অদৃশ্য ঝুঁকির মুখে স্বাস্থ্য ও গবেষণা: বায়োসেফটি এখনো কেন প্রান্তিক?
Advertisement
ড. মো. আতিয়ার রহমান
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
ড. মো. আতিয়ার রহমান। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অদৃশ্য বিপদ ও অতিমারির শিক্ষা
গবেষণাগারের দরজায় আমরা প্রায়ই একটি সতর্কবার্তা দেখি: ‘বায়োহ্যাজার্ড’। কিন্তু সেই বার্তার ভেতরের ঝুঁকিটা সচরাচর চোখে পড়ে না। কারন, জীবাণুর কোনো রং নেই, গন্ধ নেই, শব্দ নেই। অথচ একটি অসতর্ক মুহূর্তে হাত থেকে পড়ে যাওয়া নমুনা, ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত না করা বর্জ্য কিংবা ত্রুটিপূর্ণ সুরক্ষা-কেবিনেট একজন গবেষকের স্বাস্থ্য, এমনকি পুরো একটি জনপদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। অথচ ঝুঁকিটি অদৃশ্য বলেই আমরা একে গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত নই। কোভিড-১৯ অতিমারি দেখিয়েছে, জৈব ঝুঁকি কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, তা মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে মুহূর্তে থমকে দিতে পারে। পৃথিবীজুড়ে রোগজীবাণু নিয়ে গবেষণা, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, জিনপ্রযুক্তি ও জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অনিচ্ছাকৃত সংক্রমণ, ল্যাব থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া এবং অনিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আশঙ্কা। এই বাস্তবতায় বায়োসেইফটি আর বিলাসিতা নয়, বরং আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও গবেষণার অপরিহার্য ভিত্তি।
তবু বাংলাদেশের মতো দেশে বায়োসেফটি এখনো নীতিনির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার প্রান্তেই পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অনেক ল্যাবে নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, স্পষ্ট নির্দেশিকা কিংবা কার্যকর তদারকি। সুরক্ষা-সরঞ্জাম ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ কম, আর নিরাপত্তা-সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ বায়োসেইফটি এন্ড বায়োসিকিউরিটি সোসাইটি (বিবিবিএস)’র নিয়মিত কিছু সেমিনার, ল্যাবরেটরী কর্মশালা ছাড়া এ অঙ্গনটি একবারেই অবহেলিত বলা যায়। সে কারনেই খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন দাড়াই: সম্ভাব্য বিপদ যখন এত স্পষ্ট, তখন বায়োসেইফটি কেন এখনো আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় এত নিচে?
বায়োসেফটি ও বায়োসিকিউরিটি: দুটি শব্দ, দুটি দায়
বায়োসেফটি মানে ক্ষতিকর জীবাণু যাতে অসাবধানতায় গবেষক, রোগী বা পরিবেশের ক্ষতি না করে, তা নিশ্চিত করা। বায়োসিকিউরিটি মানে সেই জীবাণু, বিষ বা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি যাতে চুরি, অপব্যবহার বা ইচ্ছাকৃত ক্ষতির কাজে না লাগে, তা নিশ্চিত করা। প্রথমটি দুর্ঘটনা ঠেকায়, দ্বিতীয়টি অপব্যবহার ঠেকায়। আমাদের আলোচনায় প্রায়ই দ্বিতীয়টি বাদ পড়ে যায়।
বায়োসেফটি সংক্রান্ত নীতিপর্যালোচনা
আইনি কাঠামোর দিকে তাকালে চিত্রটি একেবারে হতাশার নয়। ২০০৭ সালে জাতীয় বায়োসেফটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হয়। এরপর ২০০৮ সালে প্রকাশিত বায়োসেফটি গাইডলাইন ২০১২ সালের বায়োসেইফটি রুলসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাম্প্রতিকতম সংযোজন ২০২৪ সালের জাতীয় বায়োসেইফটি নীতি, যা পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। ২০০৮ সালের গাইডলাইনে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বায়োসেইফটি কমিটি, বায়োসেইফটি লেভেল (বিএসএল), বিএসএল-১ থেকে বিএসএল-৪ পর্যায়ের ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের শাস্তির বিধানও আছে।
তবে একটি বিষয় এখানে খেয়াল করা দরকার। এসব নথির মূল কেন্দ্র জেনেটিক্যালি মডিফাইড অরগানিজম/লিভিং মডিফাইড অরগানিজম (জিএমও/এলএমও), অর্থাৎ আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি ও কার্টাজেনা প্রটোকল। ২০২৪ সালের নীতির উদ্দেশ্যও জিএমও ও তার পণ্যের নিরাপদ গবেষণা, ব্যবহার ও আমদানি-রপ্তানি নিশ্চিত করা। হাসপাতালের সংক্রামক রোগের ঝুঁকি, ক্লিনিক্যাল ল্যাবের দৈনন্দিন নিরাপত্তা, কিংবা মারাত্মক রোগজীবাণু নিয়ে কাজের নিরাপত্তা এই কাঠামোয় প্রধান জায়গা পায়নি। এ ক্ষেত্রে আমাদের আইনি ব্যবস্থা এক আইনবিশেষজ্ঞের ভাষায় বহুলাংশে প্রতিক্রিয়াশীল এবং খণ্ড খণ্ড আইননির্ভর, যার বদলে একটি সমন্বিত নীতি-আইনি কাঠামো দরকার।
পরিসংখ্যানের পরাবৃত্তে বায়োসেফটি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO ) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের যৌথ পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য নিয়ে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত WHO বাংলাদেশের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক পরিষেবায় বড় ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে মাত্র ১৬ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মৌলিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ২০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে মৌলিক পরিবেশ-পরিচ্ছন্নতার সেবা রয়েছে; মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সেবা রয়েছে ৩২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। মাত্র ২৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে মৌলিক স্যানিটেশন সেবা রয়েছে, আর ৭১ শতাংশে মৌলিক পানীয় জলের ব্যবস্থা আছে-যদিও পানি-ব্যবস্থা থাকলেই তা নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা নেই। এই সূচকগুলো সরাসরি প্রতিটি ল্যাবের বায়োসেইফটি-মান পরিমাপ করে না; তবে সংক্রমণ প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জাতীয় সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত দেয়।
নিপাহ ভাইরাসের তথ্যও বাংলাদেশের ঝুঁকির বাস্তবতা বোঝায়। আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ৩৪৮টি নিপাহ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে-মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ। ২০২৫ সালে চারটি নিশ্চিত সংক্রমণই প্রাণঘাতী ছিল বলে WHO জানিয়েছে। নিপাহের মতো জুনোটিক রোগে দ্রুত শনাক্তকরণ, নমুনা নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহন, পরীক্ষাগারকর্মীর সুরক্ষা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অনুসরণ এবং হাসপাতালের সংক্রমণ-নিয়ন্ত্রণ একে অপরের পরিপূরক। এসব ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে রোগ শনাক্তে দেরি, স্বাস্থ্যকর্মীর সংক্রমণ এবং স্থানীয় প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসা-বর্জ্যের পরিমাণও বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ড্যাশবোর্ডে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের ২৬টি হাসপাতাল থেকে দৈনিক ৩,১২০ কেজির বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। সেখানে উপযুক্ত অটোক্লেভ স্থাপনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২,৬৫২ কেজি বর্জ্যের ঝুঁকি কমানো এবং বছরে প্রায় ৭০২ টন বর্জ্য জীবাণুমুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এটি জাতীয় মোট বর্জ্যের হিসাব নয়; বরং একটি অঞ্চলের উদাহরণ, যা উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, জীবাণুমুক্তকরণ এবং নিরাপদ চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বিনিয়োগের প্রয়োজনকে ভাবতে শেখায়।
বায়োসেফটি বিচারে হাসপাতাল ও মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা
আমাদের হাসপাতালগুলোর চাপ সবার জানা। শয্যার তুলনায় রোগী অনেক বেশি, করিডোরে রোগী থাকে, সংক্রমণ প্রতিরোধ দলের লোকবল সীমিত। এই পরিস্থিতিতে বায়োসেফটি প্রায়ই ‘অতিরিক্ত কাজ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমি ব্যক্তিগতভঅবে বাংলাদেশের অনেকগুলো মেডিকেল-হাসপাতাল নিরীক্ষণ করেছি এবং সিডিসি আটলান্টার প্রটোকল অনুযায়ী ঐসব মেডিকেল হাসপাতালের বায়োসেইফটি সক্ষমতা এ্যাসেস করার সুযোগ হয়েছে। এবং সেসব ক্ষেত্রে আমার চোখে পড়া কয়েকটি পরিচিত দুর্বলতা:
• চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ২০০৮ সালের চিকিৎসা বর্জ্য বিধিমালা থাকলেও উৎসেই বর্জ্য আলাদা করা, নিরাপদ পরিবহণ ও শোধনে ঘাটতি বহুবার আলোচনায় এসেছে। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও সংক্রমিত বর্জ্য পরিচ্ছন্নকর্মী ও সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি ঝুঁকি।
• সুরক্ষা সামগ্রী ও প্রশিক্ষণ: পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), বায়োসেইফটি ক্যাবিনেট ও জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা সবখানে সমান নয়। যন্ত্র থাকলেও তার সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নিয়মিত হয় না।
• কর্মীদের সুরক্ষা: চিকিৎসক, নার্স, ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মধ্যে সুরক্ষার সংস্কৃতি অসম। নিচের স্তরের কর্মীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন, অথচ প্রশিক্ষণ সবচেয়ে কম পান।
• নিপাহ, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও জুনোটিক রোগ: খেজুরের রস মৌসুমে নিপাহের পুনরাবৃত্তি এবং বিশাল পোল্ট্রি খাতের কারণে জুনোটিক ঝুঁকি আমাদের জন্য তাত্ত্বিক নয়, বাস্তব।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দ্বিধা ও ভূল প্রাকটিস
বাংলাদেশে ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ বায়োসেফটি এবং বায়োসিকিউরিটি সোসাইটি (বিবিবিএস) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিানে বায়োসেইফটি প্রাকটিস পরিদর্শন, মোটিভেশন এবং রিসোর্স পারসন তৈরিতে আইইডিসিআর,বি সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। দেখা যায় যে, আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি এবং কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় কাজ করে এবং তাদের মান তুলনামূলক ভালো। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ল্যাবে ছবি ভিন্ন। এমনও হয়েছে, সুখ্যাতি মেডিকেল কলেজের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে চিত্র ছিল এমন যে, যেখানে অণুজীবের কালচার করা হচ্ছে সেখানেই বিভাগের ডাক্তার এবং অন্যান্যরা খাবার গ্রহন করছে। এছাড়াও প্রায়ই দেখা যায়:
ক. প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বায়োসেইফটি কমিটি (আইবিসি) কাগজে আছে, কিন্তু কার্যকর নয়।
খ. ল্যাবের ঝুঁকি-মূল্যায়ন ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) নেই, বা থাকলেও কেউ অনুসরণ করে না।
গ. রাসায়নিক, জৈব ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য একই ব্যবস্থায় নিষ্পত্তি হয়।
