আর কী।
ছোট বেলায় বাবা বলতেন, রেশনের দোকানের কথা। মানুষ চাল-ডাল-তেলের জন্য রেশনের দোকানে লাইন ধরে দিনভর বসে থেকে ফিরে গেছে না পেয়ে। অথচ দোকানের খাতাপত্রে বিক্রির পাকা হিসাব রয়েছে। মানুষের ফিরে যাওয়া এবং রেশনের দোকানের হিসাবের খাতার মধ্যে যে ফাঁকি, জিডিপি’র ফাঁকিটাও তেমনি।
ভারতের মানুষ রেশন দোকানের এই ফাঁকিটা আজো বুঝতে পারছে হাড়ে-হাড়ে। আমাদের পেঁয়াজের ক্রাইসিসটাও তেমনি। ‘খাতাপত্র’ ঠিক আছে কিন্তু লাইনের মানুষ ফিরে গেছে। আর লবণের ক্ষেত্রে কাগজের গরু গোয়ালে আছে বলেই ক্রাইসিসটা হয়নি।
এসবের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক ক্রাইসিসটাও মিলিয়ে দেখতে পারেন। কাগজে গণতন্ত্র থাকলেও অনুশীলনে নেই। যার ফলেই ক্রাইসিসটা লেগে রয়েছে, দীর্ঘদিনেও মেটেনি। আর গণতন্ত্র না থাকলে, মানুষের কথা বলার ক্ষমতা থাকে না, অথবা শোনার লোক না থাকায় বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
যার কারণে ক্রাইসিসটাও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া সম্ভব হয় না। শেষ করি যুগান্তরের আরেকটি শিরোনাম দিয়ে। মাহাথির মোহাম্মদকে উদ্ধৃত করে যুগান্তর বলেছে, ‘আমাকে পছন্দ না হলে প্রকাশ্যে বলেন। সমালোচনা করুন। সমালোচনার জন্য আমি উন্মুক্ত।’ মাহাথির মালয়েশিয়াকে এই জায়গায় এনেছেন। তিনি জানেন, ‘সমালোচনা’ রাষ্ট্রের জন্য কতটা প্রয়োজন।
লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক
