ফেল করলেই জীবন শেষ নয়, সন্তানদের স্বপ্ন বাঁচাতে সচেতন হোন
Advertisement
মো. মুখলেছুর রহমান
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম
ছবি-এআই
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মর্মান্তিক খবর আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ৩১ অক্টোবর রাত পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সাতক্ষীরা, মাগুরা, লক্ষ্মীপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক সংবাদে এসব ঘটনার সঙ্গে পরীক্ষার ফলাফল ও অকৃতকার্য হওয়ার হতাশার সম্পর্ক উঠে এসেছে। এক দিনেই একাধিক শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। পরীক্ষায় খারাপ ফল হতে পারে, প্রত্যাশিত জিপিএ না-ও আসতে পারে, এমনকি অকৃতকার্যও হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু এর কোনোটিই একজন মানুষের মেধা, যোগ্যতা, সম্ভাবনা কিংবা ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। জীবনে সফল হওয়ার পথ মাত্র একটি নয়, বরং অনেক।
কেউ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ভালো ফলাফল করে প্রতিষ্ঠিত হন, আবার কেউ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রত্যাশিত সাফল্য না পেয়েও কর্মজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য, কৃষি কিংবা সমাজসেবায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন।
ইতিহাসের সফল মানুষদের জীবন থেকে শিক্ষা
বিশ্বের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবন আমাদের শেখায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ফলাফলই মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। বিখ্যাত আবিষ্কারক থমাস আলভা এডিসনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সীমিত। শৈশবে স্কুলে তাঁর অগ্রগতি প্রত্যাশিত না হওয়ায় মা তাঁকে বাড়িতে পড়াশোনা করান। পরবর্তী সময়ে তাঁর আবিষ্কার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সাহিত্যে নোবেলজয়ী উইনস্টন চার্চিল সামরিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্যান্ডহার্স্টে ভর্তির পরীক্ষায় প্রথম দুইবার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তৃতীয়বারের চেষ্টায় তিনি সেখানে ভর্তি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্রিটিশ রাজনীতি ও বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।
বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তা ও ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসন মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়ে যান। ডিসলেক্সিয়ার কারণে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। কিন্তু নিজের আগ্রহ, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবসাজগতে প্রতিষ্ঠিত হন।
এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফল না পেলেও মানুষের সামনে সাফল্যের বহু পথ খোলা থাকে। এসব উদাহরণ প্রচলিত শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার জন্য নয়; বরং শিক্ষার বাইরেও দক্ষতা, সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও কর্মপ্রচেষ্টা যে জীবনের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তা তুলে ধরার জন্য।
ফলাফলকেন্দ্রিক সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন জরুরি
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য ব্যাপক মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক অভিভাবক সন্তানের ফলাফলকে নিজেদের সামাজিক মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেন। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনা করে সন্তানকে বিব্রত ও অপমানিত করা হয়। প্রত্যাশিত ফল না এলে অনেক শিক্ষার্থীকে তিরস্কার, ভর্ৎসনা কিংবা অবজ্ঞার শিকার হতে হয়। অথচ এ সময় তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সহানুভূতি, উৎসাহ, মানসিক সমর্থন ও ভবিষ্যতের পথ দেখানো।
অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তাকে তিরস্কার করা নয়, বরং তার পাশে দাঁড়ানোই তাদের দায়িত্ব। অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা না করে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে সহযোগিতা করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া, বিষয় পরিবর্তন, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কিংবা বিকল্প পেশাগত পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সন্তানকে বোঝাতে হবে, পরীক্ষার ফলাফল যা-ই হোক, পরিবার তার পাশে রয়েছে। পরিবারের ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা কোনো গ্রেড বা সনদের ওপর নির্ভরশীল নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই ও পরীক্ষার প্রস্তুতি দিলেই চলবে না; তাদের মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, ব্যর্থতা মোকাবিলার সক্ষমতা এবং জীবনমুখী দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও সনদনির্ভর না রেখে বাস্তবমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মসংস্থানমুখী করা প্রয়োজন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর আগ্রহ, মেধা ও সক্ষমতা অনুযায়ী বিকল্প শিক্ষার পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে হবে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দক্ষ জনশক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।
এ ক্ষেত্রে সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের আগামী এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বহু শিক্ষার্থীকে পরবর্তী বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জন্য আশার বার্তা বহন করে। একটি বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তাদের শিক্ষাজীবন থেমে গেছে। বরং নতুন সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আবারও ভালো ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করতে হবে।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে
পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা, জিপিএ-৫-কেন্দ্রিক প্রচারণা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর তুলনা অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক চাপ তৈরি করে। গণমাধ্যমের উচিত ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক প্রতিভা, কর্মমুখী শিক্ষা এবং বিকল্প সাফল্যের গল্প তুলে ধরা। আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা প্রয়োজন। আত্মহত্যার পদ্ধতি বা অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত বিবরণ প্রচার না করে প্রতিরোধ, মানসিক সহায়তা এবং বিকল্প সমাধানের বিষয়গুলো সামনে আনা উচিত।
সাফল্যের পথ একাধিক
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মেধা, আগ্রহ ও দক্ষতা এক রকম নয়। সবাই চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কেউ কারিগরি শিক্ষায়, কেউ ব্যবসায়, কেউ কৃষিতে, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউবা সৃজনশীল পেশায় নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন। একটি মর্যাদাপূর্ণ ও উৎপাদনশীল জীবন গড়ে তোলার জন্য শুধু সাধারণ শিক্ষার সনদই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষতা, সততা, পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা ও আত্মবিশ্বাস।
ইসলামও মানুষের জীবনকে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করে। হতাশা ও বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং সম্ভাব্য সব বৈধ উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করার শিক্ষা দেয়। তবে মানসিক সংকটে থাকা কাউকে শুধু উপদেশ বা ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, মানসিক সহায়তা দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যার কথা বললে কিংবা গভীর হতাশা, একাকিত্ব ও অসহায়ত্বের লক্ষণ প্রকাশ করলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। তাঁকে একা না রেখে পরিবারের সদস্য, বিশ্বস্ত শিক্ষক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নিতে হবে।
জীবন পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে অনেক মূল্যবান
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি পরীক্ষার ফলাফল যেন আর কোনো পরিবারের জন্য এমন অপূরণীয় বেদনার কারণ না হয়। সন্তানদের বোঝাতে হবে, জীবনে হোঁচট খাওয়া অপরাধ নয়; হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর মধ্যেই প্রকৃত সাহস ও সাফল্য নিহিত।
মনে রাখতে হবে, পরীক্ষায় ফেল করলে আবার পরীক্ষা দেওয়া যায়, নতুন করে পড়াশোনা শুরু করা যায়, পেশা পরিবর্তন করা যায়, জীবনের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু জীবন একবার হারিয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের আহ্বান—একটি পরীক্ষার ফলাফলকে জীবনের চূড়ান্ত রায় মনে করবেন না। হতাশ হবেন না, নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন না। ভুল থেকে শিক্ষা নিন, নতুন করে প্রস্তুতি নিন এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প পথ বেছে নিন।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান, সন্তানদের ফলাফলের চেয়ে তাদের জীবন, মানসিক সুস্থতা ও সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিন। শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও ব্যর্থতা মোকাবিলার মানসিকতা গড়ে তুলুন।
আত্মহত্যা নয়, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। জীবনকে ভালোবাসুন, নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগান। আপনার সামনে এখনো অনেক পথ খোলা রয়েছে।
একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং নতুন করে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সাফল্য অর্জনের একটি সোপান মাত্র।
লেখক: ইসলামি ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মী
