ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুগের অবসান নাকি নতুন যুদ্ধ?
Advertisement
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আধুনিক বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রে গত এক দশকে যে কটি নাম ক্ষমতার দম্ভ, যুদ্ধের উন্মাদনা এবং মানবতাবিরোধী সিদ্ধান্তের জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে, তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ক্ষমতায় আরোহণের প্রাথমিক লগ্নে তারা উভয়েই নিজ নিজ দেশের ভোটারদের বিপুল সমর্থন ও উচ্ছ্বসিত আশাবাদের ওপর ভর করে রাষ্ট্রীয় মসনদে বসেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম; যে জনসমর্থন তাঁদের সিংহাসনে বসিয়েছিল, আজ সেই জনগণের ঘাম ও রক্তঝরা কান্নাই তাঁদের ক্ষমতার কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। ইসরাইলে নেতানিয়াহুর পতনের ঘণ্টা আজ স্পষ্টতই বেজে গেছে, আর মার্কিন মুলুকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি দুই যুদ্ধবাজ নেতার ক্ষমতার যুগের অবসান, নাকি বিশ্ববাসীকে আরও এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রস্তুতি?
বিজয়ের উচ্চ শিখর থেকে পতনের অতলে পৌঁছানোর এই দুই নেতার রাজনৈতিক ইতিহাস বড় বিচিত্র। গত নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই নজিরবিহীন বিজয় অর্জন করে নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। নেতানিয়াহু ইসরাইলি রাজনীতিতে নিজেকে ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং ট্রাম্প আমেরিকান রক্ষণশীলদের জোয়ারে ভর করে হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন। তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের চটকদার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরই তাঁদের আসল রূপ বেরিয়ে পড়তে শুরু করে। সাধারণ ইসরাইলি নাগরিকদের শান্তির আকুতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে গিয়ে নেতানিয়াহু একের পর এক যুদ্ধ বাধিয়ে বসেন। গাজা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে-বাতাসে ধ্বংসের আগুন জ্বেলে তিনি ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে ঠেলে দেন।
অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পও আমেরিকার সাধারণ মানুষের ভালো থাকা বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের তোয়াক্কা না করে ইসরাইলের অন্ধ লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে বৈশ্বিক শান্তি বিঘ্নিত করেন। জনগণের রায়কে পদদলিত করে ক্ষমতার মোহে তারা দুজনই নিজ নিজ দেশে চরম বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
ইসরাইলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ কার্যত ক্ষমতা থেকে বিদায়ের পথে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল ও জনমত জরিপগুলোর স্পষ্ট ইঙ্গিত—বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি। সাধারণ ইসরাইলিরা বুঝতে পেরেছেন যে, নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী নীতি তাদের দেশকে কোনো নিরাপত্তা দেয়নি; বরং তাদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, সামাজিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। জনসাধারণের এই তীব্র অসন্তোষ ও বর্জনই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্তিম ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষের রক্তে হাত রাঙিয়ে নিজের রাজনৈতিক চেয়ার টিকিয়ে রাখার যে নোংরা খেলা তিনি খেলেছিলেন, আজ তা তার নিজ দেশের জনগণই প্রত্যাখ্যান করেছে।
অনুরূপ এক রাজনৈতিক অবক্ষয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দৃশ্যমান। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কার্যত তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়ে তিনি দেশ পরিচালনা করেছেন। বিশেষ করে, ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং তাদের অন্ধ ইশারায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছেন। সাম্প্রতিক প্রায় সব কটি জরিপেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বিরোধীদের থেকে পিছিয়ে আছেন এবং সর্বশেষ জরিপেও তিনি স্পষ্টভাবে পিছিয়ে পড়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে ইরানের ওপর হামলা চালায়। এই যুদ্ধের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ন্যূনতম কোনো যৌক্তিক বা ভূরাজনৈতিক সুফল ছিল না। অথচ এই হামলার ফলস্বরূপ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। আমেরিকার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ আজ তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করছেন। ফলে আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের সম্ভাবনাই সবচেয়ে জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে।
অবশ্য নির্বাচনে হেরে গেলে বা পরাজিত হলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংকট এখানেই শেষ হচ্ছে না। ট্রাম্প সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত না হলেও কংগ্রেস যদি ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে তার প্রণীত আইন পাস করা, নীতি বাস্তবায়ন, বাজেট পাস কিংবা উচ্চপদস্থ নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হবে। অর্থাৎ, তিনি কার্যত এক আহত বাঘে পরিণত হবেন, যা তার নীতিগুলোকে পঙ্গু করে দেবে। নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প—এই দুই নেতার একক অদূরদর্শিতা ও যুদ্ধংদেহী মানসিকতা কেবল তাদের নিজ নিজ দেশের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করেনি, বরং গোটা বিশ্বকে এক গভীর অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নিরীহ ফিলিস্তিনি ও ইরানিদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে তারা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন, কোটি কোটি মানুষকে গৃহহারা করেছেন। তাদের এই অপরিকল্পিত ও জেদি যুদ্ধনীতির কারণে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। মূল্যস্ফীতির কষাঘাতে আজ বিশ্বের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষ দিশেহারা। একবেলা খাবার জোগাড় করতে যেখানে সাধারণ মানুষের ত্রাহি অবস্থা, সেখানে এই দুই নেতার ক্ষমতার লিপ্সা বিশ্ববাসীকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধবাজ এই নীতিগুলোর কোনো নৈতিক বা অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল না; এটি ছিল কেবল ক্ষমতার দম্ভ এবং রক্তপিপাসু মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববাসী আজ এই দুই নেতার জনবিরোধী ও মানবতাবিরোধী চরিত্রের কঠোর সমালোচনা করছে।
সামনের নির্বাচনগুলো তাই কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং এগুলো নির্ধারণ করবে বিশ্বশান্তির ভবিষ্যৎ। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নির্বাচনে পরাজিত হন, তবে বিশ্ববাসী হয়তো এই যুদ্ধবাজ রাজনীতির ফলে সৃষ্ট অন্তহীন সংকট ও আতঙ্ক থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারে। বিশ্বজুড়ে স্থিতি ফিরে আসার এবং কূটনৈতিক আলোচনার দরজা উন্মুক্ত হওয়ার একটি ক্ষীণ আশা তৈরি হতে পারে। পক্ষান্তরে, ট্রাম্প যদি কোনো কারণে জিতে যান বা ক্ষমতা ধরে রাখেন, তবে বিশ্ববাসীকে আরও এক ভয়াবহ, সর্বগ্রাসী যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং নিজের সাম্রাজ্যবাদী নীতি বাস্তবায়নে তিনি বিশ্বকে আরও গভীর সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে দ্বিধাবোধ করবেন না।
পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাস সাক্ষী—যুদ্ধ ও রক্তপাতের ওপর ভর করে কোনো স্বৈরাচারী বা যুদ্ধবাজ শাসক চিরকাল টিকে থাকতে পারেন না। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর পতন কিংবা তাদের ক্ষমতার অবসান আজ সময়ের দাবি মাত্র। বিশ্বের শান্তিকামি প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা, এই যুদ্ধবাজ যুগের অবসান ঘটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসুক স্থায়ী শান্তি, মুক্তি পাক মানবতা। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]