ঘ. নমুনা, স্ট্রেইন ও কালচারের হিসাব-নিকাশ, সংরক্ষণ ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। এটি সরাসরি বায়োসিকিউরিটির প্রশ্ন।
ঙ. আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নমুনা ও তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে স্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা ও মালিকানা-চুক্তির ঘাটতি আছে।
আরেকটি নীরব সমস্যা হলো দ্বৈত-ব্যবহারের গবেষণা (ডুয়াল-ইউজ), অর্থাৎ যে গবেষণা কল্যাণেও লাগতে পারে, আবার ক্ষতিও করতে পারে। জীবপ্রযুক্তি সহজলভ্য হচ্ছে, জিন-এডিটিং সস্তা হচ্ছে। এ অবস্থায় এ ধরনের গবেষণা পর্যালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি আমাদের প্রায় গড়েই ওঠেনি।
মূল সমস্যা: নিয়ম নয়, বাস্তবায়ন ও সংস্কৃতি
আমাদের অভাব সবচেয়ে বেশি তিনটি জায়গায়: সমন্বয়, তদারকি ও বাজেট। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, সবার এখতিয়ার আংশিকভাবে এই বিষয়ে পড়ে। কোনো একক কর্তৃপক্ষ নেই যে হাসপাতালের ল্যাব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার পর্যন্ত নিয়মিত নিরীক্ষা করবে। ফলে নিয়মের অভাবের চেয়ে নিয়ম মানানোর অভাবই বেশি।
সংস্কৃতির প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। বায়োসেইফটি এখনো অনেক জায়গায় প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখা হয়, গবেষণার মানের অংশ হিসেবে নয়। দুর্ঘটনা ঘটলে তা চেপে যাওয়ার প্রবণতাও আছে, যা শেখার সুযোগ নষ্ট করে।
আমাদের জন্য করণীয়
• একটি সমন্বিত জাতীয় জৈব নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কাঠামো: জিএমওকেন্দ্রিক নীতির বাইরে রোগজীবাণু, ক্লিনিক্যাল ল্যাব, জুনোটিক রোগ ও দ্বৈত-ব্যবহারের গবেষণাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্পষ্ট আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার, যার একটি নির্দিষ্ট তদারকি কর্তৃপক্ষ থাকবে।
• ল্যাব নিবন্ধন ও নিয়মিত নিরীক্ষা: ঝুঁকির স্তর অনুযায়ী সব ল্যাবের নিবন্ধন, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ঘটনা-প্রতিবেদনের নিরাপদ ও শাস্তিমুক্ত ব্যবস্থা চালু করা।
• প্রশিক্ষণকে পাঠ্যক্রম ও চাকরির অংশ করা: মেডিকেল, নার্সিং, মেডিক্যাল টেকনোলজি ও জীববিজ্ঞান কোর্সে বায়োসেইফটি আবশ্যিক করা এবং ল্যাবে কাজের আগে প্রশিক্ষণ ও সনদ বাধ্যতামূলক করা।
• কার্যকর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কমিটি: প্রতিটি হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বায়োসেইফটি কর্মকর্তা ও সক্রিয় কমিটি, যাদের বাজেট ও ক্ষমতা থাকবে।
• নমুনা ও তথ্যের নিরাপত্তা: জীবাণুর নমুনা, ডেটা ও বিদেশি সহযোগিতার চুক্তির জন্য জাতীয় নির্দেশিকা।
• বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ: জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিরাপদ চিকিৎসা বর্জ্য শোধনের অবকাঠামো।
• বাজেট বরাদ্দ: বায়োসেইফটিকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। একটি মহামারির খরচের তুলনায় প্রতিরোধের খরচ নগণ্য।
শেষ কথা
বায়োসেফটি নিয়ে দুর্ঘটনার পরে আলোচনা করা সহজ, কিন্তু সেই সময় অনেক দেরি হয়ে যায়। আমাদের নীতিমালা ও গাইডলাইনের ভিত্তি আছে, এখন দরকার সেই ভিত্তির ওপর সমন্বিত কাঠামো, দক্ষ জনবল এবং নিরাপত্তার সংস্কৃতি। হাসপাতাল ও গবেষণাগারের নিরাপত্তা শুধু বিজ্ঞানীদের বিষয় নয়, এটি রোগী, কর্মী ও সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
লেখক: ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ বায়োসেফটি অ্যান্ড বায়োসিকিউরিটি সোসাইটি ও অধ্যাপক, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
